সার্লো উৎসাহিত হলে বলল, ঠিক আছে। শেষ করে ফেলো।
উইলেমের অনুবাদের কাজ শেষ হয়ে যেতেই ভূমিকা বিতরণ শুরু হয়ে গেল।
উইলেম নিজে করবে হ্যামলেটের অভিনয়। তার অনেকদিনের ইচ্ছা। সার্লো করবে পলোনিয়াসের চরিত্রে অভিনয়। তারও এটা অনেক দিনের ইচ্ছা। অরেলিয়া নিল ওফেলিয়ার ভূমিকা। উইলেমকে এ বিষয়ে আগেই কথা দিয়েছিল সে। ফিলিনা করবে হ্যামলেটের মা অর্থাৎ রানির ভূমিকা। মুস্কিল হলো রাজা ক্লডিয়াস আর হ্যামলেটের বাবা মৃত রাজার প্রেতের ভূমিকা নিয়ে। সার্লো বলল, হাস্যরসিক বৃদ্ধ অভিনেতাকে দেওয়া হোক এই ভূমিকা। কিন্তু উইলেম প্রতিবাদ করল। লার্তেসকে দেওয়া হলো লার্তেসের ভূমিকা। এক নবাগত যুবককে দেওয়া হলো হোরেশিওর ভূমিকা।
সার্লো একবার বলল, রোজেনক্রান্তস আর গিল্ডারস্টার্ন চরিত্র দুটো বাদ দাও অথবা একটার মধ্যে দিয়ে সেরে দাও।
কিন্তু উইলেম বলল, এইসব ছোটখাটো চরিত্রের মধ্য দিয়ে শেকসপিয়ার মানব চরিত্রের অনেক কিছু বোঝাতে চেয়েছেন। তাদের মতো ভীরু, তোষামোদকারী, মাথামোটা অথচ সাবধানী চরিত্র সমাজে খুব বেশি ঘোরাফেরা করে। এই ধরনের আরও দু-একটা চরিত্র থাকলে ভালো হতো।
ফিলিনা রানির ভূমিকা পেয়ে খুব খুশি। সে বলল, প্রথম স্বামীকে খুব ভালোবাসা সত্ত্বেও দ্বিতীয় একজনকে বিয়ে করা, এই তো? আমি এমনভাবে অভিনয় করব যাতে মনে হবে দরকার হলে তৃতীয় একজনকেও বিয়ে করতে পারি।
কথাটা শুনে রেগে গেল অরেলিয়া। সে আজকাল ফিলিনাকে মোটেই সহ্য করতে পারে না। সার্লো একসময় বলল, এটা দুঃখের বিষয় রানির দুটো নাচ নেই। প্রথম স্বামী ও দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে দুটো নাচ দিতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে ফিলিনা বলল, আমি যা সুন্দর নাচতাম না। আমার পায়ের পাতাগুলো দেখনি তো?
এই বলে পা দুটো ফিলিনা টেবিলের তলা থেকে বার করতেই সার্লো তার চটির প্রশংসা করতে লাগল। সে বলল, এ চটি কাউন্টপন্থী তাকে দিয়েছে। সকলের সামনেই আদর করে ফিলিনাকে জড়িয়ে ধরল সার্লো। অরেলিয়া রাগ করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
অন্য একদিন উইলেমের একটা কথায় রাগ করে অরেলিয়া। উইলেম সেদিন সার্লোকে বলেছিল, এখন যত হ্যামলেট পড়ছি ততই মনে হচ্ছে আমার চেহারার সঙ্গে হ্যামলেটের কোনো মিল নেই। ওরা নর্ম্যান, ডেনমার্কের লোক। ওদের চুল হবে কোঁকড়া।
সার্লো বলল, চেহারা যাই হোক, অভিনেতার কাজ হলো অভিনেয় চরিত্রকে যথাযথভাবে রূপ দান করা, ফুটিয়ে তোলা।
অরেলিয়াও তাই বলল। তাছাড়া দর্শকদের মনোভাবেরও একটা মূল্য আছে নাট্যরস আস্বাদনের ব্যাপারে। আমাদের যদি অভিনেতাকে দেখে মনে হয় অভিনেয় চরিত্রের সঙ্গে এ খাপ খেয়ে গেছে তাহলে সেটাই যথেষ্ট। সুতরাং অমতের কোনও কারণ থাকতে পারে না।
সার্লো বলল, আমাদের প্রম্পটার খুব ভালো নাটক পড়তে পারে। খুব ভালোভাবে প্রম্পট করতে পারে। একবার আমি আমার সংলাপ সব ভুলে গিয়েছিলাম মঞ্চের উপর। কিন্তু ও আমার মুখে সব কথা যুগিয়ে দিয়েছিল চমৎকারভাবে।
অরেলিয়া বলল, একবার ও কিন্তু প্রম্পট করতে গিয়ে আমার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছিল, তার কারণ ও আমার সংলাপ পড়তে গিয়ে আবেগে নিজেই অভিভূত হয়ে পড়েছিল। ওর চোখে জল এসে গিয়েছিল। তাই ঠিকমতো পড়তে বা কথা যোগাতে পারেনি আমায়।
সার্লো বলল, অভিনয় সম্বন্ধে ওর কিন্তু পুরো জ্ঞান আছে। সংলাপগুলো পড়ার সময় তোমার কণ্ঠের ওঠানামা কেমন হবে তা ও সব জানে। ওর পড়াটা এত ভালো যে, অভিনেতারা তার থেকে অনেক সাহায্য পায়।
উইলেম বলল, উনি তো নিজেও অভিনয় করতে পারেন। উনি মঞ্চে নামেন না কেন?
সার্লো বলল, ওর গলার স্বরটা ভারী মোটা আর চেহারাটাও ভালো নয়।
উইলেম বলল, কিন্তু রাজা ক্লডিয়াসের ভূমিকাটা তো ওঁকে দেওয়া যেতে পারে।
সার্লো সঙ্গে সঙ্গে কথাটা লুফে নিল। বলল, হ্যাঁ, এ-ই হচ্ছে উপযুক্ত লোক। তবে ভ্রাম্যমান নাট্যদলের নাটকাভিনয়ের সেই দৃশ্যটা বাদ দিতে হবে। এই প্রসঙ্গে অর্থাৎ সেই নাটকের প্রতিক্রিয়া হিসাবে রাজার যে সংলাপ আছে, সেটা কঠিন হবে ওর পক্ষে।
উইলেম বলল, এই ভ্রাম্যমান নাট্যদলের নাটকাভিনয়ের উপস্থাপনার পিছনে শেকসপিয়ারের একটা বড় উদ্দেশ্য আছে। কারণ এই নাটকের অভিনয় একদিকে যেমন হ্যামলেটের বিবেককে এক তীব্র খোঁচা দিয়ে জাগিয়ে তার কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে দেয় তাকে, অন্যদিকে তেমনি রাজাকেও সচেতন করে দিল তার গোপন অপরাধ সম্বন্ধে। তাঁর বিবেককে আঘাত দিল। আমরা ওকে এ বিষয়ে শিখিয়ে-পড়িয়ে ভালো করে মেজে ঘষে নেব।
সার্লো বলল, তা না হয় হলো। কিন্তু প্রেতের ভূমিকাটা কাকে দেবে? ও বৃদ্ধের দ্বারা হবে না।
উইলেম বলল, বাইরে দু-একজন লোক প্রায়ই আসছে অভিনয় করার জন্য। তাদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নিলেই হয়।
কিন্তু একদিন সন্ধেবেলা একটা মজার ব্যাপার ঘটল। কি করে কি হলো তা কেউ বুঝতে পারল না। উইলেম তার ঘরে ঢুকেই একটা খামের চিঠি পেল। তাতে লেখা আছে, আপনার হ্যামলেট মঞ্চস্থ করার জন্য শ্রম ও নিষ্ঠাসহকারে যেখাবে কাজ করে চলেছেন তাতে আমরা খুব খুশি। প্রেতের ভূমিকায় অভিনয় নিয়ে কোনও চিন্তা করার নেই। যথাসময়ে প্রেত আবির্ভূত হবে।
চিঠি যে কে লিখে পাঠিয়েছে তা কেউ বুঝতে পারল না। উইলেম সার্লোকে দেখাল। সার্লো অনেকক্ষণ দেখে এবং অনেক ভেবে বলল, আমাদের ভেবে দেখতে হবে আমরা একথার উপর ঠিক নির্ভর করতে পারব কিনা।
