উঠতে যাচ্ছিল উইলেম কিন্তু হঠাৎ একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। কি করে কি হলো তা জানে না। হঠাৎ উইলেম দেখল কাউন্টপত্নী দুহাত দিয়ে তার গলাটা জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁট দুটো তার মুখের কাছে তুলে দিয়েছে। কাউন্টপত্নীর মুখে মুখ দিয়ে তার দেহটাকেও বুকের কাছে টেনে নিল উইলেম। এইভাবে নিবিড়তম এক আলিঙ্গন ও চুম্বনের বন্ধনে কতক্ষণ আবদ্ধ ছিল তা জানে না, হঠাৎ চমকে উঠল উইলেম, কাউন্টপত্নী যেন হঠাৎ ভয়ে চমকে উঠে ছাড়িয়ে নিল নিজকে। অথচ কেউ আসেনি ঘরের দরজার বাইরে। তবে কি এক কাল্পনিক শঙ্কার শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন কাউন্টপত্নী? এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তিনি তাকালেন উইলেমের দিকে। সে দৃষ্টির অর্থ সে বুঝতে পারল না। কাউন্টপত্নী বললেন, তুমি চলে যাও এই মুহূর্তে। আমাকে যদি ভালোবাস তাহলে চলে যাও। আর দেরি করো না।
অবশেষে একদিন কাউন্ট আর কাউন্টপত্নী প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেলেন।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
সৈন্যদের শিবির উঠে গেছে। যুবরাজ তাঁর সৈন্যদের নিয়ে চলে গেছেন। প্রাসাদের চারপাশে মাঠগুলোতে সৈন্যদের যে ছাউনি গড়ে উঠেছিল সে ছাউনি আর নেই। মাঠগুলো আবার ফাঁকা হয়ে উঠেছে। একদিন সকালে লার্তেস প্রাসাদের একটি ঘরের জানালা থেকে মাঠের দিকে তাকিয়ে এইসব দেখছিল আর ভাবছিল। এমন সময় ফিলিনা এসে মাদাম মেলিনার কথা তুলল। মাদাম মেলিনার পেটটা বড় হয়ে উঠেছে। অথচ তা ঢাকার চেষ্টা করছে না। ঐভাবেই সব কাজ করে যাচ্ছে। ফিলিনা বলল, এমন নির্লজ্জ মেয়ে কখনও দেখিনি আমি।
ওরা যখন এইসব কথাবার্তা বলছিল তখন ব্যারন এসে উইলেমকে ডাকলেন। ব্যারন বললেন, কাউন্ট আপনাকে সামান্য কিছু উপহার পাঠিয়েছেন। যদিও আপনার বুদ্ধি ও প্রতিভার সঠিক মূল্য দান করা সম্ভব নয়, তথাটি আপনার অমূল্য সময় ও শ্রম ব্যয়ের ক্ষতিপূরণস্বরূপ সামান্য কিছু দান করেছেন। এটা গ্রহণ করুন। আপনি তাঁর জন্য অনেক খেটেছেন। অনেক কিছু করেছেন।
এই বলে ব্যারন একটি থলি বার করে উইলেমের হাতে দিতে গেলেন। কিন্তু উইলেম বলল, দেখুন, এটা আমি নিতে পারব না। আমাকে ক্ষমা করুন। আমার মনে হচ্ছে এটা যদি আমি গ্রহণ করি তাহলে আমি যা কিছু তার জন্য করেছি তা সব পণ্ড হয়ে যাবে। তাহলে তাদের মধুর স্মৃতি কেমন যেন কলুষিত হয়ে যাবে আমার কাছে। আর তা হয়ে যাবে আমার স্বার্থপরতার জন্য। যেখানে টাকার ব্যাপার সেখানে কোনও প্রীতি বা শ্রদ্ধাসিক্ত কোনো স্মৃতি বেঁচে থাকতে পারে না।
তবু ছাড়লেন না ব্যারন। বললেন, তাহলে কি বলতে চান কাউন্ট আপনার কাছে ঋণী হয়ে থাকবেন চিরদিন? আপনি যদি তাঁর এ দান, এ উপহার গ্রহণ না করেন তাহলে তিনি ভাববেন আপনি এতে সন্তুষ্ট নন। তাহলে আমি কোন মুখে তার কাছে দিয়ে দাঁড়াব?
উইলেম শান্ত কণ্ঠে বলল, যদি বিবেকের নির্দেশ মানতে হয় তাহলে এ দান গ্রহণ করা আমার উচিত নয়? তবু এ দান আমি গ্রহণ করব বর্তমান প্রয়োজনের খাতিরে। বর্তমানে এই দলকে চালাতে হলে টাকার দরকার এবং মহামান্য কাউন্টের এই সদয় দান সে বিষয়ে যথেষ্ট সাহায্য করবে আমাদের। দলের সকলেই উপকৃত হবে এতে।
ব্যারন বললেন, সত্যিই এটা এক আশ্চর্যের কথা যে মানুষ মানুষের কাছ থেকে আর সব উপহার খুশির সঙ্গে গ্রহণ করে, কিন্তু একমাত্র টাকা নিতে চায় না। ভাবে টাকা নিয়ে ছোট হয়ে যাবে।
ব্যারন চলে গেলে নিজের ঘরের ভিতরে গিয়ে থলেটা খুলে উইলেম দেখল সব স্বর্ণমুদ্রা। গণনা করে দেখল যেদিন সে প্রথম হোটেলে এসে ওঠে এবং ফিলিনার সঙ্গে ফুল নিয়ে আলাপ হয়, সেদিন তার কাছে যে পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা ছিল, কাউন্ট তাকে আজ সেই পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা দান করেছেন। অনেকখানি আশস্ত হলো উইলেম। কাগজ-কলম টেনে নিয়ে বাড়িতে একটা চিঠি লিখতে বসল। চিঠিতে আশ্বাস দিল বাড়ির সকলকে। লিখল সে শুধু বাজে কাজে সময় ও অর্থ ব্যয় করছে না। তাতে কিছু লাভও হচ্ছে।
হঠাৎ স্টলমেস্তার এসে হাজির। সে বলল, তোমরা সবাই তৈরি হয়ে নাও। কাউন্ট ঘোড়া পাঠিয়ে দিচ্ছেন; ঘোড়ার অভাব হবে না। দিন কতকের জন্য তোমাদের বাইরে যেতে হবে। সব মালপত্র গুছিয়ে নাও।
উইলেম দেখল তার একটি বাক্স মাদাম মেলিনা নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করছে। উইলেম মিগননকে বলল, থাকগে, না দিক। অন্য বাক্স নিয়ে কাজ চালাও।
মেলিনা এসে বলল, আমরা বাইরে যাচ্ছি। এখানে যা হয় হোক। বাইরে যাবার সময় এবার একটু ভদ্রভাবে যেতে হবে আমাদের। তার জন্য মিগননকে মেয়ের পোশাক পরতে হবে। আর বীণাবাদককে দাড়ি কামাতে হবে।
কথাটা শুনে মিগনন আর বৃদ্ধ বীণাবাদক দুজনেই ক্ষেপে গেল। মিগনন উইলেমকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি বেটাছেলে, মেয়েছেলের পোশক পরব না। বৃদ্ধ গায়কও বলল, দাড়ি কামানো হবে না। তার জন্য তাকে দল ছাড়তে হলেও তার কোনও ক্ষতি নেই।
ফিলিনা বলল, কাউন্ট কিন্তু এই সব ভালোবাসেন। তাঁর মতে নাটকে মানুষ যে পোশাক পরে সে পোশাক যথাসম্ভব দৈনন্দিন বাস্তব জীবনেও ব্যবহার করা উচিত। যে দাড়ি গায়ককে রাত্রিবেলায় মঞ্চে পরতে হয় সে দাড়ি দিনের বেলাতেও পরা ভালো। তার মানে এই যে অভিনয় জীবনের সঙ্গে বাস্তব জীবনের ব্যবধানটা যত চলে যাবে ততই অভিনয়ও সহজ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
