আর শুনতে পারল না উইলেম। চোখে-মুখে হাত দিয়ে এক সকরুণ অসহনীয়তাকে প্রকাশ করে অকস্মাৎ চলে গেল সে। অবাক হয়ে তার পথপানে তাকিয়ে রইলেন ডাক্তার। উইলেম ভাবতে লাগল এই পারিবারিক দুর্ঘটনার জন্য সেই হচ্ছে একমাত্র দায়ী। তারই জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে এক সুখী দম্পতির সুন্দর জীবন।
ফিরে এসে উইলেম দেখল অরেলিয়ার অসুখটা বেড়ে উঠেছে। তার ইচ্ছা ছিল অরেলিয়াকে সেই মনের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে দেখাতে। কিন্তু দেখল আর তা সম্ভব নয়। তাছাড়া অরেলিয়া যাবে না। তার জ্বর বেড়ে গেছে। মেজাজটা আরও খিটখিটে হয়ে উঠেছে। আজকাল সার্লো আর বেশি খোঁজখবর নেয় না তার। ফিলিনা চলে যাওয়ার পর হাস্যরসিক বৃদ্ধ অভিনেতার দুই কন্যার একজন এলমিরার উপর
অত্যধিক আসক্ত হয়ে উঠেছে সে। এলমিরা শেষের দিকে ফিলিনার কাছেই থাকত।
এদিকে উইলেমের অনুপস্থিতিতে মেলিনা এক চক্রান্ত করে বসেছে। সে অনেক বুঝিয়ে সার্লোকে হাত করে। সে বলে এই থিয়েটার ছেড়ে এক নূতন অপেরার দল গড়ে তোলা যাক। উইলেমের হাত থেকে পুরো কর্তৃত্বভাব সার্লো নিয়ে নিক। তাতে লাভ বেশি হবে আর জনপ্রিয়তাও তাড়াতাড়ি বেড়ে যাবে।
একদিন সেই অপেরায় খুব প্রাণ দিয়ে অভিনয় করল অরেলিয়া। ভূমিকাটা খাপ খেয়ে গিয়েছিল তার ব্যথাহত ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে। আবেগটা একটু বেশি প্রকাশ করে ফেলল সে। তবু তা দর্শকদের ভালো লাগল। স্বাভাবিক মনে হলো। ফলে প্রচুর হাততালি পেল। কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় এত পরিশ্রম তার সইল না। অবস্থা খারাপের দিকে যেতে লাগল তার অভিনয় শেষ হবার পর থেকেই।
অরেলিয়া উইলেমকে ডেকে পাঠাল। ফেলিক্স তার কাছে বারবার আছে। মিগনন তাকে খুব ভালোবাসে। অরেলিয়া উইলেমের হাতে একটা চিঠি দিয়ে বলল, আমরা। অবিশ্বস্ত বন্ধুর হাতে এটা পৌঁছে দেবে। আমি আর বেশিক্ষণ বাঁচব না। আমি বেঁচে থাকতে থাকতে সে এলে ওকে আমি শেষবারের মতো আলিঙ্গন করব। আর আমি তার আগেই মরে গেলে তাকে তুমি সান্ত্বনা দেবে। বলতে আমি তাকে ক্ষমা করেছি। আমি তার মঙ্গল কামনা করি।
হঠাৎ মেজাজটা অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে উঠল অরেলিয়ার। এতটুকু বিরক্তি বা অসহিষ্ণুতার ভাব নেই। কোনও রোগযন্ত্রণা বা দুর্বলতার চিহ্নও নেই।
পরদিন নিয়মিত খবর নিতে গিয়ে উইলেম দেখল অরেলিয়া আর নেই। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেই তার অবিশ্বস্ত বন্ধুর উদ্দেশ্যে আপন প্রতিশ্রুতি অনুসারে রওনা হলো উইলেম। অরেলিয়া তার মনের কথা আত্মজীবনীমূলক একটি রচনায় সব লিখে যায়। সেটা উইলেম পড়ে দেখে। লেখাটা ভালোই হয়েছে। উইলেম ঠিক করল লোকটার দেখা পেলে সে প্রচুর ভর্ৎসনা করবে তাকে। আসলে তার হৃদয়হীনতাই অরেলিয়ার অকালমৃত্যুর কারণ হলো। ফেলিক্সকে মিগননের কাছে রেখে একদিন সকালে তার বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল উইলেম।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
অরেলিয়ার স্বীকারোক্তি
আট বছর পর্যন্ত আমার স্বাস্থ্যটা ভালোই ছিল। কিন্তু এই সময় একবার নয় মাস কাল শয্যাগত হয়ে থাকতে হয় আমাকে এক কঠিন রোগে। এই দীর্ঘ রোগভোগ কালেই আমার আজকের এই মানসিকতার ভিত্তি রচিত হয়। তারপর থেকেই শরীরটা আবার ভেঙে পড়ে। জ্বর, সর্দি প্রায়ই হতো।
যতক্ষণ দেহে আমার রোগ থাকত আমি চুপ করে নীরবে থাকতাম বিছানায়। আমার সহ্যশক্তি বেড়ে গিয়েছিল দিনে দিনে। কিন্তু সুস্থ হয়ে উঠলেই আমি পাগলের মতো জীবনকে উপভোগ করতে চাইতাম। হাতের কাছে যা কিছু আনন্দের উপকরণ হিসাবে পেতাম তাই অপরিসীম আগ্রহে ও আকুলতায় জড়িয়ে ধরতাম। বাবা আমাকে অনেক পুতুল ও ছবির বই এনে দিতেন। তিনি নিজে অবসর সময়ে বাইবেলের কাহিনী শোনাতেন। তবে আর একটু বড় হলে পুতুল ও ছবিগুলো প্রাণহীন মনে হলো আমার। কাছে। আমার দৃষ্টি পড়ল তখন পোষা কুকুর, পাখি প্রভৃতির উপর যাদের ভালোবাসলে ভালোবাসার প্রতিদান পাওয়া যায়।
বছর খানেক পরে সেরে উঠলাম আমি। আমার হারানো স্বাস্থ্য ফিরে পেলাম। কিন্তু বালসুলভ এক উচ্ছলতা উবে গেল আমার প্রকৃতি থেকে। বয়স অনুপাতে কেমন যেন বেশি গম্ভীর হয়ে উঠলাম। এরপর কিছু বইপত্রও পড়লাম। তাদের মধ্যে ছিল ক্রিশ্চান জার্মান হার্কিউলেস, লি রোমান অক্টেভিয়া প্রভৃতি আরও কত কি। পড়ার সঙ্গে রান্নাও শিখতাম মার কাছে। সঙ্গে সঙ্গে শিখতে লাগলাম ফরাসি ভাষা, চিত্রশিল্প আর নৃত্য। আমাকে ফরাসি ভাষা শেখাবার জন্য একজন গৃহশিক্ষক ছিলেন। তার শেখাবার কৌশলটা ছিল বড় চমৎকার। বড় হৃদয়গ্রাহী। তিনি যতক্ষণ থাকতেন বড় ভালো লাগত আমার। আবার কখন আসবেন তার জন্য মুহূর্ত গণনা করতাম আমি।
একবার এক নাচের আসরে দুটি সুদর্শন যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। তখন আমার বয়স তের কি চোদ্দ। ছেলে দুটি ছিল ভাই। একজন আমার সমবয়সী আর একজন আমার থেকে দু বছরের বড়। তারা দুজনেই দেখতে ছিল ভারি সুন্দর। তাদের আমার খুব ভালো লাগত। আমি তাদের সঙ্গে নাচতে ভালোবাসতাম। তাদের সঙ্গে নাচবার জন্য আমি যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করতাম। একবার বড় ভাইয়ের অসুখ করে। আমাকে তারা বাড়িতে ডেকে পাঠায়। আমাকে দেখে অসুস্থ ছেলেটি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। আমার প্রতি তার এক ঐকান্তিক আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই আমি। তখন থেকে তাদের দুজনের মধ্যে তাকেই ভালোবাসতে থাকি আমি। তার শরীরটা রোগা এবং প্রায়ই সে ভুগত বলে তার জন্য প্রার্থনা জানাতাম আমি ঈশ্বরের কাছে। কিন্তু তাতে ছোট ভাই রেগে যেত।
