উইলেম প্রথমে অতটা গুরুত্ব দেয়নি। সে দেখল বীণাবাদক উপরতলা থেকে তার বীণা হাতে বেরিয়ে আসছে। ফেলিক্সকে বীণাবাদকের হাতে তুলে দিয়ে উইলেম আগুনের উৎসটা কোথায় তা দেখার জন্য খুঁজে বেড়াতে লাগল। পরে দেখল আগুনের উৎস এ বাড়িতে নেই। ধোঁয়াটা আসছে বাগানবাড়ির ওধার থেকে। কিন্তু উৎস যেখানেই থাক, আগুনটা ক্রমশ জোর হতে লাগল। তিন-চারটে বাড়ির কাঠের জিনিসপত্র এবং অনেক কিছু পুড়ে গেল। উইলেম পাড়ার লোকদের সাহায্যে অনেক কষ্টে আগুন নেভাল। এমন সময় মিগনন এসে উইলেমকে ব্যস্তভাবে ডাকাডাকি করতে লাগল, মালিক তাড়াতাড়ি এস, ফেলিক্সকে বুড়োটা মেরে ফেলবে। ও হঠাৎ পাগল হয়ে গেছে।
মিগননের সঙ্গে বাগানবাড়িতে ছুটে গিয়ে উইলেম দেখল শুকনো কাঠ আর খড়ের গাদায় আগুন জ্বলছে। আর তার পাশে ফেলিক্সকে শুইয়ে দিয়ে বৃদ্ধ বীণাবাদক তার বীণাটা ধরে রয়েছে। উইলেম গিয়ে বৃদ্ধকে বলল, এসব কি হচ্ছে?
মিগনন তাড়াতাড়ি ছেলেটাকে তুলে নিয়ে চলে গেল। ছেলেটা তখন চিৎকার করে কাঁদছিল। বৃদ্ধ উইলেমের কথার কোনও উত্তর দিল না। তাকে আর কিছু না বলে তাদের বাড়িটায় চলে এল সে। তার ট্রাঙ্কটা কোনওরকমে রক্ষা পেয়েছে। তবে কাপড় জামা অনেক পুড়ে গেছে। গোটা বাড়িটার ঘরগুলো থেকে ধোঁয়া বার হচ্ছিল।
মিগনন উইলেমকে দেখতে পেয়ে বলল, মালিক, আজ একটা বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি আমরা। মৃত্যুর কবল থেকে কোনওরকমে বেঁচে গেছে ফেলিক্স। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে আসল ব্যাপারটা জানতে পারল অবশেষে। মিগননের হাত থেকে লণ্ঠনের আলো দিয়ে খড়ের গাদায় বুড়ো বীণা-বাজিয়েটাই আগুন লাগায়। তারপর ছেলেটাকে পাশে ফেলে তার গলাটা ছুরি বার করে কাটতে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন ছেলেটাকে উৎসর্গ করতে যাচ্ছে সে। এমন সময় মিগনন তা দেখতে পেয়ে চিৎকার করে লোক ডাকে। ছেলেটাকে কেড়ে নিয়ে অন্যত্র সরিয়ে রেখে উইলেমকে ডেকে আনে।
কিন্তু আগুনের জন্য তখন এ বিষয়ে আর মন দিতে পারল না উইলেম। সারাটা রাত কেটে গেল আগুন নেভাতে গিয়ে। তখন সকাল হয়ে গেছে। কনকনে শীতে কাঁপছিল সবাই। আগুন নিভে গেলেও ঘরগুলো গরম ছিল। জিনিসপত্র বেশ কিছু পুড়ে গেলেও মানুষজনের কোনও ক্ষতি হয়নি। তবে ঘরগুলোর কিছু কিছু ক্ষতি হওয়ায় উইলেম আপাতত বাগানের মধ্যে যে বাড়িটা খালি ছিল সেখানে গিয়ে উঠল। বৃদ্ধ বীণাবাদককে আর দেখা গেল না। কেউ তার খোঁজও করল না।
সেই দিনই বেলা দশটার সময় সার্লো দলের সবাইকে ডাকল। বলল, রিহার্সাল হবে হ্যামলেটের। আজ রাত্রেই আবার অভিনয় হবে। বিশেষ করে যে সব দৃশ্যে নূতন লোক ভূমিকা গ্রহণ করছে।
আজকের রাত্রিতে নাটকের অভিনয় নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছু বাদানুবাদ হয় সার্লোর। নগর কর্তৃপক্ষ ও জেলাপ্রশাসক বললেন, এত বড় অগ্নিকাণ্ডের পর নাট্যানুষ্ঠান দিনকতক বন্ধ থাক।
সার্লো বলল, প্রথম কথা, আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নাটক করে তা পূরণ করতে হবে। দ্বিতীয় কথা, এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে দলের লোকের মনমেজাজ খুব খারাপ। নাটকের অভিনয় আবার সেই মনকে খুব তাড়াতাড়ি আনন্দ দান করে গরম করে তুলতে পারে।
অবশেষে অনুমতি পায় সার্লো। নাটকের ঘোষণা শুনে দর্শকদেরও বেশ ভিড় হয়। প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ হয়ে যায়। তবে আজকের দর্শকরা প্রায় সব নূতন। তাই তারা গতকালের অভিনয়ের সঙ্গে আজকের অভিনয়ের গুণগত মানের কোনো বিচার করে দেখতে পারল না। মোটের উপর নির্বিঘ্নেই কেটে গেল নাটকের অভিনয়।
অভিনয় শেষে ফিলিনা তাকে একটু ধাক্কা দিয়ে কি বলল বুঝতে পারল না উইলেম। হঠাৎ সেদিনকার কথাটা মনে পড়ে গেল তার। ফিলিনার সেই চটিজোড়াটা যেটা সরিয়ে রেখেছিল সে তা পুড়ে গেছে। তার ঘরের সেই দরজাটাও পুড়ে গেছে। যাই হোক, বাগানবাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল উইলেম। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল বাগানে। মৃদুমন্দ বাতাস বইছিল। ফিলিনা যা বলল তাতে মনে হলো ও রাত্রিতে তার কাছে আসবে। কিন্তু উইলেমের মনে হলো ও না এলেই ভালো হয়। তবে তার কাছ থেকে কয়েকটা কথা জানতে চায় সে।
বাগানবাড়ির ভেতর থেকে বীণাবাদকের গলার স্বর ভেসে আসতেই থমকে দাঁড়াল উইলেম। বাড়ির সদর দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ। তার চাবি তার কাছে। হঠাৎ চোখে পড়ল তার বীণাবাদক তার হাতের বীণাটা নিয়ে ভেতর থেকে দরজার কাছে এসে দরজা বন্ধ করে পাঁচিল টপকাতে যাচ্ছে। উইলেম বাইরে থেকে বাধা দিল। নিজের হাতে দরজাটা খুলে বাড়ির ভিতরে ও বৃদ্ধকেও জোর করে ঢুকিয়ে দিল। বৃদ্ধ বলল,
আমাকে ছেড়ে দাও। আমি চিরদিনের মতো চলে যাব এখান থেকে।
উইলেম বলল, তুমি বাগানবাড়ি থেকে চলে যেতে পার কিন্তু শহর থেকে পালাতে পারবে না। ম্যাজিস্ট্রেট সব জেনে গেছেন। তোমাকে খুঁজছে অনেকে।
বাড়ির ভিতর থেকে জোর করে বৃদ্ধকে নিয়ে গিয়ে ভিতর থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল।
উইলেম বুঝতে পারল মস্তিষ্কের বিকৃতির জন্য এই জঘন্য কাজ করে ফেলেছে বৃদ্ধ বীণাবাদক। তাই ভাবতে লাগল কি করা যায় ওকে নিয়ে। এমন সময় লার্তেস এসে তাকে একটা খবর দিল। লার্তেস বলল, আমি কিছুক্ষণ আগে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করে জানলাম তারও বিষাদের অত্যধিক চাপ থেকে মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটেছিল। কিন্তু এক গ্রাম্য যাজক তা সরিয়ে দিয়েছে।
