সকলেই রাজি। ছোট পাহাড়টার মাথায় উঠতে হলে একটা ঘন জঙ্গল পার হতে হয়। সতর্কতার জন্য কিছু অস্ত্রও ছিল ওদের হাতে। উইলেমের কাছে ছিল দুটো রিভলবার আর লার্তেসের ছিল একটা বন্দুক। ফ্রেডারিক সেই বন্দুকটা কাঁধে তুলে নিল। ওরা পাহাড়ের উপর উঠে চারদিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। চারদিকে শুধু পাহাড় আর বন। কোনও কোনো জনমানব বা কোনও প্রাণীর চিহ্ন নেই। চারদিক ভীষণভাবে নিস্তব্ধ। উইলেমের মনে হলো জীবনে এত আনন্দ আর কখনও পায়নি। এমন পরিবেশ, এমন আনন্দঘন মুহূর্ত জীবনে আর কখনও আসেনি। দলের অন্য সকলেও খুব খুশি। মেয়েরা গুনগুন করে গান করতে লাগল। খাবার জন্য কিছু আলু সেদ্ধ করতে লাগল। মালপত্র সব গাড়িতেই রইল। ঘোড়াগুলো জোয়ালমুক্ত করে গাছে বেঁধে দিল চালকরা।
হঠাৎ একটা বন্দুকের শব্দ শোনা গেল। তারর একদল সশস্ত্র দস্যু বনভূমি পার হয়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তাদের একজন গাড়িতে উঠে মালপত্র নামাতে শুরু করে দিল। লার্তেস তার বন্দুকটা নিয়ে গুলি করল। গাড়ির উপর থেকে পড়ে গেল লোকটা। উইলেমও এগিয়ে গিয়ে অস্ত্র নিয়ে বাধা দিল। কিন্তু সংখ্যায় দস্যুরা বেশি থাকায় পেরে উঠল না ওরা। লার্তেস আর উইলেমকে আহত করে মালপত্র নিয়ে পালিয়ে গেল দস্যুরা। একমাত্র ফিলিনা তাদের সর্দারকে অনেক কয়ে বলে তার বাক্সটা রক্ষা করল।
আঘাতটা উইলেমেরই বেশি লেগেছিল। কতক্ষণ অচৈতন্য পড়ে পড়েছিল তা সে। নিজেই জানে না। চেতনা ফিরলে দেখল সেই পাহাড়ের উপরেই সে আছে। মাথাটা ফিলিনার কোলে রয়েছে। পায়ের কাছে বসে আছে মিগনন। আর কেউ নেই। সেই স্তব্ধ নির্জন বনভূমিতে শুধু তারা তিনজন।
ফিলিনার কাছ থেকে জানল দলের অন্যরা সব কিছু হারিয়ে রাগে-দুঃখে পাগলের মতো হয়ে গেছে। তারা নিকটবর্তী একটা গাঁয়ের এক পান্থশালায় গিয়ে উঠেছে। বৃদ্ধ গায়ক গেছে তার জন্য ডাক্তার ডাকতে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার এসে উইলেমের ক্ষতস্থানগুলো ব্যান্ডেজ করে দিল। ক্ষত দিয়ে প্রচুর রক্ত বার হওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়েছে উইলেম। উত্থানশক্তি রহিত । এমন সময় একদল অশ্বারোহীকে তাদের দিকে আসতে দেখে আবার ভয় পেয়ে গেল ওরা। কিন্তু পরে দেখল তারা তাদের সাহায্য করতে এসেছে। তাদের পুরোভাগে একজন নারী অশ্বারোহী। অদ্ভুত পোশাক আর টুপির জন্য তাকে চেনা যাচ্ছিল না। অশ্বারোহীদল তাদের নির্দেশে চলছিল। সেই নারী নেমে এসে তার গায়ের কোটটা। খুলে উইলেমের গায়ে চাপিয়ে দিল। তারপর একজন গ্রাম্য সদরকে নির্দেশ দিল উইলেমকে বয়ে নিয়ে গিয়ে যেন পাশের গায়ে তার ঘরে শুইয়ে রাখে।
সেই সর্দার আরও লোকজন এনে উইলেমকে বয়ে নিয়ে গেল বাঁশের মাচায় করে। পাশের গায়ের পান্থশালাতেই দলের সব লোকরা উঠেছে। সর্দার উইলেমকে প্রথমে সেখানেই তুলল। পরে তার বাড়িতে নিয়ে যাবে। সর্দার প্রস্তুতির জন্য বাড়ি গেলে তার দলের লোকেরা দুর্ঘটনার জন্য উইলেমকে দায়ী করে গালাগালি করতে লাগল। তারা একবাক্যে সর্দার ও ফিলিনাকে বলল, ওকে অন্য কোথাও নিয়ে যাও। ওরই জন্য আমরা সব হারিয়েছি। ওই জোর করে আমাদের এই পথে আনল।
মেলিনা এতদিন যা সঞ্চয় করেছিল সব গেছে। তার স্ত্রী একটা মরা ছেলে প্রসব করে।
বারবার ওদের এক কথা শুনে কথা বলার ক্ষমতা না থাকলেও উঠে বসে উইলেম। বলল, আমি কি তোমাদের জন্য কিছু করিনি? আমি প্রস্তাব করেছিলাম মাত্র। তোমরা সবাই তখন আমাকে সমর্থন করেছিলে এ পথে আসার জন্য। তবে কেন আমাকে দোষ দিচ্ছ?
মেলিনাকে বলল, তোমাকে যে টাকা ঋণ হিসাবে দিয়েছি সে ঋণ থেকে মুক্তি দিলাম তোমায়। তোমরা সব ভুলে আমার পাশে এসে দাঁড়াও। আমি তোমাদের দুঃখ বুঝতে পারছি। আমি কথা দিচ্ছি তোমরা যে যা হারিয়েছ তার দ্বিগুণ-তিনগুণ আমি দেব তোমাদের।
তবু তারা শান্ত হলো না। বিশ্বাস করল না উইলেমের কথায়। এদিকে সর্দার এসে উইলেমকে নিয়ে গেল। উইলেম বুঝতে পারল উত্তেজনার জন্য তার ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে।
ফিলিনা ও মিগনন উইলেমের সঙ্গে এল।
পরদিন সকলে ঘুম ভাঙলে শুনল সেই নারী আবার তাকে দেখতে এসেছিল। উইলেমের মনে হলো নারী না, কোন দেবদূত স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। তার কোটটা গায়ে দিয়ে কেবল সে কোটের গন্ধ শুঁকতে ইচ্ছা করেছিল তার। কারণ সে কোটে সেই নারীর স্পর্শ আছে। ডাক্তার এসে তাকে ক্ষতস্থান ধুয়ে দিয়ে গেল। উইলেম ফিলিনাকে। বলল, তুমি এবার যেখানে খুশি যেতে পার ফিলিনা। তোমার বাক্সে আমার যা কিছু সম্পদ রক্ষা করেছ এজন্য ধন্যবাদ। তার জন্য আমার সোনার হাতঘড়িটা আমি তোমাকে দেব।
ফিলিনা বলল, আমি কোথাও যাব না।
মিগননের মতো বৃদ্ধ বীণাবাদকও সঙ্গী হয়ে উঠল উইলেমের। একটু সুস্থ হয়েই লার্তেস দেখা করতে এল তার সঙ্গে। সে বলল, হোটেলে যখন দলের লোকেরা তাকে অপমান করে তখন সে অন্য ঘরে অসুস্থ ছিল। তা নাহলে সে কখনই চুপ করে থাকত না। উইলেমের প্রতি তার আনুগত্য ও সমর্থন আজও অটুট আছে।
লার্তেস বলল, সার্লোর অধীনে ওরা আবার একত্র হয়ে একটা নতুন দল গড়তে চায়। যাবার সময় তোমার কাছে ওরা পাথেয় খরচ চাইবে। মনে হয় এতদিন দল চালিয়ে ফিলিনা কিছু টাকা করেছিল। কিন্তু সব গেছে।
