সেই যাজকের খোঁজ নিয়ে বৃদ্ধকে সেখানেই পাঠিয়ে দিলে উইলেম। তার আগের বীণাটা পুড়ে যাওয়ায় আবার তাকে একটা বীণা কিনে দেওয়া হয়। সেই বীণাটা তার সঙ্গেই দেওয়া হলো।
এদিকে ফিলিনার হাবভাবটা কেমন হয়ে উঠছিল দিনে দিনে। সমগ্রভাবে দল ও দলের লোকজনদের প্রতি তার একটা অনাসক্তি গড়ে উঠেছিল যেন দিনে দিনে। ফিলিনা অন্য একটা ঘর ভাড়া করে উঠে গিয়েছিল। সে থাকত এলমিরা নামের একটি লোকের সঙ্গে। সে সার্লোর কাছে খুব কম আসত। এত অরেলিয়া বিশেষ খুশি হয়। কিন্তু সার্লো মাঝে মাঝে তার কাছে যেত। তার প্রতি একটা দুর্বলতা তখনও ছিল। একদিন সার্লো উইলেমকে নিয়ে ফিলিনার বাড়ি গেল তার সঙ্গে দেখা করতে।
ওরা গিয়ে দেখল, ফিলিনা একজন যুবক অফিসারের সঙ্গে বসে রয়েছে ভিতরকার ঘরে। বাইরের ঘরে সার্লো আর উইলেম বসতে ফিলিনা একবার ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। সার্লো এবং উইলেম দুজনেই বলল, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ, আমরা একটু আলাপ করতে চাই।
ফিলিনা বলল, আসলে উনি একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা। বিশেষ কারণে উনি আমার কাছে পুরুষ সেজে আছেন।
উইলেম বলল, আমি একবার দেখা করতে চাই ওঁর সঙ্গে। ওঁর নাম কি?
ফিলিনা বলল, তা বলব না। আমি প্রথম ওঁকে জানাব। ওঁর মত হলে আমি তোমাদের খবর দেব। তখন এসে আলাপ করবে।
উইলেমের একবার মনে হলো, মেয়েটি হয়ত তার মেরিয়ানা। অনেকটা তার মতো দেখতে। তবে মেরিয়ানার থেকে একটু লম্বা মনে হলো।
কিন্তু দুই-একদিনের মধ্যেই দল ছেড়ে জায়গাটা ছেড়ে চলে গেল ফিলিনা। তার বাড়িওয়ালার কাছে শুনল। সেই যুবক অফিসারের সঙ্গে ফিলিনা তার সব ভাড়া ও দেনা মিটিয়ে দিয়ে চলে গেছে। আর আসবে না। কোথায় গেছে তা কেউ জানে না।
ফিলিনার এই আকস্মিক অন্তর্ধান দলের লোকদের মধ্যে এমন কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারল না। সার্লোও ব্যাপারটা সহজভাবে মেনে নিল। তার জায়গায় অভিনয়ের জন্য অন্য মেয়ের ব্যবস্থা করল।
ফিলিনা ছিল দলের মধ্যে এক সংযোগসূত্র। দলের বিভিন্ন লোকের মধ্যে যেটুকু ফাঁক থাকত হাসিখুশি দিয়ে তা ভরিয়ে তুলত ফিলিনা। ফিলিনা চলে যেতে কেমন যেন শিথিল হয়ে উঠল পারস্পরিক যোগসূত্র। ফিলিনা উইলেম আর সার্লো দুজনকেই খুশি রাখত। অরেলিয়ার সব বিতৃষ্ণা ও বিরক্তি নীরবে সহ্য করত। কেউ কোনও বিষয়ে রেগে গেলে তা মতান্তর দেখা দিয়ে তাকে বোঝাত। তাই প্রথম প্রথম ফিলিনার অভাবটা বোঝা না গেলেও ক্রমে তা সবাই অনুভব করতে লাগল।
ফিলিনা চলে যাবার পর অরেলিয়ার জ্বর হতে লাগল, মেজাজটাও খিটখিটে হয়ে। উঠল। একদিন উইলেম তার কাছে ফরাসি ভাষায় একটা লেখা পাঠ করতে গিয়ে বেশ বকুনি খেল। অরেলিয়া বলল, যে লোকটা আমাকে ঠকিয়ে চলে যায় সে ফরাসি ভাষায় কথা বলত। সেই থেকে ফরাসি ভাষা শুনলেই লোকটাকে মনে পড়ে। আমার মাথায় নূতন করে আগুন জ্বলে যায়।
উইলেম হঠাৎ একদিন এর মাঝে বীণাবাদকের খবর নিতে গেল সেই গ্রামে। যাজকের কাছে যেতেই উইলেম দেখল বৃদ্ধ বীণাবাদক একটি ছেলেকে বীণা বাজানো শেখাচ্ছে। যাজক বললেন, মানুষের বিক্ষিপ্ত ব্যথাহত ও হতাশাগ্রস্ত মনকে যদি কোনও সৃষ্টির কাছে নিয়োজিত করতে পারা যায় এইভাবে তাহলে সে কখনই উন্মাদ হতে পারে না। আবার অনেক উন্মাদ ব্যক্তিকেও এইভাবে সারিয়ে তোলা যায়।
কথা বলতে বলতেই ডাক্তার এলেন। উইলেম আলাপ করল তার সঙ্গে। ডাক্তার কথা প্রসঙ্গে বললেন, আরও দুটি কেস আমি পেয়েছি। এই দুটি কেসেই দেখা যায় এক গম্ভীর হতাশা আর বিষাদ থেকে এই উন্মাদ ভাব গড়ে উঠেছে। এঁরা দুজনেই কোনও এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের স্বামী-স্ত্রী। এক কাউন্ট ও তাঁর স্ত্রী। তাঁদের কোনও সন্তানাদি নেই। এদের বয়স কম। একবার এই কাউন্ট শিকারের ব্যাপারে দু-এক দিনের জন্য বাইরে যান। তখন বাড়ির লোকজনেরা তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে এক যুবককে কাউন্টের পোশাক পরিয়ে তাঁর শোবার ঘরে বসিয়ে রাখে। তারা ভাবে কাউন্টপত্নীকে এইভাবে ঠকিয়ে বেশ মজা করবে। কিন্তু আসলে আমার মনে হয় তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কাউন্ট ও কাউন্টপত্নীকে হেয় প্রতিপন্ন করে পরিবারের উপর কলঙ্ক আরোপ করে। কাউন্ট ঐ সময় হঠাৎ ফিরে এসে তার শোবার ঘরে তার বেশে এক যুবককে বসে থাকতে দেখে আতঙ্গগ্রস্ত হয়ে অন্য ঘরে চলে যান। তাঁর ধারণা হয় তিনি নিজেই প্রেতাত্মাকে দেখেছেন অর্থাৎ তার মৃত্যুর সময় আর বেশি দিন বাকি নেই। এখন কাউন্ট ভদ্রলোক তার বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়-পরিজন কারও সঙ্গে মেশেন না।
উইলেম রুদ্ধশ্বাসে সব শুনে বলল, আর তাঁর স্ত্রী?
ডাক্তার বললেন, স্ত্রীর মানসিক অবস্থা আরও খারাপ। তিনি আরও বেশি পরিমাণে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ঐ যুবকটি প্রাসাদ থেকে চলে যাবার সময় তাঁর কাছে যখন বিদায় নিতে যায় তখন তার প্রতি তার গোপন আসক্তির কথাটা প্রকাশ করে ফেলেন কাউন্টপত্নী। তখন যুবকটি সাহস পেয়ে কাউন্টপত্নীকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করে। কাউন্টপত্নীর বুকের কাছে তাঁর স্বামীর একটা ফটো ছিল। আবেগের বশে যুবকটি কাউন্টপত্নীর বুকের উপর চাপ দিতে গিয়ে ফটোটা ভেঙে ফেলে। তাতে তার বুকের কাছটা সামান্য একটু হয়ত ছিঁড়ে যায়। আসলে আমি ডাক্তার হিসাবে বলছি তাতে তার দেহের কোনও ক্ষতি হয়নি। তবু তার ধারণা সেই ক্ষতটা বেড়ে উঠছে দিনে দিনে এবং শীঘ্রই সেটা এক দূরারোগ্য ক্যান্সার রোগে পরিণত হয়ে তাঁর যৌবনসৌন্দর্যকে চিরতরে নষ্ট করে দেবে।
