কাউন্ট কিন্তু মোটেই রাগলেন না। শুধু কিছুটা গম্ভীর হয়ে রইলেন। শিকার থেকে হঠাৎ ফিরে এসে একটু বিশ্রাম করেই উইলেমকে ডেকে পাঠালেন। ভয়ে কাঠ হয়ে গেল উইলেম। ভাবল হয়তো কাউন্ট তার বিচার করবেন। শাস্তি দেবেন।
কিন্তু যা ভেবেছিল উইলেম তার কিছুই হলো না। কাউন্ট তাকে শুধু কতকগুলো নির্বাচিত কবিতা ও নাট্যাংশ পড়ে যেতে বললেন। উইলেম যতদূর সম্ভব ভালো করে পড়ে যেতে লাগল। পড়া শেষ হলে তিনি প্রশংসা করলেন তার আবৃত্তির। তারপর ভালোভাবেই বিদায় দিলেন।
ব্যারনপত্নী তাঁর প্রিয়পাত্র জার্নোকে কথাটা সব বললে জার্নো বলল, কাউন্ট নিশ্চয়ই মনে ভেবেছেন ওটা ওর প্রেতাত্মা। তাই ভয়ে কোনও কথা বলেননি। এর একমাত্র প্রতিকার হলো নানারকম ভূতপ্রেতের কথা বলে কাউন্টের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। তাঁর মনটাকে দুর্বল করে দিতে হবে। অতিপ্রাকৃতের প্রতি বিশ্বাসটাকে গাঢ় করে তুলতে হবে। হলো ঠিক তাই। কাছে পেলে বা সুযোগ পেলেই ব্যারনপত্নী ও জার্নো দুজন মিলে যত সব ভৌতিক ঘটনার কথা বলতে লাগল। কাউন্টও তাই বিশ্বাস করতে লাগলেন। তার মুখের হাসিখুশি আনন্দময় ভাবটা পাল্টে গেল দিনে দিনে। তিনি গম্ভীর হয়ে উঠলেন।
আবার একদিন হঠাৎ জার্নোর সঙ্গে দেখা হলো উইলেমের। তখন তার শেকস্পীয়ারের অনেক ভাল ভাল নাটক পড়া হয়ে গেছে। এক নতুন জগৎ আর এক অনাস্বদিতপূর্ণ রসের সন্ধান পেয়েছে সে নাটকের মধ্যে। তার জন্য সে ঋণী জার্নোর কাছে। সে ঋণ অকুষ্ঠ ভাষায় স্বীকার করল উইলেম। বলল, শেকসপিয়ারের প্রতিটি চরিত্র কেমন জীবন্ত, কেমন স্বাভাবিক। অথচ তারা প্রত্যেকেই মানব জীবনের এক একটা সমস্যাকে তুলে ধরেছে। তারা প্রত্যেকেই দেখাচ্ছে সব জীবনের মধ্যেই যেন একটা রহস্য আছে।
জার্নো খুশি হয়ে বলল, দেখো, তোমাকে দেখে একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হয়। তোমার বংশপরিচয় ও সাংসারিক অবস্থার কথা আমি কিছুই জানি না। তবু আমি– বলব তুমি এইভাবে আর থেকো না। কি হবে এ দলে থেকে? এই লোকগুলোর দ্বারা। কিছু হবে না, কোনও ক্ষমতা নেই তাদের। শুধু শুধু কি হবে এ দলে থেকে? তার থেকে তুমি আমাদের মাঝে চলে আসতে পার। যুবাজের সেবা করতে পার কাজের। মধ্য দিয়ে।
কথাটা কিন্তু মনঃপুত হলো না উইলেমের। মনে মনে বলল, জার্নো যাই বলুক, সে তার দল বা মিগননকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। ওরা যত অপদার্থই হোক ওদের মধ্যে প্রাণ আছে।
অবশেষে একদিন যুবরাজের যাবার দিন স্থির হয়ে গেল। কাউন্ট ঠিক করলেন ঐ দিন তাকে বিদায় সম্বর্ধনা জানানো হবে। উইলেম তার জন্য একটি নূতন কবিতা রচনা করে তা আবৃত্তি করল। সভায় কাউন্টপত্নী তার পানে সমানে তাকিয়ে দেখে সে কবিতা উপভোগ করলেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন।
সভাশেষে কাউন্টপত্নী ব্যারনপত্নীর সঙ্গে তাঁর ঘরে গিয়ে পৌঁছতেই উইলেমের ডাক পড়ল। কবিতার খাতা নিয়ে তাকে এই মুহূর্তে যেতে হবে কাউন্টপত্নীর ঘরে।
যে কবিতা দেখাতে গিয়ে আবৃত্তি করল উইলেম তা কবিতা হিসাবে সত্যিই ভালো। কিন্তু উইলেম মোটেই ভালোভাবে তা আবৃত্তি করতে পারল না। তার দৃষ্টি সব সময় নিবদ্ধ ছিল সুসজ্জিত কাউন্টপত্নীর উপর। কবি হিসাবে যে অঙ্গের অলঙ্কারকে এতদিন অর্থহীন বাহুল্য ও অপ্রয়োজনীয় আতিশয্য বলে গণ্য করে এসেছে, আজ স্বচক্ষে দেখল সেই অলঙ্কার আর বেশভূষার জৌলুস শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে কাউন্টপত্নীর অঙ্গ লাবণ্যকে। সে আরও দেখল কাউন্টপত্নীও ঘন ঘন তার দিকে তাকাচ্ছেন। কিন্তু কাউন্টপত্নীর এমন দৃষ্টি কোনওদিন দেখেনি। এক সূতীক্ষ বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে যাচ্ছিল যেন সে দৃষ্টির মধ্যে আর তার আঘাতে শিহরিত হয়ে উঠছিল উইলেমের সারা দেহ। তার সমগ্র মস্তিষ্কের মর্মমূল পর্যন্ত কেঁপে কেঁপে উঠছিল যেন সে আঘাতে।
উইলেম দেখল এর মাঝে ফিলিনা এসে কাউন্টপত্নীর তোষামোদ শুরু করে দিয়েছে। বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কাউন্টপত্নীর রূপের প্রশংসা করে বলতে লাগল, এমন বাহু না হলে এ ব্রেসলেট মানায় না, এমন গলা বা বুক না হলে এ হার মানায় না।
কাউন্টপত্নী কপট রাগের সঙ্গে বললেন, চুপ কর ফিলিনা। তোর এই সব ন্যাকামি সব সময় আর ভালো লাগে না।
ফিলিনা সে কথায় কান না দিয়ে উইলেমকে উদ্দেশ্য করে বলল, আজ এই শিল্পীকেও চমৎকার মানিয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় আজ ও কোনও গোপনস্থানে আপনার সঙ্গে মিলিত হলে ভালো হতো।
কপট রাগের সঙ্গে কাউন্টপত্নী বললেন, আমার কাছে আদর পেয়ে পেয়ে তোর স্পর্ধা বেড়ে গেছে ফিলিনা। এ ধরনের কথা আর কখনও বলিস না।
পড়া শেষ করে উইলেম বসেছিল একটি চেয়ারে। এমন সময় কাউন্টপত্নী একটা কৌটো থেকে একটা হীরের আংটি বার করে সেটি উইলেমের দিকে তুলে ধরে বললেন, আমার এই সামান্য উপহারটি গ্রহণ করবেন। আমি আপনার এমনই এক বান্ধবী যে শুধু আপনার উন্নতি ও মঙ্গল চায়।
উইলেম তার কবিতা লেখা একটি কাগজে নাম সই করে কাউন্টপত্নীকে দিয়ে বলল, এটা আমার নামের স্বাক্ষর। কিন্তু আপনার নামের স্বাক্ষর আমার অন্তরে মুদ্রিত হয়ে আছে। তা কখনও মুছে যাবে না। আপনার একগাছি চুল দেবেন? এই আংটির সঙ্গে জড়িয়ে রাখব?
ফিলিনা কাউন্টপত্নীর বাঁ হাতথানি ধরেছিল। উইলেম আবেগের বশে কাউন্টপত্নীর ডান হাতখানি তুলে নিল নিজের হাতের মধ্যে। এমন সময় ফিলিনা ও ব্যারনপত্নী। বেরিয়ে গেল ঘর হতে। বুঝতে পারল তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। নতজানু হয়ে কাউন্টপত্নীর পাশে বসল উইলেম। তাঁর ডান হাতখানি তখনও ছিল তার হাতের মধ্যে। এবার উইলেম কাউন্টপত্নীর হাতখানি চুম্বন করে বলল, এবার আমি যাই।
