কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রাগে আগুন হয়ে উঠল আরেলিয়া। বলল, তোমরা সব পুরুষই এক। নারীদের গুণাগুণ বিচার করার কোনও ক্ষমতাই নেই তোমাদের।
উইলেম বলল, তুমি কি আমাদের সন্দেহ করো? আমি যতক্ষণ ওর কাছে থাকি তার পূর্ণ বিবরণ দান করতে পারি।
অরেলিয়া অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বলল, নাও, নাও, খুব হয়েছে। এখন দেবী হয়েছে। স্বর্গলোকের উজ্জ্বল পাখি আমার। যাও যাও খুব হয়েছে।
অরেলিয়া আর দাঁড়াল না। অরেলিয়া চলে গেলে কেমন ভারী হয়ে উঠল উইলেমের মনটা। তার মনের কথাটা ঠিক বোঝাতে পারল না অরেলিয়াকে।
পোশাক খুলে শুতে যাবার জন্য শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল উইলেম। কিন্তু ঘরের চৌকাঠের কাছে মেয়েমানুষের একজোড়া চটি দেখে থমকে দাঁড়াল। উইলেম বুঝতে পারল এ চটি ফিলিনার। ঘরের পর্দাটা উড়ছে। উইলেমের মনে হলো ফিলিনা তার শোবার ঘরে ঢুকে তার বিছানায় হয়ত শুয়ে আছে। এক নির্লজ্জ রসিকতায় মেতে উঠেছে যেন। উইলেম কড়া গলায় ডাকল, বেরিয়ে এস ফেলিনা, আমি এসব বাজে রসিকতা ভালোবাসি না।
কোনও সাড়া না পেয়ে পর্দাটা সরাতেই দেখল ঘরের ভিতর কেউ নেই। দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল উইলেম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। রাত্রে মোটেই ঘুম হলো না তার। চারদিকে খুঁজেও ফিলিনার দেখা পেল না। কিন্তু বুঝতেও পারল না কে এই নারী।
ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল উইলেম। অনেক বেলায় সার্লো এসে ডাকাডাকি করতে লাগল। বলল, কত কাজ আজ। আজ রাত্রেই নাটকাভিনয়।
সন্ধ্যার সময় নাটক শুরু হবার আগে উইলেম দেখল বেশ লোক হয়েছে। শ্রোতাদের বেশি ভিড় হয়েছে। ভয়ে ভয়ে নাটক শুরু করলেও কিছুক্ষণ পরেই প্রেত এসে হাজির হলো কিন্তু তার মুখ ও সারা দেহ কাপড়ে ঢাকা থাকায় কেউ তাকে চিনতে পারল না। কেউ বুঝতে পারল না কে এইভাবে প্রেত সেজে তার পূর্ব প্রদত্ত পত্রগত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এসেছে।
হোরেশিও দেখিয়ে দিলে তার কথামতো প্রেতের দিকে কিছুটা এগিয়ে এল হ্যামলেট বেশী উইলেম। প্রেতকে ঠিক না চেনার এক অতিপ্রাকৃত রহস্যময় অনুভূতি গাঢ় হয়ে উঠল উইলেমের মনে। তার উপর সম্প্রতি তার পিতৃবিয়োগ হওয়ায় সেই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হলো তার আপন হৃদয়ের অকৃত্রিম শোকানুভূতি। সব মিলিয়ে অপূর্ব হয়ে উঠল হ্যামলেটের অভিনয়। প্রেতও তার দীর্ঘ সংলাপটি ভালোভাবেই ব্যক্ত করল। স্বল্প ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘেরা শুভ্র বস্ত্রাবৃত প্রেতমূর্তি ও তার রহস্যময় সংলাপ এক চমৎকার অতিপ্রাকৃত পরিবেশ সৃষ্টি করল মঞ্চের উপর। অতিপ্রাকৃত হলেও বাস্তব সত্যের প্রতীতী জন্মাল দর্শকদের মনে। অভিভূত হয়ে গেল দর্শকরা। এই দৃশ্য শেষে হ্যামলেট যখন মঞ্চ ত্যাগ করে প্রস্থান করল তখন ঘন ঘন হাততালি দিতে লাগল দর্শকরা। এরপর সব অভিনেতাই উৎসাহ পেয়ে ভালো অভিনয় করল। সব মিলিয়ে অদ্ভুত সাফল্য লাভ করল নাটাকাভিনয়।
অভিনয় শেষে অভিনেতারা ঠিক করল আপন আপন নাটকীয় পোশাক পরেই। একসঙ্গে বসে নৈশভোজন করবে। খাওয়ার পর ওরা সবাই আনন্দ করতে লাগল। মেয়েরা গান করতে শুরু করল। সেই উন্নাসিক বৃদ্ধও বীণাবাদকের বীণায় একটা সুর বাজাতে লাগল। মাদাম মেলিনা এতদিন পর উইলেমের প্রতি এত গভীর শ্রদ্ধাসিক্ত আসক্তি দেখাতে লাগল। লার্তেস শিস দিতে লাগল মুখে। সার্লো মুখে বাজি ছোঁড়ার শব্দের অনুকরণ করতে লাগল। সমস্ত দলটার মধ্যে একবার অরেলিয়ায় চুপচাপ গম্ভীর হয়ে বসে রইল। তারপর একসময় বলল, এবার ওঠা যাক।
ক্লান্ত হয়ে উইলেম তার ঘরে গিয়ে পোশাক ছেড়ে আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি। ঘুমে দুচোখ জড়িয়ে আসছিল তার। কিন্তু হঠাৎ কিসের একটা মৃদু শব্দ হলো বিছানায়। সঙ্গে সঙ্গে কিছু বোঝার আগেই এক অদৃশ্য নারীর নরম দেহ জড়িয়ে ধরল তার দেহটাকে। তার মুখে তার ঠোঁট দুটো চেপে ধরল এমন জোরে যে উইলেম তা ঠেলে প্রথমে সরিয়ে দিতে পারল না।
কোনওরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বিছানা থেকে পোশাকটা পরতে গিয়ে সে দেখল ঘরের দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল এবং দরজাটা খোলা। ঘরের আলো জ্বেলে দেখে বিছানায় বা ঘরে কেউ নেই। তবে কে এই নারী! আশ্চর্য হয়ে ভাবতে। লাগল উইলেম। প্রথমে তার সন্দেহ হলো এ নিশ্চয় ফিলিনার কাজ। কিন্তু পড়ে দেখল। সে নয়। এদিকে-সেদিক তাকাতে বিছানার উপর দেখল একটা ওড়না পড়ে রয়েছে। তার মনে হলো এই ওড়নাটাই প্রেমূর্তির গায়ে জড়ানো ছিল। তার আঁচলের কাছে সেলাই করা একটা লেখা, এই প্রথম এবং শেষবারের মতো বলে দিচ্ছি পালিয়ে যাও যুবক, পালিয়ে যাও।
এই লেখাটাতে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল।
পরদিন সকালবেলায় ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল এরপর কোন্ নাটকের রিহার্সাল শুরু করবে আজ সন্ধে থেকে। অনেক আলোচনার পর ঠিক হলো, হ্যামলেটই অভিনীত হবে আবার। উইলেম তখন সতর্কবাণী খোদিত সেই রহস্যময় ওড়নার কথাটা বলল। তখনই ঠিক হলো প্রেতের ভূমিকা দলের কাউকেই দেওয়া। হবে। বাইরের কোনও লোককে প্রেতের ভূমিকা দেওয়া হবে না। এলেও তাকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। সার্লো বলল, আমাদের দলের শ্রেষ্ঠ অভিনেতাকে এইভাবে ভয় দেখানো বরদাস্ত করব না আমরা।
প্রাথমিক আলোচনা ও কথাবার্তার পর সভা ভঙ্গ হতে আপন আপন ঘরে সবাই চলে গেল। হঠাৎ মিগনন ছুটে এসে উইলেমের ঘরে ঢুকে বলল, মালিক, মালিক, আগুন লেগেছে। শীগগির বেরিয়ে আসুন। অরেলিয়া একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে। তার ছেলে ফেলিক্সকে উইলেমের হাতে তুলে দিল। মিগননও তাকে বলল, আপনি ছেলেটাকে দেখুন। আমি অন্য সবাইকে দেখছি। এই বলে মিগনন ছুটে অন্যত্র চলে গেল।
