সার্লো চলে গেলে অরেলিয়া উইলেমকে বলল, এ নিশ্চয়ই কার্লোর কাজ।
সেদিন সকালে প্রথম স্টেজ রিহার্সালে নেমে একটা কথা মনে পড়ে গেল উইলেমের। অতীতের এমনি কোনও এক সকালে তাদের শহরে এমনি এক রিহার্সালের সময় এই একই দৃশ্যপট সাজানো ছিল মঞ্চে। সে দৃশ্যেও ছিল চাষিদের ছোট ছোট কুঁড়ে। সেদিনের রিহার্সালের নায়িকা ছিল মেরিয়ানা। সেই সকালে মেরিয়ানা সর্বপ্রথম প্রেম নিবেদন করে তাকে। মঞ্চের ফাঁক দিয়ে উজ্জ্বল এক ফালি সূর্যের রশ্মি এসে মেরিয়ানার বুক আর কটিদেশকে আলোকিত করে তুলেছিল। উইলেমের কেবলি মনে হতে লাগল একটু পরেই যেন মেরিয়ানা এসে হাজির হবে মঞ্চে। পুরনো স্মৃতির ব্যথাভারে এমনভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল উইলেম। যে সে তার অভিনয়ের কথা ভুলে গেল একেবারে। দুজন বাইরের শৌখিন অভিনেতার ডাকে চমক ভাঙল উইলেমের।
এই দুজন শৌখিন অভিনেতা হলো স্থানীয় দুজন যুবক। এরা তাদের দলের বেতনভুক্ত অভিনেতা নয়। তবে প্রায়ই আসে, তাদের রিহার্সাল দেখতে। তারা কিন্তু ভালো সমঝদার। তাদের রুচিবোধ ও রসবোধ আছে। তারা তাদের অভিনয় ও মঞ্চ পরিচালনা দেখে দোষত্রুটি সম্বন্ধে যে সব মন্তব্য করে তা একেবারে উড়িয়ে দেবার মতো নয়। তার থেকে কিছু না কিছু গ্রহণ করার চেষ্টা করে সার্লো এবং উইলেম দুজনেই। এই যুবক দুজনের একজন নিছক নাট্যপ্রীতির খাতিরেই আসে তাদের কাছে। আর একজন মাদাম মেরিলার প্রতি আসক্ত।
যাই হোক, ওরা মোটের উপর দলের শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু। রিহার্সালের সময় ওদের উপস্থিতি খুবই উপকারে লাগে। বিদগ্ধ দর্শকের মতো ওরা সব কিছু খুঁটিয়ে দেখে, মুক্ত কণ্ঠে সমালোচনা করে। যেমন ওরা সেদিন বলল, কোনও বিয়োগান্ত নাটকে কোনও অভিনেতা হাত বেশি দোলাবে না। মেয়েরা তাদের হাত পোশাকের ভঁজের ভিতরে ঢোকাবে না। এটা ঠিক নয়। ওদের দ্বারা একটা উপকার হলো। যেহেতু হ্যামলেট অনেক তরোয়াল খেলা ও সামরিক দৃশ্য আছে, ওরা সেই সব অভিনেতাদের শেখাত। লার্তেস ও উইলেম দুজনেই ভালো করে তলোয়ার খেলাটা শিখে নেয়। বিশেষ উদ্যমের সঙ্গে ওরা আর একটা জিনিসের উপর জোর দিল। ওরা সব অভিনেতাকে বলল, কথাগুলো জোরে বলবে, মঞ্চ থেকে যাতে শ্রোতারা সব শুনতে পায়। সব কথা শুনতে না পেলে অভিনয় ভালো হলেও শ্রোতাদের ভালো লাগে না। এইভাবে যুবক দুজন উইলেমের মন জয় করে। উইলেম তাদের এক কোণে বসতে বলে।
অভিনয়ের যাবতীয় পোশাক আর দৃশ্যসজ্জার কাজ এগিয়ে চলতে লাগল। কোন দৃশ্যে কি কি থাকবে, কিভাবে দৃশ্য সাজানো হবে তা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হলো সার্লো আর উইলেমের মধ্যে।
হঠাৎ একসময় সার্লো অদ্ভুত একটা কথা বলল উইলেমকে। তুমি কি শেষ দৃশ্যে সত্যি সত্যিই হ্যামলেটকে মৃত দেখাতে চাও?
উইলেম বলল, তা না দেখিয়ে উপায় কি? নাটকের মূল পরিকল্পনাই তো এইভাবে হয়েছে।
সার্লো বলল, কিন্তু দর্শকরা তা চায় না।
উইলেম বলল, সাধারণ দর্শকদের মতে সব সময় চলতে হবে এমন কোনও কথা নেই। তারা কি চায় না চায় সেটাকে সব সময় প্রাধান্য দিলে ভালো নাটক দেখাতে পারবে না। তারা অনেক সময় বাজে মিথ্যা আবেগে আপ্লুত হয়ে আনন্দ পেতে চায়।
সার্লো তবু থামলো না। বলল, যারা টাকা দেয় তাদের ভালো লাগা মন্দ লাগাটাও দেখত হবে বৈকি।
উইলেম বলল, ফেরিওয়ালারা যখন মিষ্টি ফেরি করে তখন তাদের ডাকে শিশুরাই ক্রেতা হিসাবে ছুটে যায় তাদের কাছে। বড় মানুষেরা তাদের কথায় ভোলে না। তুমি যদি ভালো জিনিস তোমার নাটকের মধ্যে পরিবেশন করো তাহলে দর্শকের মনে ধীরে ধীরে তাদের রুচিবোধ উন্নত হবে। তখন তুমি যে টাকা তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছ তার দ্বিগুণ তারা দেবে।
প্রধান রিহার্সাল হয়ে গেল। চলল অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু কয়েকটা দৃশ্য ভালো জমল না। কারণ হ্যামলেটের বাবা মৃত রাজার ছবি সামনে না রাখার অথবা প্রেত না আসায় হ্যামলেট ও তার মার যৌথ অভিনয়ে কেউ কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি। সার্লো আর বিশ্বাস করতে পারলো না। একটা উড়ো চিঠির উপর আর নির্ভর করে থাকা যায় না। প্রেতের ভূমিকা কাউকে বিলি করে দেওয়া হোক।
উইলেম বলল, আমাদের কোনও হিতাকাক্ষী নিশ্চয় একথা লিখেছে। তার কথা অবিশ্বাস করার কোনও কারণ থাকতে পারে না।
তখন ঘরের মধ্যে দলের অনেকেই ছিল। ফিলিনা বলল, তোমরা শেকসপিয়ারের উপর অনেক খবরদারি করেছ। নাটকটি কাটছাঁট করেছ।
সার্লো আর উইলেম জানতে চাইল কোন জায়গাটা বাদ দেওয়া হয়েছে যার জন্য খারাপ লাগছে তার।
ফিলিনা তা স্পষ্ট করে বলল না। তা না বলে ও একটা গান করতে লাগল আপন মনে। কথা বলতে বলতে তখন রাত হয়ে গেছে অনেক। সবাই উঠে পড়ল। শুধু অরেলিয়া আর উইলেম বসে রইল। অরেলিয়া বলল, আমি ঐ মেয়েটাকে মোটেই সহ্য করতে পারি না। ওকে দেখলেই আমার ঘৃণা হয়। ওর মাথার চুলগুলো কোঁকড়ানো বলে আমার দাদার একটা দুবর্লতা আছে ওর উপর। আর তোমাকে দেখেও কেমন যেন নরম মনে হয় ওর প্রতি। তুমিও ওকে বেশ একটু খাতির করে চলো যে খাতির পাবার কোনও যোগ্যতা নেই ওর।
উইলেম বলল, আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা ঋণী ওর কাছে। আমি কৃতজ্ঞ ওর কাছে। আসলে দোষ হচ্ছে যে পরিবেশে ও মানুষ হয়েছে সেই পরিবেশের। ওর স্বভাবগত চরিত্রটা খারাপ নয়।
