কাহিনী হলো। পাড়াগাঁয়ের এক শান্ত প্রকৃতির পরিবেশে একদল কৃষক বালক বালিকা নাচছিল। নাচের শেষে তারা একটা গান গাইবে সমবেত কণ্ঠে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের দলের এক বৃদ্ধ বীণাবাদক মিগননকে অর্থাৎ এক বালিকাকে নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করবে। বীণাবাদক বীণা বাজিয়ে শান্তিও আনন্দের গান গাইবে আর বালিকাটি ডিম সহযোগে এক নাচ দেখাবে। এমন সময় সহসা সামরিক সঙ্গীত শুনে চমকে উঠবে তারা। হঠাৎ একদল সৈনিক এসে হাজির সেখানে। তারা বালিকাটিকে ধরতে যাবে। বৃদ্ধ গায়ক বাধা দিতে গিয়ে বন্দি হবে। বালিকাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে তারা। এমন সময় আবির্ভাব ঘটবে সামরিক নেতার। এই নেতাই হবে নাটকের নায়ক। সে হবে একই সঙ্গে সামরিক অধিনায়ক এবং কাহিনীর নায়ক। সে এসে সকলের সব অভিযোগের প্রতিকার করবে। দেশে শান্তিও শৃঙ্খলা স্থাপন করবে। তার সম্মানার্থে সারা দেশ জুড়ে অনুষ্ঠিত হবে এক বিরাট আনন্দোৎসব।
নাটকের কাহিনী শুনে খুশি হলেন কাউন্টপত্নী। তবে শুধু বললেন, কাউন্টকে খুশি করার জন্য কিছু রূপক ঢুকিয়ে দেবেন। ব্যারণ পরামর্শ দিলেন ঐ সামরিক অধিনায়ককে প্রতিহিংসা ও যুদ্ধবিবাদের এক অপদেবতারূপে উপস্থাপিত করা যেতে পারে। এরপর শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী মিনার্ভা এসে তাকে বশীভূত করবে। হঠাৎ উইলেমের মনে পড়ে গেল কাউন্টের কথাটা। কাউন্টও এক সময় তাকে বলেছিলেন মিনার্ভাকে নাটকের কোথাও ঢুকিয়ে দিতে অর্থাৎ তার সম্পর্কে কোনও এক নাটকের অবতারণা করতে। যাই হোক, ঠিক হলো লার্তেস করবে ঐ সেনাপতি ও নায়কের ভূমিকা। এরপর অন্য অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের ভূমিকা বুঝিয়ে দিল। কিন্তু সকলে একবাক্যে উইলেমকে কোনও একটা ভূমিকা গ্রহণ করতে বলল। অবশেষে সকলের অনুরোধ উপেক্ষা না করে রাজি হলো উইলেম। সে ঠিক করল এক কৃষক নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে সে এবং কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করবে সেই সুযোগে।
কাউন্টপত্নী মুস্কিলে পড়লেন তার স্বামীকে নিয়ে। কাউন্ট যে ধরনের নাটক চেয়েছিলেন এ নাটক তা হবে না। তবে তাঁর পছন্দমতো কিছু কিছু ঘটনা এবং চরিত্র থাকবে। তখন ব্যারনপত্নী ও জার্নো নামে এক কর্মচারী বলল, রিহার্সালের সময় বিভিন্ন কাজে ও কথায় এমনভাবে তারা ভুলিয়ে রাখবে কাউন্টকে যে তিনি ভালো করে পুরো নাটকটার রিহার্সাল দেখতেই পাবেন না।
এদিকে উইলেমও একটা বিপদে পড়ল। মিগনন ডিমের নাচ নাচতে রাজি হচ্ছে না। আসলে সে চায় না উইলেম এইভাবে নাটক নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত থাকুক। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, না বাবা, আমি মঞ্চে নাচতে পারব না। আর তুমি ওসব ছেড়ে দাও।
অবশেষে যুবরাজ এসে গেলেন। তিনি শুধু দেশের রাষ্ট্রনেতা নন, একজন সদাশয় ব্যক্তি। প্রাসাদদ্বারে এক বিরাট অভ্যর্থনা জানানো হলো তাঁকে। কাউন্ট এক হুকুম জারি করে বললেন কোনও অভিনেতা যেন এককভাবে যুবরাজের সামনে না যায়। তারা সমবেতভাবে মঞ্চে অবতীর্ণ হবে এবং অভিনয় শেষে পরিচিত হবে তার সঙ্গে।
প্রথমে উইলেমের লেখা প্রশস্তি পাঠ করা হলো। খুশি হলেন যুবরাজ। তারপর। সন্ধে হতেই আলোকমালায় সুসজ্জিত এক বিরাট প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে যাওয়া হলো যুবরাজকে। নাটক শুরু হলো। সকলেই আপন আপন সাধ্যমতো অভিনয় করল। নাটক শেষে যুবরাজ প্রীত হলেন। তিনি সব অভিনেতাদের সঙ্গে পরিচিত হলেন। বিশেষ করে নাট্যকার উইলেমের সঙ্গে কিছু কথা বললেন।
এরপর রোজ সন্ধের সময় সেই প্রাসাদ অন্তর্গত প্রেক্ষাগৃহে সেই একই নাটক মঞ্চস্থ করে চলল ওরা। নাটক দেখার জন্য দূর গ্রাম-গ্রামান্তর হতে প্রচুর লোক আসতে লাগল। প্রাসাদে অনেক অতিথিও আসতে লাগল। ব্যারন, কাউন্ট প্রভৃতি আত্মীয় স্বজনরা আসতে লাগল বিভিন্ন জায়গা থেকে।
কিন্তু উইলেমের কেবলি মনে হতে লাগল সাধারণ মানুষের ভালো লাগলেও তাদের নাটক বিদগ্ধজনের তেমন ভালো লাগেনি। যুবরাজ একবার করে এসে বসলেও বেশিক্ষণ থাকেন না। তাছাড়া কোনও উচ্চশিক্ষিত রসিকজনও তাদের নাটক আগ্রহভরে শোনেন না।
তবে উইলেমের একটা ব্যাপার খুব ভালো লাগল। সে লক্ষ করল, সে যখন মঞ্চে অভিনয় করে বা কবিতা আবৃত্তি করে তখন কাউন্টপত্নী একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। সে দৃষ্টির অর্থ বুঝতে কষ্ট হয় না উইলেমের। সে নিজেও যখন অভিনয় করে মঞ্চে, কাউন্টপত্নীর মুখপানেই তাকিয়ে থাকে। কাউন্টপত্নীর প্রতি এক আবেগঘন আগ্রহ ও আসক্তি বেড়ে যেতে থাকে উইলেমের। তীক্ষ্ণ গভীর দুটি দৃষ্টির পথ ধরে তাদের দুজনের অন্তর যেন জন্ম, সমাজ ও পরিবেশ প্রভৃতি অনেক দুস্তর ব্যবধান পার হয়ে কাছে এসে পড়ে পরস্পরের।
এদিকে লার্তেসের প্রতি বেশ কিছুটা আকৃষ্ট হয়ে পড়েন ব্যারনপত্নী। লার্তেও ব্যারনপত্নীর প্রতি আসক্ত হয়ে উঠল রীতিমতো। একদিন না বুঝে ভুল করে ব্যারনের কাছে তাঁর পত্নীর প্রশংসা করতে থাকে লার্তেস। ব্যারনপত্নী নারীজাতির মধ্যে এক অমূল্য রত্ন, সর্বগুণে ভূষিতা-এই ধরনের কথা বলল লার্তেস। ভেবেছিল স্ত্রীর প্রশংসা শুনে খুশি হবেন ব্যারন। কিন্তু তার ফল হলো উল্টো।
লার্তেসের বলা গুণাগুণ শুনে ব্যারন মৃদু হেসে বললেন, অপরিচিত ব্যক্তিরা যারা ওর সংস্পর্শে আসে তারই একথা বলে। কত প্রৌঢ়, কত যুবক ওর একটুখানি কৃপা পাবার জন্য কত সেবা করে।
