কিন্তু প্রাসাদের সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড়াতেই কেউ কোনো খোঁজখবর নিতে এল না। ওরা গাড়ি থেকে নেমে মালপত্র নামিয়ে বৃষ্টিতে একরকম ভিজতে লাগল। অনেকক্ষণ পর স্টলমেস্তার আলো নিয়ে এসে মেলিনাকে নিয়ে গেল ভিতরে। তার অনেক পরে একজন আলো হাতে এসে ওদের একটা ঘর খুলে দিল। সকলেই বাক্স পেটরা নিয়ে সেই ঘরে ঢুকল; পাশাপাশি দুটো বড় ঘর। কিন্তু কোনও আসবাবপত্র বা বিছানাপত্র নেই। কোনও খাবারেরও ব্যবস্থা নেই।
অনেকে অধৈর্য হয়ে উঠল। চেঁচামেচি করতে লাগল। কাউন্টপত্নীর একজন দাসী এসে উইলেমকে অন্য একটি ঘরে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু উইলেম রাজি হলো না তাতে। এতগুলো লোককে অসুবিধায় রেখে সে একা সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।
অবশেষে প্রায় গভীর রাতে সকলের জন্য খাদ্য-পানীয় ও প্রয়োজনীয় বিছানাপত্র এল। মেয়েরা সবাই একটা ঘরে আলাদা রইল। পুরুষেরা রইল অন্য একটা ঘরে। ঠাণ্ডার জন্য ঘরে আগুন জ্বালাল। কিন্তু ঘরের চিমনিটার মুখ ব্যবহারের অভাবে বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বার হলো না। ফলে সব ধোয়া ঘরে মধ্যেই ঘুরপাক খেতে লাগল। তাতে ঠাণ্ডার থেকে বেশি কষ্ট হতে লাগল সকলের।
যাই হোক, সকলে খাওয়ার পর মধ্যরাত্রিতে শুয়ে পড়ল। কিন্তু পাশাপশি শোবার জন্য একে অন্যের গায়ে খোঁচা দিয়ে বারবার রসিকতা করতে লাগল। তাতে সকলেরই ঘুমের ব্যাথাত ঘটতে লাগল। তবু ভালো, শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের অভাবটাকে রসিকতার আনন্দ দিয়ে ভরিয়ে দিতে চাইল। পরদিন কাউন্ট আসার সঙ্গে সঙ্গে সকলে একসঙ্গে চরম অব্যবস্থার অভিযোগ তুলল। অভিযোগ শুনে অবাক হয়ে গেলেন কাউন্ট। কারণ। তিনি প্রাসাদের স্টিউয়ার্ডকে তাদের দেখাশানার সব ভার দিয়ে গিয়েছেন। তাদের আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য থাকা-খাওয়ার যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, তার জন্য। লক্ষ্য রাখতে বলেছেন। কিন্তু তারা যথাকর্তব্য পালন করায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে ডেকে ভৎর্সনা করলেন কাউন্ট। কাউন্টের সঙ্গে সঙ্গে ব্যারনও এলেন। তিনি গতকাল ঘোড়া থেকে কোথায় পড়ে গিয়েছিলেন বলে পায়ে চোট লেগেছে। তাই খোঁড়াচ্ছিলেন।
কাউন্ট মেলিনাকে সঙ্গে করে এক জায়গায় নিয়ে গেলেন। নাটক মঞ্চস্থ করার জায়গাটা নির্বাচিত হলো। মঞ্চ নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
এদিকে দলের ম্যানেজার হিসাবে মেলিনা এক আদেশ জারি করে হাতে লিখে তা টাঙিয়ে দিল ঘরের দেওয়ালে ও দরজার সামনে। তাতে স্পষ্ট লেখা ছিল দলের প্রতিটি অভিনেতা অভিনেত্রীদের থেকে পৃথকভাবে অবস্থান করবে। তারা কোনও অবস্থাতেই কারও সঙ্গে অশোভন আচরণ করবে না। যদি কেউ এই নির্দেশ অমান্য করে তাহলে তাকে জরিমানা দিতে হবে।
দলের লোক যাই করুক, প্রাসাদের অফিসার বা উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা প্রায়ই এই নির্দেশ ভঙ্গ করতে লাগল। তারা যখন-তখন ঘরে এসে অভিনেত্রীদের সঙ্গে রসিকতা করতে লাগল।
একসময় ব্যারন এসে উইলেমকে কাউন্টপত্নীর কাছে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। ব্যারন বললেন, আপনার যে যে লেখা কবিতা ভালো লাগে তার কিছু নিয়ে যাবেন কাউন্টপত্নীর কাছে। তাঁকে শোনাবেন। তিনি বড় সমঝদার।
উইলেম রাত্রিতে অনেক ঘেঁটে কিছু পুরনো লেখা থেকে বাছল। আবার কিছু লিখল নূতন। তারপর ভালো করে নির্বাচন করে পকেটে রেখে দিল। সত্যি সত্যি এক সময় ডাক পড়ল তার।
অন্দরমহলে একটি ঘরে গিয়ে উইলেম দেখল কাউন্টপত্নীর কাছে ব্যারণ-পত্নী বসে রয়েছে। তার উপর ফিলিপ বসে রয়েছে কাউন্টপত্নীর পায়ের কাছে। ফিলিনা খুব চালাক। সে কাউন্টপত্নীর কাছে কাছেই প্রায় সব সময় থাকে। তাকে গান শুনিয়ে হাসির কথা বলে আনন্দ দেয়, নানারকমের উপহার আদায় করে।
কাউন্টপত্নী উইলেমের দিকে আগ্রহভরে তাকালেন। দু-একটা কথা বললেন কিন্তু তার লেখার কথা কিছু বললেন না। উইলেমও তা বার করতে সাহস করল না। করত যদি অনবরত নানা ধরনের লোক আসা-যাওয়া না করত। অবশেষে ঘণ্টাখানেক বৃথা অপেক্ষা করার পর চলে গেল উইলেম। কিন্তু কাউন্টপরী তার কবিতা না শুনলেও যথাসময়ে তিনি তাঁর দাসীকে দিয়ে দুটো উপহার পাঠিয়ে দিলেন উইলেমকে। একটা ছোট পকেট বই ইংল্যান্ডের আমদানি, আর একটা ফুলগোজা দামী ওয়েস্টকোট। বিরক্তির সঙ্গে সঙ্গে একটু কৃতজ্ঞতা অনুভব না করে পারল না উইলেম।
এদিকে কি ধরনের নাটক মঞ্চস্থ হবে, কিসে খুশি হবেন যুবরাজ তা নিয়ে বাকবিতণ্ডা চালাতে লাগলেন কাউন্ট। যুবরাজের আসতে আর বেশি দিন বাকি নেই। কাউন্ট উইলেমকে একটা ভূমিকা লিখতে বললেন প্রথমে। নাটক শুরু হবার আগে একটা দীর্ঘ ভূমিকা থাকবে যা শুনে যুবরাজ যেন খুশি হন। উইলেম কথা বলে বুঝল আসল জীবনের ঘটনার থেকে প্রতীক আর রূপক বেশি ভালোবাসেন কাউন্ট। ব্যারন এক সময় উইলেমকে বললেন, কাউন্ট যা বলে বলুক। তুমি যে নাটক পছন্দ করো তার গল্পটা একবার কাউন্টপত্নীকে শুনিয়ে তাঁর মত নিয়ে আসবে। তাহলে আর কিছু ভাবতে হবে না।
ব্যারনপত্নী কাউন্টপত্নীর সঙ্গে উইলেমের এক গোপন সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দিল। পিছনের দরজা দিয়ে নিয়ে গেল তাকে। কাউন্টপত্নীর কাছে তখন মাত্র তার এক বান্ধবী বসে ছিল। তার সামনেই তার নাটকের মূল পরিকল্পনার কথাটা বলল উইলেম। সুন্দর করে আবেগের সঙ্গে বুঝিয়ে দিল তার আবেদনের কথাটা।
