কথাটা শুনে অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীরা হাসতে লাগল। বৃদ্ধ গায়ক উইলেমকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, আমাকে যেতে দিন। আমি আর এখানে থাকব না।
উইলেম বুঝল মেলিনার কথায় বৃদ্ধের রাগ হয়েছে। উইলেম বলল, আপনার কোনও চিন্তা নেই। আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ আপনার চুল-দাড়িতে হাত দেবে না। এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আমি। আমি থাকতে কেউ আপনার কিছু করতে পারবে না।
বৃদ্ধ বলল, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আপনার চারপাশে যারা রয়েছে তারা সবাই ভালো নয়। আমার কিছু গোপন কথা আছে, আমার জীবনের একটা গোপন অংশ আছে। সেটা ওরা নির্মমভাবে টেনে বার করতে চায়। কিন্তু আমি তা পারব না। তাই আমি আমার সেই গোপন কথার সম্পদ, জীবনের সেই অনাবিষ্কৃত দিকটি নিয়ে বিদায় নিই।
উইলেম কিন্তু ছাড়ল না। বলল, আমি আপনার গোপন কথার কিছুই জানতে চাই না। আপনার ভাগ্যকে আমার হাতে সঁপে দিতে পারেন।
যাই হোক, উইলেমের কথায় রয়ে গেল বৃদ্ধ।
আগে যে রাজপ্রাসাদে ছিল তার থেকে কিছু দূরে একটা ছোট শহরে তার দল নিয়ে থেকে যেতে চাইল মেলিনা। উইলেমও বাড়ি যাব-যাব করেও গেল না। এই দল ছেড়ে কোথাও যেতে মন সরছিল না তার। তার পোশাকটাও পথিকের মতো হালকা ও সাদাসিধে করে নিল। একটা হালকা ওয়েস্ট কোট, ঢিলে প্যান্ট, ফিতেওয়ালা বুট জুতো, মাথায় গোল টুপি আর সিল্কের নেকটাই। ফিলিনা তার পোশাকের দারুণ প্রশংসা করল।
অবসর সময়ে দলের সবাই একটা আনন্দ উপভোগ করত। তা হলো হঠাৎ ওরা সবাই মিলে একটা নাটক করত মুখে মুখে। আর সেই নাটকে কিছুদিন আগে যে সব বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছিল তাদের এক-একজনকে চরিত্র হিসাবে খাড়া করে হাসাহাসি করত। বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে তাদের উপস্থাপিত করে তারা মজা পেত।
উইলেম একদিন তার প্রতিবাদ করে বলল, ওসব করা উচিত নয়। তাদের জন্মের জন্য তারা দায়ী নয়। ছোট থেকে যারা পার্থিব ঐশ্বর্যের দ্বারা পরিবৃত থাকে সব সময় তারা অন্তরের ঐশ্বর্যের কোনও দাম দিতে জানে না। এ জন্য তাদের দোষ দেওয়া উচিত নয়।
এরপর উইলেম প্রস্তাব করল, আমাদের অভিনয় প্রতিভাকে ক্রমে ক্রমে বাড়িয়ে তুলতে হবে। এর জন্য প্রশিক্ষণ দরকার। নিয়মিত অভ্যাস দরকার। তোমরা যদি অভিনয়ে কৃতিত্ব দেখাতে পার তাহলে বসে বসে কাজের জন্য ভাবতে হবে না।
ওরা সবাই তখন প্রস্তাব করল পরিচালনার জন্য একজনকে সাময়িকভাবে প্রধান করে একটা সিনেট গঠন করা হবে। প্রধানকে সকলের ভোটে নির্বাচন হতে হবে।
মেলিনা তাতে রাজি হলো। ওরা সবাই মিলে ভোট দিয়ে প্রথমে উইলেমকে ম্যানেজার নির্বাচিত করল। তারপর তাকে সর্ববিষয়ে সাহায্য করার জন্য একটা সিনেট গঠন করা হলো। মেয়ে-পুরুষ মিলিয়ে তার সদস্য নির্বাচন করা হলো।
লার্তেসের একটা দোষ। মেয়েদের সে দেখতে পারে না। কোনও মেয়েকেই সে ভালোবাসার চোখে দেখতে পারে না। একটা জায়গায় দুই-একদিনের জন্য থাকতে হয়েছিল। স্থানীয় একটি মেয়ে লাতেঁসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তার কিছু বিষয়-সম্পত্তি ছিল। কিন্তু লার্তেস তার প্রতি এমন নীরস ঔদাসিন্য দেখায় যে, মেয়েটা চলে যেতে পথ পায় না।
কথাটা উঠতে ফিলিনা হাটের মাঝে হাঁড়ি ভেঙে দিল। লার্তেসের পূর্ণ জীবনের একটি গোপন কথা বলে দিল সকলের কাছে। তখন লার্তেসের বয়স মাত্র আঠারো। কোনও এক নাটকের দলে সে কোনও এক বৃদ্ধ অভিনেতার চোদ্দ বছরের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিল। কাজ শেষে যখন বৃদ্ধ তার মেয়েকে নিয়ে চলে যাচ্ছিল তখন। লার্তেস তাকে অনুনয়-বিনয় করে। সে মেয়েটিকে বিয়ে করতে চায়। অবশেষে অনেক করে বৃদ্ধ রাজি হয়। লার্তেস মেয়েটিকে বিয়ে করে। বিয়ের পর লার্তেস তার নূতন বউকে নিয়ে একটি ঘরে থাকত। সে একদিন রিহার্সালে যায় সন্ধ্যার সময়। রাত্রিবেলায় বাড়ি ফিরে দেখে তার ঘরে তার নূতন বউ-এর কাছে রয়েছে তার আগের প্রেমিক। এরপর সে মেয়ের আগেকার প্রেমিক লার্তেসকে ডুয়েলে আহ্বান করে। ডুয়েল লড়তে গিয়ে আঘাত পায় লার্তেস। সেই থেকে ও মেয়েদের ঘৃণা করে। তাদের সততায় বিশ্বাস করতে পারে না।
এবার ওদের যাত্রা শুরু হবে। মেলিনা এসে বলল, সব ঠিক। এবার রওনা হতে হবে। কাউন্টের নির্দেশমতো ওরা যাবে এক শহরে। সেখানে ওদের থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু হঠাৎ একটা বাধা এসে উপস্থিত হলো। স্থানীয় দু-একজন বলল যে পথে তারা যাবে এবং যেটা সোজা পথ সে পথ ভালো নয়। এখন যুদ্ধের সময়। প্রায়ই দস্যু দেখা যায় সে পথে। সব কেড়ে নেয়। জীবনও সংশয় হয়ে ওঠে। হয় যাত্রা স্থগিত করতে হবে, না হয় ঘুর পথে যেতে হবে অনেক কষ্ট করে।
উইলেম বলল, যুদ্ধের সময় এরকম গুজব প্রায়ই রটে। সুতরাং গুজবে কান না দিয়ে সোজা পথেই যাত্রা শুরু করা যাক। সবাই সমর্থন করল তাকে। লার্তেস বলল সে যাবেই ঐ পথে। বৃদ্ধও তাই বলল। আসন্ন সন্তান-সম্ভবা মেলিনাও বেশ মনের জোর দেখাল। দুটো কোচে ওরা মালপত্র নিয়ে উঠে বসল। দ্বিতীয় দিনে পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে গাড়ি যাবার সময় গাড়ির চালকরা বলল, শহরটা এখনও অনেক দূরে, গাছপালায় ঘেরা ঐ পাহাড়টায় বিশ্রাম করে নিন আপনারা।
