এরপর একদিন অরেলিয়া সত্যি সত্যিই তার জীবনের কথা সব খুলে বলল উইলেমকে। বলল, আমার মা আমার খুব ছেলেবেলায় মারা যান। আমি মানুষ হই আমার পিসির কাছে। তাঁর নীতিজ্ঞান মোটেই তীক্ষ্ণ ছিল না। আমি আমার যৌবনে একজনকে না বুঝে না ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম। সে আমার দাদার অধীনে অভিনয় করত। কিছুদিন পরে সে মারা যায়। আমাদের কোনও সন্তানও হয়নি। তারপর এক ভদ্রলোকে আসেন এখানে বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করে। ভদ্রলোক প্রথমে আমার কাছে প্রতিটি কাজে ও কথাবার্তায় নিঃস্বার্থ প্রেমের ভান করে যাতে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। জীবনে প্রথম ভালোবাসা জাগে আমার হৃদয়ে। তাকে খুশি করার জন্যই যেন দিনে দিনে ভালো অভিনয় করতে শিখি। সে আমার অভিনয় দেখে খুব প্রশংসা করত। কিন্তু হঠাৎ বাড়ি থেকে একখানা চিঠি পেয়ে সেই যে চলে গেল আর এল না। এখন কিভাবে এক পরিত্যক্ত অনাথা বিধবা দিন কাটাচ্ছে নিবিড় হতাশার মধ্যে তা দেখ নিজের চোখে।
অরেলিয়া বড় আবেগপ্রবণ। নিজের দুঃখের কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই কেঁদে ফেলে। হঠাৎ সার্লো ঘরে এসে তার চোখে জল দেখে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছুরি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অরেণিয়া ঝড়ের বেগে সোফা থেকে উঠে গিয়ে সেটা কাড়ার জন্য ধস্তাধস্তি করতে লাগল। অবশেষে সেটা কেড়ে নিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। সার্লো বলল, একটা অভিনেত্রী কখনও ছোরা-ছুরি নিয়ে বাস করে না।
অরেলিয়া বলল, ছোরাটা দেখতে ধারাল এবং ভয়ঙ্কর বলেই সে খারাপ হবে তার কোনও মানে নেই।
সার্লো চলে গেলে অরেলিয়া উইলেমকে বলল, এখানে আমার মোটেই ভালো লাগে না। যে দলটা এসেছে তাদের কাউকে আমার ভালো লাগে না। আমার দাদার কাছে থাকতেও আর আমার ভালো লাগে না।
ওদিকে সার্লো ক্রমাগত তার দলের লোকদের অযোগ্যতার কথা বলতে থাকায় উইলেম নতুন করে তাদের অভিনয় শেখাতে লাগল। তবু এত কিছু সত্ত্বেও ওদের মন পেল না উইলেম। মেলিনা সহ দলের প্রায় সবই তখনও ক্ষুব্ধ তার প্রতি। একমাত্র লার্তেস ও ফিলিনা তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
আর একদিন সার্লোর খোঁজে এসে উইলেম অরেলিয়ার সঙ্গে দেখা করল তার ঘরে গিয়ে। উইলেম একা সোফার উপর বসল। অরেলিয়া বলল, কাল সন্ধ্যায় নাটক আর না। আজ সকালে আমি আমার ভূমিকা বুঝে নিলাম।
উইলেম বলল, তোমার প্রতিভা আছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার যৌবনসমৃদ্ধ। সুন্দর চেহারা ও প্রতিভা আছে। তুমি একদিন চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করবে জীবনে। অতীতের জন্য কিছু ভেবো না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অরেলিয়া বলল, আমরা নারীরা এমনই দুর্বল প্রকৃতির যে আমরা কাউকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের যৌবন সৌন্দর্য জ্ঞান বিদ্যা বুদ্ধি সব তোমাদের মতো পুরুষদের পায়ে বিলিয়ে দিই। কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে সব সমৰ্পণ করি।
এই বলে ঘরের মধ্যে অশান্তভাবে পায়চারি করে বেড়াতে লাগল অরেলিয়া। এক সময় বলল, বুঝি বন্ধু, সব বুঝি। কিন্তু অতীতের চিন্তা-ভাবনা থেকে মনকে বিচ্ছিন্ন। করে নেওয়া যে কত কঠিন কাজ তা কি করে বোঝাব? আমি আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না লোকটা আমাকে ত্যাগ করলেও কেন আমি তাকে ভালোবাসব না? কোন যুক্তিতে আমি তাকে ভালোবেসে যাব না তা সত্যিই বুঝতে পারছি না। ভাবতে গিয়ে মাথাটা আমার ঘুরে যায়। হ্যাঁ, তবু আমি ভালোবেসে যাব তাকে। যতদিন বাঁচব ভালোবাসব।
অরেলিয়ার একটা হাত ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল উইলেম। তাকে মেরিয়ানার কথাটা বলল। মেরিয়ানাও তো বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার সঙ্গে। তবু সে নূতন উদ্যামে বুক বেঁধে কাজ করে চলেছে। একদিন সেও এমনকি করে ভেঙে পড়েছিল প্রথম প্রেমে ঘা খেয়ে। কিন্তু আজ আর সেকথা ভাবে না। অরেলিয়া বলল, তুমি কখনও কোনও মেয়েকে মিথ্যা বলে ঠকাওনি একথা জোর গলায় বলতে পার?
উইলেম শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, পারি। সে কথা বলার কোনও প্রয়োজন হয়নি। যে মেয়েকে আমি আমার জীবন উৎসর্গ করতে পরব না তাকে আমি কোনওমতেই ভালোবাসা জানাব না। সে আমার ভালোবাসা পাবে না।
অরেলিয়া বলল, তাহলে হাজার মিথ্যাবাদী পুরুষের মাঝে তুমি একটা। তবে তোমার প্রতিশ্রুতির কথা মনে আছে তো?
উইলেমস তার একটা হাত ধরেই বলল, হ্যাঁ আছে। অরেলিয়া বলল, ঠিক আছে। আমি মেনে নিচ্ছি তোমার কথা।
এই বলে ডান হাত দিয়ে তার পকেট থেকে ছুরিটা বের করে উইলেমের একটা হাতের চাটু চিরে দিল সেই ছুরিটা ডগাটা দিয়ে। তারপর তার রুমাল দিয়ে তার হাতটা বেঁধে দিল। তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল উইলেমের হাত থেকে। উইলেম আশ্চর্য হয়ে বলল, একি করলে অলেরিয়া, তোমার হিতাকাক্ষী বন্ধুকে আঘাত করলে?
চুপ! তার একটা হাত দিয়ে উইলেমের মুখটা চেপে ধরল। তারপর ড্রয়ার থেকে ওষুধ এনে লাগিয়ে দিল। বলল, আমার মতো অর্ধপাগল এক নারীকে ক্ষমা করো। মাত্র কয়েক ফোঁটা রক্তের জন্য দুঃখ করো না।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
কদিন ধরে অরেলিয়ার মাথাটা যেন বেশি খারাপ হয়ে পড়ে। সে সব সময় হাহুতাশ করতে থাকে। তখন তাকে একটা নির্জন বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া সে একা একা থাকতেই ভালোবাসে। আর তিন বছরের ছেলে ফেলিক্স এ বাড়িতে রয়ে গল। মিগননের সঙ্গে তার বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। মিগনন তার দেখাশোনা করতে লাগল। মিগননের কাছে সে ভালোই থাকে।
