উইলেম দেখল মেঝের উপর ছোট একটি বিছানায় বসে আছে বৃদ্ধ। এছাড়া আর কোনও আসবাব নেই। উইলেমও সেখানে বসে বলল, গান শোনাবার এটাই হলো উপযুক্ত জায়গা। যেখানে অন্য কোনও মানুষ নেই সেখানেই আপনার আত্মা ধরা দেবে আপনার কাছে। যে গান আমাকে শোনাতে চেয়েছিলে সেই গান আমাকে শোনাও বন্ধু।
গান শুনে হোটেলে ফিরে এসে উইলেম দেখল মেলিনা একজন উকিল সঙ্গে করে টাকা ধার করতে এসেছে তার কাছে। উইলেম তাকে তিনশো ক্রাউন দিল। মেলিনা তার বিনিময়ে থিয়েটারের মালপত্র সব বন্ধক রাখল তার কাছে। বলল, কাল সকালে সেগুলো তার কাছে নিয়ে আসবে। মেলিনা চলে গেলে হঠাৎ ফ্রেডারিকের চিৎকার শুনে বাইরে গিয়ে দেখল তার সামনে মিগনন অবাক হয়ে দেখছে ফ্রেডারিককে। ফ্রেডারিক পাগলের মতো চেঁচাচ্ছে। আসল ঘটনাটা জানতে পারল হোটেলের মালিকের কাছ থেকে। আসল কথা হলো স্টলমেস্তার প্রথম দেখার সঙ্গে সঙ্গে ফিলিনার প্রেমে পড়ে গেছে। ফিলিনার কাছে একসঙ্গে খেতে চায়। ফিলিনা ফ্রেডারিককে খাবার টেবিল সাজাতে বলে। ফ্রেডারিক স্টলমেস্তারকে দেখেই রেগে যায়। তার উপর খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে যখন দেখে স্টলমেস্তার ফিলিনার পা ঘেঁসে বসে রয়েছে তখন সে খাবার সমেত একটা প্লেট স্টলমেস্তারের গায়ে ফেলে দেয় আর অসতর্কতার ভান করে। তাতে সে প্রতিশোধের আনন্দে নিজেই হেসে ওঠে আর স্টলমেস্তার তাকে একটা লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দেয়। তাই বাইরে এসে ফ্রেডারিক পাগলের মতো শাসাচ্ছে। সে দেখে নেবে স্টলমেস্তারকে।
কথাটা শুনে উইলেমের মনেও ঈর্ষা জাগল। জাগল লার্তেসের মনেও। তারা ভাবতেই পারেনি এত সহজে একজন বয়োপ্রবীণ আগন্তুকের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেবে ফিলিনা।
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলল উইলেম। সে কালই বাড়ি চলে যাবে। আর এখানে একদিনও থাকবে না। নিজের ঘরে বসে বিছানায় শুয়ে আপন মনে বলে উঠল, আমি চলে যাব। তার বিষাদ দেথে মিগনন কাছে এসে বলল, কি হয়েছে মালিক।
উইলেম বলল, আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি রে।
মিগননের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। কাঁদ-কাদ গলায় বলল, আমি তাহলে কোথায় যাব মালিক? আমাকে ছেড়ে তুমি চলে যাবে?
হঠাৎ উইলেমের মনে হলো মিগনন হয়ত পড়ে যাবে। মূৰ্ছিত হয়ে পড়বে। সে তাকে ধরে নিল। জড়িয়ে ধরল। বারবার বলতে লাগল, আমি তোকে ছাড়ব না। চিরদিন আমার কাছেই রেখে দেব বাছা। আমার মেয়ের মতো থাকবি। হঠাৎ চোখ মেলে মিগনন বলল, তুমি আমার বাবা। আমি তোমার সন্তান।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
পরদিন সকালে উঠে মিগননকে প্রথমে দেখতে পেল না উইলেম। কিছুক্ষণ পরেই একটা যন্ত্র হাতে গান গাইতে গাইতে ঘরে ঢুকল মিগনন। সে গানের বাণী বড় চমৎকার! যেখানে আছে থোকা থোকা ফোঁটা ফুলে ভর্তি লেমন গাছ, আছে লম্বা লরেল আর ঘনসন্নিবিশস্ট মার্বেল, যেখানে ঘনকৃষ্ণ পাতার ফাঁকে ফাঁকে সোনার বরণ কমলালেবু দোল খায় আর অদূরের নীল সমুদ্র থেকে ঝাঁকে ঝাকে দুরন্ত বাতাস এসে খেলা করে এই সব গাছদের সবুজ সংসারে, জান কি সে জায়গা কোথায়? জান কি সে দেশে কোন দিকে? হে পিতা, হে আমার পিতা, আমি তোমাকে নিয়ে যাব সেই দেশে।
গাণের বাণীটা ভালো লাগায় কাগজে টুকে নিল উইলেম।
এদিকে গান শেষ হতেই মেলিনা ডাক দিল দরজার বাইরে। একটু আগে সে টাকা মিটিয়ে দিয়ে থিয়েটারের পোশাকগুলো নিয়ে এসেছে। এবার সে হাতের কাছে যে সব অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছে তাদের নিয়ে চমৎকার একটা দল গড়তে পারে। উইলেমকে জানাবার মতো কৃতজ্ঞতার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না মেলিনা। সে বলল, আপনি আমাকে এই বিপদে সাহায্য করে যে মমতাপূর্ণ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না আমি। আমি এবার এখানে আমার যে সব বেকার অভিনেতা বন্ধুরা রয়েছেন তাদের কাজ দিতে পারব। আপনার সঙ্গে আমার যখন প্রথম দেখা হয় তখন থিয়েটার ও অভিনয়ের প্রতি আমার গভীর বিতৃষ্ণা প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু বিয়ের পর এ ধারণা পাল্টাতে বাধ্য হয়েছি আমি। আমার স্ত্রী আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেও অভিনয় করবে এবং এর দ্বারা জীবনের চরম আনন্দ আর জনগণের প্রশংসা দুটোই অর্জন করবে। আমিও এখনও এটাকে পেশা হিসাবেই নিতে চাই।
মেলিনার কথাগুলো শুনে খুশি হলো উইলেম। দেখল মেলিনার স্বভাবটা বদলে গেছে একেবারে। এখন সে সকলের প্রতি প্রতিটি আচরণে ভদ্র ও সৌজন্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উইলেমের কাছ থেকে বেরিয়ে মেলিনা প্রতিটি অভিনেতার সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করতে লাগল। তার দলের যারা আসলে অভিনয় করবে তার শর্তাবলি সব জানিয়ে দিল তাদের। আপাতত অবশ্য তাদের বেশি বেতন দিতে পারবে না। কিন্তু দল একবার দাঁড়িয়ে গেলে তারা লাভবান হবে সকলে।
এই সব কথাবার্তা চলতে থাকাকালেই কাউন্ট এসে হাজির। আগের দিন স্টলমেস্তার যে কাউন্টের আগমন ঘোষণা করেছিল সেই কাউন্ট এক গাড়ি মাল আর তার পত্নীকে সঙ্গে করে হোটেলে এসে উঠলেন। হোটেল নূতন যারা আসে তাদের। যেচে আলাপ করে ফিলিনা। স্বভাবটাই এইরকম। সব সময় হাসিখুশিতে ভরা থাকে যেমন তার মুখটা তেমনি মনেও কোনও মান-অপমান বোধ নেই। ফিলিনা সোজা। কাউন্টপত্নীর কাছে চলে গেল।
কাউন্টপত্নী জিজ্ঞাসা করল, কে তুমি?
