মেলিনা বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলল, আমাদের মতো শিল্পীকে উনি লজ্জা দিতে পারবেন কি না জানি না। তবে একটা বিষয়ে সত্যিই উনি আমাদের হারিয়ে দেবেন। সেটা হচ্ছে নিজের কাজ গুছিয়ে নেবার বা স্বার্থপূরণের কৌশল। দুদিন পরে কি করে আমাদের খাবার জুটবে বলে আমরা যখন ভাবছি তখন উনি আমাদের খাবারে ভাগ বসাচ্ছেন। যে পয়সা দিয়ে আমরা চাকরির খোঁজ করে বেড়াবো, উনি কৌশলে তাতেও তার ভাগ নিচ্ছেন।
কথাটা শুনে খুবই দুঃখিত হলো উইলেম। মনে হলো এটা যেন তাকেই লক্ষ করে বলা। কারণ সে আর ফিলিনাই বৃদ্ধের প্রতি বেশি শ্রদ্ধাশীল। এরপর উইলেমকে সরাসরি আক্রমণ করল মেলিনা। আজ একপক্ষকাল হয়ে গেল। থিয়েটারের পোশাক বাছাই করে বন্ধক দেওয়া আছে, আমরা আশা করে বসে আছি অথচ আপনি টাকা দিলেন না। অথচ টাকার জন্য বাড়িও যাই যাই করে গেলেন না। আপনি টাকা দিলে এতদিন আমরা কাজ শুরু করে দিতাম। অথচ আপনি বাজে খরচ ঠিকই করে যাচ্ছেন।
এবার রেগে গেল উইলেম। বলল, সেই এই ধরনের অকৃতজ্ঞ এবং হৃদয়হীন লোকদের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতে চায় না।
হোটেলের বাইরে ঘরে একা বসেছিল উইলেম। এমন সময় ফিলিনা গান করতে করতে এসে তার ঘাড়ের উপর ঝুঁকে পড়ে আবদারের ভঙ্গিতে বলল, মেলিনার জন্য আমরা এ হোটেলে আর থাকব না। কাছাকাছি অন্য এক হোটেলে উঠে যাব। তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো। তাছাড়া তোমার এখন বাড়ি যাওয়া হবে না।
উইলেম বলল, তুমি কি পাগল হয়েছ ফিলিনা? আমার এখানে থাকা চলবে না। আমাকে এবার বাড়ি যেতেই হবে। আমাকে ছেড়ে দাও।
ফিলিনা তাকে আরও জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতে করতে বলল, তাহলে তো কিছুতেই ছাড়ব না।
উইলেম বলল, কি করছ? লোক রয়েছে যে।
সত্যিই তাদের কাণ্ড দেখে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দু-চারজন লোক জড়ো হয়ে দেখছিল। ফিলিনা তাদের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বকে উঠতেই তারা চলে গেল। লজ্জার ভয়ে আর জোর করার চেষ্টা না করে নীরবে শান্তশিষ্ট স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করে যেতে লাগল উইলেম। ফিলিনা বলল, আগে কথা দাও, এখন চলে যাবে না, তবে ছাড়ব।
অবশেষে প্রতিশ্রুতি দিল উইলেম। সে আগামী বা পরের দিন বা তারপরের দিনও বাড়ি যাবে না।
কথা পেয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল ফিলিনা। দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বলল, আমি একবার আমার ঘরে যাচ্ছি, আমার দরকার। ফিরে এসে যেন আমি তোমাকে এখানেই দেখি।
ফিলিনা চলে গেল। উইলেম কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে পড়ল। কোনও প্রয়োজন ছিল না, তবু মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে যেতে লাগল মেলিনার ঘরের দিকে। এক রহস্যময় দুর্বোধ্য প্রবৃত্তির তাড়নায় সে যেন না গিয়ে পারল না। কিন্তু মেলিনার ঘরে কাছে যেতেই সে এসে ক্ষমা চাইল তার কাছে। বলল, রাগের মাথায় যা তা বলে ফেলেছি, কিছু মনে করবেন না। আমার হাতের টাকা ফুরিয়ে আসছে, নিজের স্ত্রীর ভরণ-পোষণের ক্ষমতা নেই। তার উপর সন্তান আসছে। তাই কোনো আনন্দের আসর বা উৎসব আমার ভালো লাগে না, সব সময় চাকরি বা কাজ-কারবারের কথা ভাবি। প্রাণ খুলে হাসতে বা আনন্দ উপভোগ করতে পারি না আপনাদের মতো। আমাকে ক্ষমা করবেন।
মেলিনার কথা শুনে শান্ত হলো উইলেম। বলল, ঠিক আছে, আজই রাতে না হয় সকালে তোমাকে টাকা দেব আমি।
হঠাৎ ফিলিনার সেই বালকভৃত্য ফ্রেডারিককে ফিরে আসতে দেখে বিরক্ত হয়ে নিজের ঘরে চলে এলে উইলেম। এসে দেখল মিগনন কি লিখছে। মন ভালো থাকলে তার লেখাটা নিয়ে দেখত, তার বিচার করত। কিন্তু আজ কিছু না বলে বিশ্রামের জন্য পোশাকটা খুলতে লাগল। এমন সময় হোটেলের সদর দরজার কাছে চোখ পড়তেই দেখল ঘোড়ায় চেপে কে একজন গণ্যমান্য আগন্তুক এসে হাজির হলো। আর হোটেলের মালিক ব্যস্তভাবে তার দিকে ছুটে গেল।
কৌতূহলের বশে উইলেম তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হোটেল মালিক বলল, হের স্টলমেস্তার, অবশেষে আমাদের মনে পড়ল?
আগন্তুক ঘোড়া থেকে না নেমেই বলল, কাউন্ট তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আসছেন। প্রিন্স ডনের সঙ্গে দেখা করার জন্য এখানে দিনকতক থাকবেন তারা।
হোটেল মালিক বলল, আপনিও থাকলে ভালো হতো। ঘর আছে, কোনও অসুবিধা হবে না।
হঠাৎ মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয় উঠল উইলেমের। সে সেখানে আর না দাঁড়িয়ে সেই বৃদ্ধ বীণাবাদক ও গায়কের সন্ধানে চলে গেল। শুনল সে নাকি একটা অখ্যাত পল্লীতে চলে গেছে। খুঁজে খুঁজে একটা বাড়িতে তার বাজনা শুনতে পেল উইলেম। উইলেমকে দেখে খুশি হয়ে একটি গান স্পষ্ট ভাষায় গাইতে লাগল বৃদ্ধ। গানটার মানে হলো এই যে, যে কোনওদিন দুঃখ ভোগ করেনি, যে কোনওদিন চোখের জল ফেলেনি সে ঈশ্বরকে জানতে পারেনি, পারবেও না কোনওদিন।
ঈশ্বরই আমাদের পৃথিবীতে নিয়ে আসেন, আমাদের পাপের পথে নিয়ে যান আবার তিনিই অনুতাপের মোচড় দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেন আমাদের অন্তরকে।
প্রথমে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর বৃদ্ধের কাছে সরে গেল উইলেম। গান শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। চোখে জল আসছিল। রোধ করতে পারছিল না। যে বেদনা হিম হয়ে জমে ছিল এতদিন অন্তরে, এই সকরুণ সুরের আঘাতে উত্তাপে তা গলে জল হয়ে বেরিয়ে এল চোখ থেকে।
গান থামলে উইলেমকে বৃদ্ধ বলল, আমি আজ সন্ধ্যায় আপনার জন্য ওখানে অপেক্ষা করেছিলাম। আপনাকে গান শোনাতে চেয়েছিলাম কিন্তু দেখতে না পেয়ে এখানে চলে আসি।
