কিন্তু ফিরে যাবার জন্য রওনা হবার সময় সেই যাজককে আর কোথাও পাওয়া গেল না। মেলিনার স্ত্রী বলল, এটা অভদ্রতা। যাবার সময় আমাদের কাছ থেকে ভদ্রভাবে বিদায় নিতে পারত।
দুটো ঘোড়ার গাড়িতে করে ওরা রওনা হলো। ফেরার পথে আর নৌকায় করে গেল না। ফিলিনা ও মেলিনার স্ত্রী উইলেমের উল্টো দিকে বসল। গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে গান ধরল ফিলিনা। গান গেয়ে সারা পথটা কাটাল সে।
মেরিয়ানার সঙ্গে তার প্রেমসম্পর্কটা ছিন্ন হওয়ার পর উইলেম নারীদের প্রতি খুব সতর্ক হয়ে উঠেছিল মনে মনে। প্রতিজ্ঞা করেছিল আর কোনও নারীর বাহুবন্ধনে ধরা। দেবে না। তার মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে উঠেছিল যে নারীমাত্র চটুল প্রেমাভিনয়ে সিদ্ধ এক-একটি ছলনাময়ী। তাই যাতে কোনও ছলনাময়ীর বিলাসকলার কবলে না। পড়ে তার জন্য সদাজাগ্রত থাকত সব সময়। কোনও নারীর প্রতি কখনও কোনো কামনা জাগলেও সে কামনাকে ব্যক্ত করত না কখনও বাইরে। বুকে চাবি দিয়ে ভরে রাখত সেই অব্যক্ত কামনাকে।
এমন সময় ফিলিনা এল তার জীবনে। গানে-গল্পে, অভিনয়ে-হাসিতে, হুল্লোড়ে সব সময় ভরে দিতে লাগল তার মনটাকে। পান্থশালার এক অচেনা মেয়ে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে তার মনটাকে একথা কখনও ভাবতে পারেনি উইলেম। মেরিয়ানার আঘাত, তার অভাব ও বিচ্ছেদ যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল তার মনে সে শূন্যতার অনেকখানি আপনা থেকে পূরণ করে দিল ফিলিনা। অথচ প্রতিদানে কিছুই চাইল না তার কাছ থেকে। এখানে আসার প্রথম দিনে ফিলিনা তার ঘরে তাকে যে সব প্রসাধন্দ্ৰব্য দিয়েছিল ভদ্রতা ও সৌজন্যের খাতিরে তার জন্য তাকে একটা উপহার। দেবে বলেছিল উইলেম। কিন্তু সে উপহার আরও দেওয়া হয়নি।
হোটেলে ফিরে এসে সবাই উঠল উইলেমের ঘরে। কারণ তার ঘরটাই বেশ গোছাল অবস্থায় ছিল। বৃদ্ধের কাছে একটা নাটকের বই ছিল। ওরা এসেই সেই নাটক থেকে অভিনয় করতে লাগল।
পরদিন সকালে উঠেই উইলেম শুনল গতকাল লার্তেস তার যে ধার করা ঘোড়াটা করে বেড়ানোর জায়গা থেকে আসছিল সেটা পথে পড়ে যায়। লার্তেস ঘোড়ায় চড়তে বা চালাতে ভালো জানে না। ফলে পড়ে গিয়ে ঘোড়টা এমন আঘাত পায় যে তার সেরে উঠতে অনেক সময় লাগবে। ঘোড়া হোটেলের মালিকের কাছ থেকে ধার করা। উইলেম ঘোড়ার মালিককে জানিয়ে দিল তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ সে দেবে।
হোটেলের মালিক তার ঘর থেকে চলে যেতেই ফিলিনার ঘরের দিকে তার চোখ পড়ল। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ফিলিনা তাকে নমস্কার করছে। সঙ্গে সঙ্গে তার সেই প্রতিশ্রুত উপহারের কথাটা মনে পড়ে গেল।
একটু পরে দোকানে গিয়ে উপহার কিনে আনে উইলেম। আনে দুটো কানের দুল, একটা টুপি, একটা নেকটাই আর কিছু প্রসাধদ্রব্য। এই উপহারগুলো যখন ফিলিনার হাতে তুলে দেয় উইলেম তখন তা মাদাম মেলিনা দেখে। দেখে ঈর্ষাবোধ করে। ভাবে ফিলিনার প্রতি দুর্বলতা আছে উইলেমের। সে কথা মাদাম মেলিনা ঠাট্টার ছলে প্রকাশ করলে উইলেম বলল, যে মেয়ের সব কিছু আমি জানি, যার জীবনযাত্রার প্রতিটি খুঁটিনাটি আমার সব জানা তার প্রতি কোনও ভালোবাসাই অনুভব করি না। আসলে ফিলিনাকে দেওয়া আমার এই উপহার বন্ধুত্ব আর সৌজন্যের পরিচায়ক। তবু কিন্তু এ যুক্তিতে সন্তুষ্ট হলো না মাদাম মেলিনা।
হোটেলের মালিক একজন অচেনা বৃদ্ধ গায়ককে নিয়ে এল। সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ইনি একজন ভালো গায়ক। আপনাদের কাজে লাগবে। এর গান শুনে দেখতে পারেন।
মেলিনা বলল, উনি যেতে পারেন। আমাদের এত সময় নেই।
কিন্তু ফিলিনা জেদ ধরল, ওরা গান শুনবেই।
প্রথমে বীণা বাজাতে শুরু করল বৃদ্ধ। অপূর্ব তার সুরঝঙ্কার। মুগ্ধ হয়ে গেল উপস্থিত সকলে। বৃদ্ধকে উইলেম অনুরোধ করল, আপনি একটা বাজনার সঙ্গে একটা গান করুন। বাণীহীন সুর আকাশপথে উড্ডীয়মান অধরা পাখির মতো। কিন্তু বাণীময় সঙ্গীতের সুর শুনে মনে হয় আকাশগামী অধরা পাখিটা হাতে এসে ধরা দিয়েছে। শধু তাই নয়, আমাদের মধ্যেও আকাশপিপাসা জাগিয়ে আমাকেও কোথায় যেন উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সকলের সনির্বন্ধ অনুরোধে একটি বড় গান গাইল বৃদ্ধ! বেশ ভরাট মিষ্টি গলা। সে গানের বিষয়বস্তু ছিল মানবতা, ভালোবাসা, দেশপ্রেম প্রভৃতি কতকগুলো গুণের জয়গান। তার গলাটা এমনি মিষ্টি ও ভরাটি যে সে গাইছিল আর সকলের শুনতে ভালো লাগছিল। তার গান থামলে ফিলিনা বলল, আপনি সেই রাখাল তাকে সাজাও, এই গানের সুরটা বাজাতে পারবেন? তাহলে আমি গানটা গাইব।
বৃদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে বীণাটা তুলে বাজাতে লাগল। তার তালে তালে গান গাইতে লাগল ফিলিনা। ফিলিনা ভালোই গাইল। তার গান শেষ হলে বৃদ্ধকে মন দিয়ে। আপ্যায়িত করা হলো। উইলেম উঠে গিয়ে বৃদ্ধের হাতে একটা মুদ্রা দিল তার পারিশ্রমিক হিসাবে। বলল, আবার আপনার গান শোনা যাবে। তার দেখাদেখি অন্যান্য সকলেও কিছু কিছু দিল। তবে উইলেমই দিল সবচেয়ে বেশি।
উইলেম যাবার আগে ফিলিনাকে বলল, তোমার গানটা কাব্যিক বা নীতিবাগীশ না হলেও মঞ্চে এইভাবে গাইলে প্রচুর প্রশংসা পাবে দর্শকদের কাছ থেকে। এই বৃদ্ধ
দ্রলোকের বাজনার হাত ও গানের গলা অনেক শিল্পীকেই হার মানিয়ে দেবে। হয়ত লক্ষ্য করে থাকবে ওর গানের মধ্যে অনেক নাট্য উপাদান আছে। যেগুলো গীতিনাট্যে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
