কাউন্টপত্নীর গাউনের আঁচলটাকে চুম্বন করে ফিলিনা। সরলভাবে হাসিমুখে বলল, সামান্য এক অভিনেত্রী, আপনার সেবায় সতত প্রস্তুত।
এদিকে কাউন্টের চারদিকেও অন্যান্য অভিনেতারা ভিড় করেছে। এতগুলো অভিনেতাকে একটি হোটেলের মধ্যে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন কাউন্ট। স্ত্রীকে বললেন, এরা যদি ফরাসি হতো তাহলে এদের দিয়ে রাজপ্রসাদে একটা নাটক করিয়ে রাজাকে প্রীত করতাম।
কাউন্টপত্নী বললেন, হলেই বা এরা জার্মান। এদের দিয়েও করানো যেতে পারে। এদের দলে যখন এতে লোক রয়েছে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া ব্যারন ওদের সাহায্য করতে পারেন।
এরপর কাউন্ট একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন এই দলের ম্যানেজার কে, কত জন অভিনেতা আছে। মেলিনা এগিয়ে এসে ম্যানেজার হিসাবে পরিচয় দিল। কাউন্ট তখন সব অভিনেতাদের জড়ো করে বললেন এক জায়গায়। তিনি একজন নাট্যসমালোকও বটেন। তিনি নিজে সবাইকে দেখে অভিনেতাদের যোগ্যতা সম্বন্ধে একটা আঁচ করে নেবেন। সবশেষে বললেন, তোমার কোন নাটকটা মঞ্চস্থ করতে চাও তা জানাবে।
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সকলকে দেখার পর কাউন্ট সবচেয়ে খুশি হলেন সেই বৃদ্ধ অভিনেতাকে দেখে যে দুটি মেয়ে নিয়ে একদিন এসে ওঠে এই হোটেলে এবং যে একদিন মেরিয়ানার সঙ্গে উইলেমদের শহরে এক মঞ্চে অভিনয় করত। অথচ মেলিনা তাকে কাউন্টের সামনে হাজির করেনি। সে ঘরের এক কোণে বসেছিল। কাউন্ট বললেন, এ যে কোনও অভিনয় করতে পারবে।
বৃদ্ধ আধ-ময়লা আধ-ছোঁড়া পোশাক পরে মাথা নত করে কাউন্টের সামনে এসে দাঁড়াল। কাউন্ট বললেন, হাস্যরসের ভূমিকা তো বটেই তাছাড়া যে কোনও ভুমিকায়
অভিনয় কররার যোগ্যতা এর আছে। আমরা চোখ-মুখ দেখলেই বুঝতে পারি।
ফিলিনা এদিকে উইলেমকে তার উপরকার ঘর থেকে জোর করে নিয়ে এল কাউন্টপত্নীর কাছে। তার কথা কাউন্টপত্নীর কাছে আগেই বলেছিল ফিলিনা। বলেছিল, আর একজন শিক্ষক ও সুন্দর যুবক আছে আমাদের দলে। সে নাটক ও কবিতা লিখতে পারে।
কাউন্টপত্নীকে নমস্কার করে দাঁড়াল উইলেম। তার পানে গভীর আগ্রহভরে তাকিয়ে লজ্জায় মাথাটা নত করলেন কাউন্টপত্নী। কাউন্টপত্নীকে দেখে ভালো লাগল উইলেমের। কাউন্টপত্নী বয়সে যুবতী এবং সুন্দরী। তাঁর চোখ-মুখে চমৎকার একটা মার্জিত ভাব।
এমন সময় কাউন্ট ফিরে এলে উইলেমের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু কাউন্ট তার প্রতি কোনও বিশেষ মনোযোগ দিলেন না। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে রাজপ্রাসাদে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। কাউন্টপত্নী উইলেমের পানে তাকিয়ে বললেন, আবার আমাদের দেখা হবে। এখন চলি।
তারপর ফিলিনাকে কাউন্টপত্নী বললেন, তুমি কিন্তু আবার আমার কাছে আসবে মেয়ে। তবে পোশাকটা একটু ভালো পরবে।
ফিলিনা বলল, আমার এর থেকে ভালো পোশাক নেই।
কাউন্টপত্নী তখন সঙ্গে তার প্রতীক্ষমানা এক সহচরীকে একটা সিল্কের গলবন্ধনী আর একটা টুপি আনতে বললেন। তার নিজের হাতে তা ফিলিনাকে পরিয়ে দিলেন।
কাউন্টের কথায় রাজপ্রাসাদে একখানা নাটক মঞ্চস্থ করার ব্যাপারে যাবতীয় ব্যবস্থাদি করার জন্য এক ব্যারনও সামন্ত এসে কথা বলতে লাগল মেলিনার সঙ্গে। মেলিনা এটার প্রতীক্ষা করছিল। তার প্রত্যাশা অনেক এ বিষয়ে। রাজপ্রাসাদে অনুষ্ঠান করার জন্য বায়না হলেই তার দল জাতে উঠে যাবে। প্রথম কথা ওই অনুষ্ঠানের জন্য যে টাকা সে পাবে তাতে উইলেমের ঋণ অর্ধেক শোধ হয়ে যাবে। দ্বিতীয় কথা হলো এই যে, শহরে তাদের দলের নামটা ছড়িয়ে যাবে এর ফলে।
যাই হোক, প্রথম কথা হলো নাটক বাছাই। তারপর অভিনেতাদের মধ্যে অভিনয়ের ভূমিকা বিতরণ। ব্যারণ আসার সঙ্গে সঙ্গে মেলিনা বলল, আমাদের দলের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী উইলেম খুব ভালো কাব্যনাটক লিখতে পারেন। ব্যারণ তা দেখতে চাইলেন। উইলেমের লেখা মোটামুটি পছন্দ হলো ব্যারনের। ব্যারণ উইলেমকে প্রাসাদে যাবার জন্য নিয়ন্ত্রণ করলেন। সেখানে গেলে কাউন্টপত্নীর সঙ্গে দেখা হবে ভেবে মনে মনে উল্লসিত হলো উইলেম। মেলিনারও গর্বে ভরে গেল বুকটা।
লার্তেসকে দেওয়া হলো প্রেমিকের ভূমিকা। ফিলিনাকে দেওয়া হলো প্রেমিকার দাসীর ভূমিকা। বৃদ্ধকে দেওয়া হলো হাস্যরসের এক ভূমিকা, তাঁর মেয়েদের দেওয়া হলো প্রেমিকার ভূমিকা। মেলিনা নিজে নিল বীরত্বব্যঞ্জক এক ভূমিকা। উইলেম কিছুই নিল না। মেলিনা বারবার তাকে কোনও না কোনও ভূমিকা গ্রহণের জন্য জ্বালাতন করতে লাগল। উইলেম কোনও ভূমিকা নিল না। তা না নিয়ে সে নাটকের দিকে মন দিল। এরপর প্রস্তুতির পালা। রীতিমতোভাবে রিহার্সাল দিতে হবে। দিনের পর দিন চলতে লাগল রিহার্সাল।
অবশেষে একদিন প্রাসাদে যাবার খবর এল। গোটা দলটাকে রাজপ্রসাদে গিয়ে দিনকতক থাকতে হবে। ওরা সেখানে গেলে প্রাসাদের সীমানার ভেতরেই কোনও এক সুবিধাজনক জায়গা বেছে নিয়ে মঞ্চ তৈরি কর হবে। ব্যারন কথা দিলেন সেখানে কাউন্ট ও কাউন্টপত্নী আছে। ওরা গেলে থাকা-খাওয়ার কোনও অসুবিধা হবে না।
কিন্তু যাবার দিন সকাল থেকে বৃষ্টি নামল। তবু দলের সবাই যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। দু-তিনটে ঘোড়ার গাড়িতে সব মালপত্র তুলে দেওয়া হলে ওরা সবাই চেপে বসল। হোটেলের মালিকও গেল ওদের সঙ্গে। বিকালের দিকে গাড়ি ছাড়ল। বন, উপত্যকা ও গ্রাম ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল গাড়িগুলো বৃষ্টির জল আর কনকনে ঠাণ্ডাকে উপেক্ষা করে। সন্ধ্যা হতেই একটা পাহাড়ের উপর দিয়ে যেতে যেতে প্রাসাদের আলো দেখা গেল দূর থেকে। যাত্রীরা আশ্বস্ত হলো। সকলেই ভাবতে লাগল ঐ প্রাসাদের আলোকোজ্জ্বল এক-একটি প্রশস্ত কক্ষে তারা পাবে আরামঘন আশ্রয়।
