সার্লো একটু গানের ভক্ত। সমস্ত দলের মধ্যে তাই দুজনকে বেশি পছন্দ করত। তারা হলো বৃদ্ধ বীণাবাদক আর মিগনান। লার্তেসও কিছু গল্প জানত বলে তাকেও ভালোবাসত।
একদিন হঠাৎ উইলেম বাড়ি থেকে ওয়ার্নারের লেখা একটি চিঠি পেল। চিটি খুলে দেখল তার বাবা মারা গেছে। হঠাৎ মাত্র কয়েক দিনের অসুখে অকালে মারা গেছেন তার বাবা। ওয়ার্নার লিখেছে সে তার বোনকে সান্ত্বনা দিচ্ছে এবং তাদের বাড়িতেই আছে। সুবিধাবাদী ধান্দাবাজ লোকেদের আনাগোনা চলেছে অনবরত। সুযোগ পেলই যা পাবে চুরি করে নিয়ে যাবে এটা-ওটা।
ওয়ার্নার আরও লিখেছে সে স্থায়ীভাবে তাদের পৈতৃক বাড়িতে বাস করতে আসেনি। তার বোনের সঙ্গে তার বিয়েটা হয়ে গেলেই তারা তার বাড়িতে চলে। আসবে। তার মাও তাদের বাড়িতে এসে থাকবেন। তখন তাদের বাড়িটা মোটা টাকায় বিক্রি করে দিয়ে সেই দিয়ে গ্রামাঞ্চলে এক বিরাট খামারবাড়ি কিনবে। তাদের ইচ্ছা তখন অর্থাৎ আজ হতে মাস ছয়েক পরে উইলেমই সে খামারবাড়ি দেখাশোনা করবে।
তার উত্তরে উইলেম লিখল ওয়ার্নারকে, তোমার চিঠিখানা সুলিখিত। এতে তুমি যথোচিত বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছ। কিন্তু তোমার সঙ্গে আমি একমত হতে পারলাম না। আমি যদি প্রভাবশালী কোনও সামন্তবংশের সন্তান হতাম তাহলে আমি ঘরে থেকেই আমার সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পারতাম। আমার প্রতিভার সম্যক বিকাশ সাধন করতে পারতাম। কারণ সমাজের সর্বস্তরে রাজাদের মতো সামন্তদেরও প্রভাব প্রসারিত। কিন্তু আমি একজন সাধারণ ঘরের ছেলে। আমাকে অনেক অসুবিধা ও প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে আমার প্রতিভার বিকাশের জন্য কাজ করে যেতে হবে।
আমার জন্মগত প্রবৃত্তি ও প্রবণতাকে অবলম্বন করেই আমার ব্যক্তিসত্তার চরম উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে চাই। আমার সাধনায় সিদ্ধিলাভ না করা পর্যন্ত আমি কাজ করে যাব। আমার সাধনার উপযুক্ত পরিবেশ আমি এই বিদেশে খুঁজে নিয়েছি। তোমার চিঠি পাবার আগেই আমি আমার জীবনের লক্ষ্য ও কর্মপন্থা ঠিক করে ফেলেছি। আমি জানি আমার যা কিছু পৈতৃক সম্পত্তি আছে তা যোগ্য লোকের হাতেই আছে। শুধু মাঝে মাঝে প্রয়োজন হলে তোমার কাছ থেকে কিছু চাইব। তবে যতদূর মনে হয় আমার নিজের খরচ আমি এখন থেকে নিজেই চালিয়ে নিতে পারব।
চিঠিখানা পাঠিয়ে দিয়েই সার্লোর সঙ্গে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ল উইলেম। সার্লো অনেক আগে থেকেই তাপে চাপ দিচ্ছিল, এভাবে অনিশ্চিত অবস্থায় না থেকে চুক্তিবদ্ধভাবে কিছু করা ভালো। উইলেম বলল, সার্লেই ম্যানেজার থাকবে। সার্লোর দলে থেকে সে অভিনয় করে যাবে এবং নাটকও লিখবে। উইলেম এ চুক্তির ফলে সবাই কাজ পেল। কিন্তু একমাত্র লার্তেস ছাড়া আর আর কেউ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাল না, অথচ তারা এই চুক্তির জন্য কত প্রত্যাশা করেছে। তারা বলল, ফিলিনা উইলেমকে প্রভাবিত করে এই কাজ করিয়েছে।
যাই হোক, চুক্তিপত্রে সই করতে গিয়ে হঠাৎ উইলেমের মনে পড়ল সেই সুন্দরী অশ্বারোহিণীর কথা যার মুখ চকিতে একবার সেই বনভূমিতে শায়িত অবস্থায় আবিষ্ট। চেতনার মধ্য দিয়ে দেখেছিল, যার মুখখানা দেখতে অনেকটা কাউন্টপত্নীর মতো। ভাবতে ভাবতে অভিভূত হয়ে পড়েছিল উইলেম। সই করার পরেও কলমটা তার হাতে আটকে পড়েছিল যেন। যেন পাথরের মতো জমে গেলে তার হাতটা। পাশে থেকে মিগনন তাকে নাড়া না দিলে সে ওইভাবেই থাকত।
ঠিক হলো ওরা হ্যামলেট মঞ্চস্থ করবে। হ্যামলেটটা ইংরাজি ভাতা থেকে জার্মান ভাষায় নাটকের আকারে অনুবাদ করবে উইলেম। তবে সার্লোর মতে কিছু বাদ দিয়ে এখানকার দর্শকদের উপযোগী করে তুলতে হবে। অর্থাৎ বলতে পার গম পেষাই করে আটা বের করে ভূষিটাকে বাদ দিতে হবে।
উইলেম প্রথমে রাজি হতে পারল না। বলল, নাটকের ব্যাপারে গমের উদাহরণ খাটে না। বরং বলতে পারত গাছ। সব মিলিয়ে একটা গোটা গাছ; তার থেকে শাখা প্রশাখা, পাতা, কাণ্ড কিছুই বাদ দিতে পার না।
সার্লো প্রতিবাদ করে বলল, একটা আস্ত গোটা গাছ তো আর টেবিলের উপর উপস্থাপিত করতে পার না দর্শকদের জন্য। কিছু কাটছাঁট করতেই হবে।
উইলেম বলল, নাটকটা অনুবাদ ও সম্পাদনা কিসের ভিত্তিতে করব তা ভেবে ঠিক করে রেখেছি আমি। দুটো বিষয়ে আমাকে লক্ষ্য রেখে চলতে হবে। এক হলো। চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক আর অন্যটা হলো বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে চরিত্রের সম্পর্ক। এই সব ঘটনার মধ্যে লার্তেসের ফ্রান্সযাত্রা, তার প্রত্যাবর্তন, হ্যামলেটকে ইংল্যান্ড পাঠানো, ফোর্টিব্রাসের পোল্যান্ড অভিযান প্রভৃতি। আরও অসংখ্য ঘটনা আছে। কিন্তু এইসব ঘটনা এমনভাবে গ্রথিত হবে যাতে কেন্দ্রগত ঐক্য ব্যাহত না হয়, বিশেষ করে। নায়কের অনুপস্থিতিতে নাটকের কোনও বিশেষ নাট্য তাৎপর্য লাভ করতে না পারে। তবে আমি ঠিক করেছি ঘটনাগুলোকে এইভাবে সাজাব। হ্যামলেট হোরেশিওকে তার কাকার গোপন অপরাধের কথা খুলে বলতেই হোরেশিও তাকে পরামর্শ দিল তার সঙ্গে। নরওয়ে গিয়ে সেখানে হ্যামলেট সৈন্য সংগ্রহ করুক। তখন এক বিরাট সেনাদল নিয়ে ডেনমার্ক ফিরে এসে তার কাকার উপর প্রতিশোধ নেওয়া যাবে। হ্যামলেটও ধীরে ধীরে তার কাকা ও মার উপর অস্বাভাবিকভাবে বিরূপ হয়ে উঠবে। তখন রাজা। হ্যামলেটকে যুদ্ধজাহাজে করে নরওয়ে পাঠানো স্থির করলো। দুজন গুপ্তচর রোজেনক্রান্তস ও গিল্ডারস্টার্ন তার উপর কড়া নজর রাখবে। হ্যামলেটের প্রতিদ্বন্দ্বী। লার্তেস ফ্রান্স থেকে ফিরে এলে তাকেও পাঠানো হবে তার পিছনে। এরপর সমাধিক্ষেত্রে ওফেলিয়ার সমাধির কাছে লার্তেসের সঙ্গে দেখা হলো উইলেমের। রাজা তখন দেখল আর বেশি দূর এগোতে দেওয়া ঠিক হবে না। হ্যামলেটকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরিয়ে দেওয়া হোক পৃথিবী থেকে। তারপরেই শুরু হলো সেই ভয়ঙ্কর ক্রীড়াপ্রতিযোগিতা লার্তেস আর হ্যামলেটের মধ্যে। তারপর চার-চারটে মৃতদেহের ছড়াছড়ি। দেখাতেই হবে। কোনও উপায় নেই।
