বৃদ্ধের প্রতি মেরিয়ানা কি অন্যায় করেছে এবং তার প্রকৃত দোষ কোথায় বৃদ্ধ তা বললেন না। তাঁর বলা এত কথার মাঝে কোথাও তা পাওয়া গেল না। উল্টে তার কথার ফাঁকে শত দোষারোপ এবং কটুক্তি সত্ত্বেও মেরিয়ানার প্রতি তাঁর স্নেহশীল আসক্তি আর অনুকম্পার ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বৃদ্ধের সব কথা শুনে মেরিয়ানার সঙ্গে তার প্রেম সম্পর্কের প্রসঙ্গটা আবার উঠে এল তার মনের উপর। বাড়ি গিয়ে ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজখবর নেবার এক অদম্য আগ্রহ জাগল সঙ্গে সঙ্গে। গভীর রাত্রিতে শোবার ঘরে ঢুকে উইলেম স্পষ্ট বুঝতে পারল আজ রাত্রে ঘুম আসবে না তার চোখে। এমন সময় হঠাৎ মিগনন এসে একটা প্রার্থনা জানাল তার কাছে। এখন মিগননই তার একমাত্র সান্ত্বনা। মিগননের আনুগত্য আর সরলতার তুলনা হয় না। মেয়েটাকে দারুণ ভালো লাগে তার। তার প্রতি অন্তহীন মমতা জাগে অন্তরে।
মিগনন বলল, আজ সে সেই ডিমের নাচ দেখাবে তাকে যে নাচ না দেখাবার জন্য ম্যানেজার তাকে একদিন নির্মমভাবে প্রহার করে এবং দল ছাড়তে হয় তাকে। তবে এ ঘরে আর কেউ থাকবে না।
খুশির সঙ্গে রাজি হলো উইলেম। একটানা ভাবনা-চিন্তা থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি পাবে, পাবে এক মিষ্টি বৈচিত্র্যের আস্বাদ। প্রথমে বাইরে থেকে একটা কার্পেট বয়ে আনল মিগনন। তারপরে সেটা ঘরের মেঝের উপর পেতে দিল। তার চার কোণে চারটা বাতি জ্বেলে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর একজন বেহালাদারকে ডেকে এনে ঘরের এক কোণে বসিয়ে দিল। এরপর আনল এক ঝুড়ি ডিম। ডিমগুলো বার করে সারা কার্পেটের সর্বত্র এমনভাবে ছড়িয়ে রাখল যাতে একটি ডিম থেকে আর একটি ডিমের মাঝে ফাঁক থাকে এবং একটি পা রাখার মতো জায়গা রেখে ডিম সাজিয়ে রাখার পর কাপড় দিয়ে চোখ দুটো বেঁধে দিল মিগনন।
সব প্রস্তুতি শেষে নাচ শুরু করল মিগনন। সে এক আশ্চর্য নাচ। বেহালার ঝঙ্কারের তালে তালে মিগনন যখন পা ফেলে ফেলে নেচে চলছিল তখন প্রতি মুহূর্তে উইলেমের মনে হচ্ছিল এই বুঝিবা ডিমের গায়ে তার পা লেগে যাবে অথবা একটা ডিমের সঙ্গে অন্য ডিমের ঠোকাঠুকি হবে। কিন্তু একটি ডিমের গায়ে একটিবারের জন্য তার পা লাগল না। চোখ বাঁধা থাকলেও এমনভাবে পা ফেলছিল মিগনন আর সেই সতর্কিত প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যে ভয়ঙ্কর অথচ মধুর একটা ছন্দ ছিল যা না দেখলে বা না শুনলে বিশ্বাস করা যায় না। বেহালার সুরঝঙ্কার মিগননের পায়ের সেই অবিশ্বাস্য ও একাধারে ভীষণ সুন্দর ছন্দটাকে মূর্ত করে তুলছিল।
নাচের শেষের দিকে পায়ে করে একে একে সব ডিমগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করে রাখল মিগনন অভ্রান্তভাবে। তারপর নিজের হাতে চোখের বাঁধনটা খুলে দিয়ে প্রথাগত ভঙ্গিতে মাথাটা নত করে উইলেমের সামনে। অবশেষে আবার ডিমের ঝুড়ি আর কার্পেটটা গুটিয়ে ঘর থেকে চলে যাবার জন্য তৈরি হলো। উইলেম খুশি হয়ে বলল, আমি তোমার নাচ দেখে সন্তুষ্ট হয়েছি মিগনন। আমি তোমাকে একটা পোশাক করিয়ে দেব।
মিগনন তখন বলল, পোশাকটা যেন আমার স্যুটের রঙের মতো হয়। এখন আপনার কিছু দরকার আছে?
উইলেম বলল, না, তুমি শোওগে।
বেহালাবাদক উইলেমের কাছে এসে বলল, ও অনেকদিন ধরে আমাকে এই বাজনার কথা বলছে। আমার পারিশ্রমিকও দিতে চেয়েছে। কিন্তু আমি নিইনি। আমি প্রথমে এ নাচের বাজনা জানতাম না। ওই আমাকে এর সুর শিখিয়ে তৈরি করে নিয়েছে।
উইলেম বলল, এ নাচের কথা সেদিন প্রথমে শোনার পর থেকে দেখার ইচ্ছা। হচ্ছিল। আজ তা দেখে প্রচুর আনন্দ পেলাম।
যাই হোক, রাতটা কেটে গেল উইলেমের। দু-একবার মেরিয়ানার কথাটা মনে এলেও মোটের উপর ঘুম হয়েছিল। সকাল হতেই মিগননের ডাকে ঘুম ভাঙল। দর্জিকে সঙ্গে করে ডেকে এনেছে মিগনন। আর পোশাকের কাপড়ও পছন্দ করে এনেছে দর্জির মারফৎ। আকাশী-নীল রংটা খুব পছন্দ মিগননের। অথচ প্রেমের ব্যাপারে ঘা খাবার পর থেকে একমাত্র ধূসর রং ছাড়া আর কোনও রং পছন্দ হয় না উইলেমের।
কিছুটা বেলা হবার সঙ্গে সঙ্গে ফিলিনা ও লার্তেস দুজনে আবার এক নূতন জায়গায় বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করল। এবার ওরা নৌকোয় করে যাবে। এক একদিন এক-এক জায়গায় বেড়াতে গিয়ে সেখানে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে সবাই মিলে খাওয়ার মধ্যে সত্যিই এক আনন্দ আছে যা ঘরের মধ্যে পাওয়া যায় না।
সানন্দে রাজি হয়ে গেল উইলেমস। ওদের সঙ্গে সেই বৃন্ধ আর মেলিনা-দম্পতিও। আছে। আজ ওরা নদীপথে নৌকোয় করে বেশ কিছুটা যাবার পর নদীর ধারে কোনও এক মনোমতো জায়গায় নেমে বসবে ও খাবে।
মোটামুটি ওরা সবাই অভিনেতা। লার্তেস ও ফিলিনা, মেলিনা, বৃদ্ধ-এরা সবাই। পেশাদার অভিনেতা। উইলেম পেশাদার অভিনেতা না হলেও নাট্যকার এবং অভিনয় বোঝে। ফিলিনা নৌকোতে উঠে একটা প্রস্তাব করল, ওরা মুখে মুখে এই নৌকোয় একটা নাটকের অভিনয় করবে। এমন সময় নদীর এক ঘাট থেকে এক যাজক এসে। ওদের নৌকোয় উঠল। তাকেও ওরা দলে টেনে নিল। সব মিলিয়ে দৈনন্দিন কতকগুলো বাস্তব ঘটনা নিয়ে নাটক বেশই জমে উঠল। কারণ ওরা প্রত্যেকেই অভিনেতা। ওদের সহজাত অভিনয় প্রতিভার জোরে একজনের সংলাশ শেষ না হতে হতে আপনা থেকে সংলাপের কথা এসে যাচ্ছিল ওদের মুখে।
অভিনয় শেষ হয়ে গেলে মাঝি নদীর কূলে এক জায়গায় নৌকো ভেড়াল। ওরা নেমে খাওয়া সেরে নিল। তারপর কিছুক্ষণ এখানে-সেখানে বেড়াল। উইলেম সেই যাজকের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
