কাউন্ট প্রতিদিন সকালে দলের অনেককে ডেকে পাঠাতেন। তাদের অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করতেন। তাদের সুখ-সুবিধার জন্য নজর রাখতেন। এক একদিন রাত্রিবেলায় খাবার পরও ভোজসভায় অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সামনেই তাদের ডাকা হতো। এদের দলের লোকেরা খুশি হতো। তাদের গুরুত্ব বেড়ে গেল।
কাউন্ট উইলেমকে আলাদাভাবে ডেকে একটা কথা বারবার বললেন। বললেন, ফরাসি নাট্যকার রেসিনের লেখা পড়। বই না থাকলে আমি দেব। আমার কাছ থেকে নেবে। আমাদের যুবরাজ নিজে রেসিনের ভক্ত। তাহলে তাঁর অনুগ্রহ পেতে তোমার দেবি হবে না।
কাউন্টের কথা শুনে রেসিন পড়ল উইলেম। তাঁর নাটকে অভিজাত সমাজের কথাই বেশি। যেন ভিন্ন এক জগৎ সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে। পড়তে সত্যিই ভালো লাগল তার।
কাউন্ট ও যুবরাজ উভয়েরই প্রিয়পাত্র জার্নো একদিন উইলেমকে বলল ভিন্ন এক কথা। শেকস্পিয়ার পড়েছে।
উইলেম বলল, না, কারণ যখন শেকস্পিয়ার জার্মানিতে খ্যাতি লাভ করে তখন নাট্যজগতের সঙ্গে আমার কোনও পরিচয় ছিল না। আমরা তখন ছোট। তবে শেকস্পিয়ার সম্বন্ধে আমি যেটুকু শুনেছি তাতে তো তাঁর নাটক পড়ার কোনও উৎসাহ পাইনি। কোনও আগ্রহ জাগেনি আমার মনে।
জার্নো বলল, আমি তোমাকে কিন্তু অনুরোধ করব একবার চেষ্টা করে জোর করে শেকস্পিয়ারের নাটক পড়তে। দেখবে অদ্ভুত এক রস পাবে তাতে।
এদিকে ব্যারন দলের লোকদের কাছে আচরণের ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব করতে লাগলেন। তিনি সেই বৃদ্ধ অভিনেতাতে বেশি পছন্দ করতেন। একদিন তাকে ডেকে একটা কোট উপহার দেন। তাতে দলের অন্যরা ঈর্ষাবোধ করে।
খাওয়া, থাকা ও মাইনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দলের লোকেরা ক্রমশই সোচ্চার দাবি জানাতে থাকে। সব ব্যাপারেই একটু বেশি সুবিধা চায় তারা। উইলেম কিন্তু কোনও ব্যাপারেই চোখ-কান দেয় না। সে একটা ঘরে দিনরাত শেকস্পিয়ারের নাটক নিয়ে পড়াশুনা করে। একমাত্র সেই বীণাবাদক ও মিগনন ছাড়া সে ঘরে ঢোকার আর কারো অনুমতি ছিল না। যখন নাটকের অনুষ্ঠান ও রিহার্সাল হতো তখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসত উইলেম।
একদিন রাত্রিবেলা চেঁচামেচি শুনে ব্যস্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল উইলেম। এসে দেখল ছোট একটা ছেলেকে নিয়ে ভিড় জমে গেছে। তাকে মারার ব্যবস্থা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানল সেই বৃদ্ধ হাস্যরসিক অভিনেতা সন্ধের পর ব্যারনের সঙ্গে দেখা করে অন্দরমহল থেকে নিচের তলায় নেমে আসছিল তখন এই চোর ছেলেটা বাইরের থেকে লুকিয়ে প্রাসাদে ঢুকে উপরে আসছিল। ওর কাছে ধাক্কা খেয়ে বৃদ্ধ পড়ে যায়। তার চিঙ্কারে লোক ছুটে এসে ধরে ফেলে ছেলেটাকে। তারপর কাউন্টকে খবর দেওয়া হয়। ব্যারণ ও স্টলমেস্তার ছুটে আসে।
উইলেম দেখল, ছেলেটা ফ্রেডারিক। হোটেল থেকে সেদিন স্টলমেস্তারের কাছ থেকে লাথি খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আবার হঠাৎ আজ কোথা থেকে এসে হাজির। ফ্রেডারিককে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে এসে ঘটনাটা কি তা জিজ্ঞাসা করল উইলেম। ফ্রেডারিক বলল, সে খোঁজখবর নিয়ে ফিলিনার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিল। হঠাৎ বুড়োটার গায়ে ধাক্কা লেগে যায়। তার কোনও দোষ নেই। উইলেম স্টলমেস্তার ও কাউন্টকে অনুরোধ করে, ওকে ছেড়ে দিতে। আমি চিনি ছেলেটাকে। ফিলিনার কাছে যাচ্ছিল সেকথা গোপন করে গেল উইলেম। ওরা ছেলেটাকে ছেড়ে দিল। উইলেম তাকে ডাকল।
ফ্রেডারিক সোজা উইলেমের ঘরে চলে গেল।
ফিলিনা আর ব্যারনপত্নী দুজনে মিলে একটা ষড়যন্ত্র করছিল। তারা কিছুদিন ধরে চাইছিল কাউন্টপত্নী আর উইলেম ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠুক পরস্পরের সঙ্গে। তারা তাই ঠিক করল একদিন নির্জন ঘরে দুজনের মিলন ঘটাতে হবে।
একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে একটা সুযোগ পেয়ে গেল ওরা। কাউন্ট শিকারে চলে গেলেন। বললেন, আজ-কাল দুদিন আসবেন না। ব্যারনপত্নী সোজা উইলেমের কাছে এসে তাকে অনেক করে বলে রাজি করালেন।
কাউন্টপত্নীর প্রতি উইলেমের আসক্তির কথাটা তিনি জানতেন। ঠিক হলো উইলেম কাউন্টের পোশাক পরে তাঁর শোবার ঘরে বসে থাকবে। তখন হঠাৎ তারা কাউন্টপত্নীকে পাঠিয়ে দেবে সে ঘরে। প্রথমে বুঝতে না পেরে স্বামী ভেবে কাঁধে হাত রেখে আদর করবেন। কি মজা হবে। উইলেম ভয় পেয়ে গেল। যদি পরে রেগে যান কাউন্টপত্নী? এই প্রতারণা যদি পছন্দ না করেন?
ব্যারনপত্নী বললেন, সে ভার আমার। তোমাকে ভাবতে হবে না।
ব্যারনপত্নী জানতেন উইলেমের প্রতি কাউন্টপত্নীর একটা দুর্বলতা আছে। একটা গোপন আসক্তি আছে। তাই উপরে যাই বলুন খুশি হবেন মনে মনে।
যে কথা সেই কাজ। উইলেমকে অন্য পথে কাউন্টের ঘরে নিয়ে গিয়ে সাজিয়ে দিলেন ব্যারনপত্নী। তাকে কাউন্টের টুপি, কোট প্রভৃতি প্রিয় পোশাকে সাজিয়ে চেয়ারে বসিয়ে রেখে কাউন্টপত্নীকে ডাকতে গেলেন।
চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ ভূত দেখে যেন চমকে উঠল উইলেম। ঘরের একদিকের দরজা খুলে কাউন্ট ভিতরে ঢুকে তাকে একবার চকিতে দেখেই দরজা বন্ধ। করে চলে গেলেন। শিকার থেকে অকস্মাৎ কাউন্ট ফিরে এসেছেন জানতে পেরে ভয়ে আঁতকে উঠল উইলেম। সে বুঝে উঠতে পারল না কাউন্ট তাকে এই জঘন্য অপরাধের জন্য কি শাস্তি দেবেন।
কথাটা ব্যারনপত্নীও জানতে পেরে ছুটে এলেন উইলেমকে বাঁচাবার জন্য তিনি তাড়াতাড়ি উইলেমকে বার করে তাঁর নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে পোশাক খুলে দিলেন। তাকে ছেড়ে কাউন্টকে সামলাবার জন্য চলে গেলেন।
