ফিলিনা বলল, ওদের টাকা দেবার কি আছে? সর্দার ওদের প্রত্যেককে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছে।
তবু ওরা যখন উইলেমের কাছে এল, উইলেম তাদের প্রত্যেককে কিছু কিছু দিল।
একদিন সকালবেলায় হঠাৎ ঘুম ভাঙতে উইলেম দেখল তার বিছানার এক ধারে ঘুমিয়ে আছে ফিলিনা। রাত্রিতে হয়ত বই পড়তে পড়তে তার ঘুম এসে যায়। বইখানা পাশে পড়ে রয়েছে। মাথার চুলগুলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। এই অগোছালো ভাবের মধ্যে ফিলিনাকে খুব ভালো লাগছিল উইলেমের। এই ভালো লাগার মধ্যে দিয়ে তার প্রতি তার অন্তরের অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা। তাকে যখন দলের সবাই ত্যাগ করে যায় তখন একমাত্র ফিলিনাই তার পাশে থেকে দিনরাত সেবা করে তাকে সুস্থ করে তোলে। মিগননও করে। কিন্তু মিগননের সে একদিন উপকার করেছে। কিন্তু ফিলিনার জন্য সে এমন কিছু করেনি যার জন্য ফিলিনা এই বিপদের দিনে একখানি করতে পারে তার জন্য। সুতরাং ফিলিনার ঋণ সে শোধ করতে পারবে না। এখন ফিলিনার ঘুমটা ভেঙে গেল। সে আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসল। উইলেম তাকে বলল, তুমিও দলের অন্যান্যদের সঙ্গে চলে যাও। সার্লোর অধীনে গিয়ে কাজ করো।
এই ফিলিনা দলের লোকদের পাথেয় খরচ হিসাবে টাকা নেওয়ার জন্য ঝগড়া করে তার সঙ্গে। ফিলিনা কথাটার জের টেনে বলল, তুমি যদি আমাকে তাড়াতে চাও, আমি চলে যাব। ফ্রেডারিক আমার কাছে থাকলে আমি ভাবতাম না। তোমাদের কাউকে আমার দরকার হতো না। কিন্তু ডাকাত পড়ার পর থেকে ছেলেটা কোথায় যে চলে গেল তার ঠিক নেই।
উইলেম চুপ করে রইল। তার কষ্ট হচ্ছিল মনে। ফিলিনার সেবার অভাবটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করবে সে। তবু কোনও কথা বলল না দেখে ফিলিনা সত্যি সত্যি চলে গেল।
উইলেম এবার সুস্থ হয়ে উঠেছে। এবার সে হাঁটতে পারে। এখানে একজন গ্রাম্য যাজক আসেন। তাকে প্রায়ই সান্ত্বনা আর পরামর্শ দেন। ফিলিনা চলে গেছে এবং দেহে কিছুটা বল পেলে সেই অজ্ঞাতনামা নারীর খোঁজ করতে লাগল উইলেম। চকিতে সে একবারে যতটুকু দেখেছে তার আহত আবিল চৈতন্যের মধ্যে তাকে দেখেছে, কাউন্টপত্নীর সঙ্গে তার অনেকটা মিল আছে। যার জন্য সে মৃত্যুর কবল থেকে ফিরে আসতে পেরেছে, যার জন্য নবজীবন লাভ করেছে তাকে একটু কৃতজ্ঞতা জানাতেও পারেনি। কিন্তু সর্দার বা যাজক শত অনুরোধ সত্ত্বেও কোনো সন্ধান দিতে পারল না সেই সুন্দরী অশ্বরোহিণীর। হঠাৎ কোটের পকেটে হাত দিয়ে একটি চিঠি পেল উইলেম। এই কোট তার সেই সুন্দরী উদ্ধারকারিণীরই দেওয়া। সে চিঠি তারই হাতে লেখা তারই কোনও আত্মীয়কে। উইলেমের কাছে কাউন্টপত্নীর হাতে লেখা একটি গান ছিল। মিলিয়ে দেখল দুজনের হাতের লেখার মধ্যে অদ্ভুত মিল আছে।
পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভের জন্য আরও দিনকতক থাকতে হলো উইলেমকে। কিন্তু মনে চিন্তা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে পারল না। কিছু না কিছু সে করতে চায়। অজ্ঞাতনামী সেই সুন্দরীরও কোনো খোঁজ না পেয়ে একদিন মিগনন আর বৃদ্ধ বীণাবাদককে সঙ্গে নিয়ে সার্লোর বাড়ির পথে রওনা হলো উইলেম। সার্লো তার নাট্যজগতের অন্তরঙ্গ বন্ধু। শেকস্পিয়ার নিয়ে কত আলোচনা হয়েছে তার সঙ্গে।
সার্লোকে আগেই একটা চিঠি দিয়েছিল উইলেম। তাই উইলেম তার বাড়িতে পা দিতেই দুহাত বাড়িরে ছুটে এল সার্লো। সাদর অভ্যর্থনার পর উইলেমকে কাছে বসিয়ে সার্লো বলল, তোমার দলের লোকদের কিছুই হবে না। যত সব অপদার্থের দল।
উইলেম কোনও কথা বলল না। ওদের প্রতি এখনও সমান মমতা আছে তার। অপদার্থ হলেও ওদের নিয়ে কিছু করা হবে এ বিষয়ে একটা গোপন বিশ্বাস মনটাকে দোলা দেয় তার। কথায় কথায় উইলেম শেকসপিয়ারের হ্যামলেট’ নাটকের কথাটা তুলল।
সার্লো বলল, পলিনিয়াসের ভূমিকায় অভিনয় করার আমার বড় ইচ্ছা। আমার বোন অরেলিয়াও ওফেলিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে যদি যুবরাজ হ্যামলেটের ভূমিকার জন্য উপযুক্ত লোক পাওয়া যায়।
অরেলিয়ার সঙ্গে আলাপ করল উইলেম। ওফেলিয়ার চরিত্রটাকে ভালোভাবে জানতে চাইল অরেলিয়া। উইলেম গোটা হ্যামলেট নাটকটা নিয়েই আলোচনা করতে লাগল। সে বলল, সে বিরাট কাজের ভার হ্যামলেটের উপর দেয়া হয়েছিল তার অপরিণত অপটু অশক্ত অন্তরাত্মা সে ভার সহ্য করতে পারেনি। একটা ওক গাছের চারাকে একটা ছোট্ট কাঁচের জারে বসালে যেমন হয়, তার শেকড়গুলো বড় হলে জারটার যেমন ফাটল ধরে, হ্যামলেটেরও ঠিক তাই হয়েছিল। হ্যামলেটের ট্রাজেডি এইখানে। নায়ক শুধু ভেবেছে খলনায়কের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সে কিছুই করেনি। কিন্তু নাটকটা এমনভাবে সাজানো যে খলনায়ক নিজেকে নিরঙ্কুশ করার জন্য নায়কের জন্য যে মৃত্যুফাঁদ পাতে সে ফাঁদে নায়কের সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেও পড়ে যায়।
পরদিন অরেলিয়া ব্যক্তিগত কারণে তার ঘরে উইলেমকে ডাকল। উইলেম ঘরে ঢুকে দেখল, সোফার উপর বসে আছে অরেলিয়া। কিন্তু কোনও বিশেষ কথা হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যে সার্লো আর ফিলিনা ঘরে ঢুকল। এরপর সার্লো আর অরেলিয়া দুজনেই বেরিয়ে যেতে ফিলিয়া রয়ে গেল।
প্রথমে সারা ঘরময় শিশুর মতো অবুঝ আনন্দে লাফিয়ে বেড়াতে লাগল ফিলিনা। তারপর মেঝের উপর শুয়ে গড়াগড়ি দিতে লাগল। প্রথমে ফিলিনাকে দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গিয়েছিল উইলেম। তার সেই বিস্ময়কে উপহাস করে ফিলিনা বলল, তোমার আগেই আমি এখানে চলে এসেছি। দেখলো তো? আমি কিন্তু সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি। এবার এখানকার কথা শোনো। এখানে আসার পর থেকে আমার মন্দ লাগছে না। কিন্তু এদের সম্বন্ধে কিছু জেনে রাখা উচিত তোমার। থিয়েটারের দল করে কিছু পয়সা করবে সার্লো। সে এখন আমাদের নতুন দলের ম্যানেজার। এই দলে একটা নাচিয়ে মেয়ে আছে। তার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে সার্লো। আবার এক অভিনেত্রীর সঙ্গে বিয়ের কথা প্রায় পাকাপাকি। তার উপর শহরে আরও অনেক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছে। তার বোন অরেলিয়ার স্বামী মারা গেছে। এই দলেরই এক অভিনেতার সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তার মৃত্যুর পর এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে তার আলাপ হয়। ভালোবাসা হয়। কিন্তু তাকে ফেলে সে পালায়। এই বাড়িতে তিন বছরের একটা ফুটফুটে ছেলে আছে। দেখে মনে হয় ওর বাপ খুব সুন্দর ছিল। ছেলেটাকে আমার খুব ভালো লাগে। অরেলিয়া কিন্তু সেই লোকটার জন্য এখনও হাহুতাশ করে। তার ভাই সার্লো আবার তার প্রেমিকাদের তালিকায় আমার নামটাও লিখে নিয়েছে। আমার প্রতিও তার একটা দুর্বলতা গড়ে উঠেছে। আমার কথা শোনো, তুমি অরেলিয়াকে ভালোবাস। তাহলে ভালোবাসাবাসির খেলাটা বেশ জমে উঠবে। তুমি অরেলিয়াকে ভালোবাসবে, অরেলিয়া ভালোবাসবে সেই পলাতক ভণ্ড প্রেমিকটাকে। আমি তোমাকে ভালোবাসব আর আমাকে ভালোবাসবে সার্লো। একজন যার পিছনে ছুটে চলবে, সে ছুটে চলবে আর একজনের পিছনে। তা না হলে, ভালোবাসার খেলা।
