মেলিনা কিন্তু যে কাজের জন্য এখানে এসেছে তার কথা একবারও ভুলে যায়নি। সে শুনেছে এখানে একটা থিয়েটারের দল ছিল। সে দলের পোশাকগুলো এখনও আছে। শুধু কিছু টাকা হলেই একটা নূতন দল খোলা যায়।
একদিন উইলেমকে সঙ্গে করে পোশাকগুলো দেখতে গেল মেলিনা। একটা ভালো থিয়েটার দলে যা যা পোশাক দরকার তা সব আছে। পোশাকগুলো একটা ঘরের মধ্যে দেখে নূতন করে তার অবদমিত নাট্যপ্রীতি হঠাৎ জেগে উঠল উইলেমের মনে। মেলিনা বলল এই সব দামী পোশাক পাওয়া ভাগ্যের কথা। শুধু দুশো ক্রাউন হলেই দলটা চালু করা যায়। মেলিনা লার্তেস ও ফিলিনাকে দলে নিতে চাইল। তারপর উইলেমের কাছ থেকে টাকা চাইল। মেলিনা প্রস্তাব দিল উইলেম টাকাটা দিয়ে দলের মালিক হতে পারে। ওরা অভিনেতা হিসাবে তার অধীনেই কাজ করবে।
উইলেম বলল, সে বাড়ি ফিরে গিয়ে কথাটা ভেবে দেখবে। বাড়ি না গিয়ে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু মেলিনা বার বার টাকার জন্য চাপ দিতে থাকায় সে তার বন্ধু ওয়ার্নারকে সব কথা জানিয়ে একটা চিঠি দিল।
এদিকে মিগননের প্রতি দিনে দিনে মায়াটা বেড়ে যাচ্ছিল উইলেমের। মেয়েটা অদ্ভুত ছটফটে আর চঞ্চল। কিন্তু খুব ভোরে ওঠে। সব কাজ ঠিকমতো করে। রাত্রে একটা মেঝের উপর শোয়। কিন্তু কোনও বিছানা নেয় না। অনেক করে বলা সত্ত্বেও নেয় না।
সেদিন হোটেলের বসার ঘরে ওরা তিনজন বসেছিল এমন সময় একজন বৃদ্ধ দুটি তরুণীকে নিয়ে হোটেলে এসে উঠলেন। হোটেলে সে কখন নূতন লোক আসছে সেদিকে ফিলিনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল সব সময়। একটু সুযোগ পেলেই লোকেরা পিছনে লাগতে ছাড়ত না। আবার এক মুহূর্তে মানুষকে আপন করে নিতেও পারত।
বুদ্ধ ভদ্রলোকের পোশাক-আশাকের মধ্যে কিছু দৈন্যের ছাপ ছিল। অথচ তাকে দেখে বেশ বিদগ্ধজন বলেও মনে হচ্ছিল। তাকে দেখে উইলেম কিন্তু এক নজরেই চিনে ফেলল। সে তাদের শহরে অতীতে অনেকবার মঞ্চে মেরিয়ানার সঙ্গে অভিনয় করতে দেখেছে ভদ্রলোককে। তিনি মেরিয়ানাকে অভিনয় করতেও শেখান। বহুদিন পর ভদ্রলোককে দেখে মেরিয়ানার ভুলে যাওয়া কথাগুলো আবার মনে পড়ল উইলেমের।
ফিলিনা তার বালক ভৃত্যকে ডেকে বলল, আমাদের খাবার টেবিল সাজাও, এঁদের নিয়ে আমরা একসঙ্গে খাব। কিন্তু ফ্রেডারিক রেগে গিয়ে বলল, আমি শুধু আপনার কাজ করার জন্যই নিযুক্ত। আর পাঁচজনের জন্য আমি খাটতে পারব না।
ফিলিনা তখন রেগে গিয়ে বলল, তাহলে তোমাকে আর কাজ করতে হবে না। তুমি যেতে পার।
ফ্রেডারিক তৎক্ষণাৎ তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেল। উইলেম সঙ্গে সঙ্গে মিগননকে ডেকে বলল, এই ভদ্রমহিলা যা যা বলবেন সব শুনবে।
খাবার সময় উইলেম কিন্তু বেশি কথা বলল না। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের পানে। সে শুধু ভাবছিল একটুখানি সুযোগের কথা। একটু সুযোগ। পেলেই বৃদ্ধকে কোথাও আড়ালে নির্জনে নিয়ে গিয়ে মেরিয়ানার কথা জিজ্ঞাসা করবে। মেরিয়ানা এখন কোথায় কি করছে তা জানতে ইচ্ছা করছে তার। এ ইচ্ছা ক্রমশ প্রবল আর অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে তার মনে।
খাওয়ার পর বৃদ্ধকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে বার হলো উইলেম। একথা-সেকথার পর মেরিয়ানার কথাটা তুলল সে। সে এখন কি করছে কোথায় আছে তার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানেন কি না এই সব প্রশ্ন একের পর এক তুলে ধরল সে বৃদ্ধের কাছে।
প্রশ্ন শুনে বিরক্তির সঙ্গে নাসিকা কুঞ্চিত করলেন বৃদ্ধ। বললেন, ঐ ঘৃণ্য মেয়েটার কথা আর তুলবেন না মশাই। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি আমি ওর কথা আর কখনও ভাবব না।
উইলেম একবার ভাবল সে প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে দেবে। কিন্তু বৃদ্ধ অত সহজে থামবেন না। তার আগে উথলে উঠেছে অন্তরে। তিনি তার সব কথা বলবেন। তিনি বললেন, তার সঙ্গে একদিন আমার একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল এটা ভাবতেও এখন লজ্জাবোধ হয় আমার। আপনি যদি একে চেনেন তাহলে কেন একথা বলছি তার মানেটা বুঝতে পারবেন। প্রথমে তো মেয়েটাকে ভালোই লেগেছিল। দেখতে সুন্দরী, স্বভাবও নম্র বিনয়ী, তার আচরণও ভালো। কিন্তু ওসব উপরকার ব্যাপার। তখন বুঝতেই পারিনি মেয়েটা এতদূর অবিবেচক এবং অকৃতজ্ঞ হতে পারে।
হঠাৎ বৃদ্ধের চোখে জল এল। তা দেখে ব্যস্ত ও বিব্রত হয়ে পড়ল উইলেম। তবে কি কোনও খারাপ খবর আছে? খবর যাই হোক সব জানতে চায় উইলেম। সে জিজ্ঞাসা করল, কি হলো? আপনি সব কিছু বলে যান। আমি শুনতে চাই। কিছুই লুকোবেন না।
বৃদ্ধ বললেন, বলার আর কীই বা আছে। আমি তার জন্য যে মনোবেদনা লাভ করেছি তা ক্ষমার অতীত। অথচ একদিন মেয়েটা আমাকে বিশ্বাস করত। আমার কথা মান্য করে চলত। আমার স্ত্রী তখন বেঁচে ছিল। আমি তাকে আপন মেয়ের মতো স্নেহ করতাম। আমি তাকে আমার নিজের বাড়িতে নিজের মেয়ের মতো রাখার এক পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু আমার স্ত্রী হঠাৎ মারা যেতেই সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়।
আজ হতে বছর তিনেক আগে যখন আমি আপনাদের শহর ছেড়ে চলে যাবার উদ্যোগ করি তখন এক বিষাদময় ভাবান্তর লক্ষ্য করি মেরিয়ানার মধ্যে। লক্ষ্য করি সে সন্তানসম্ভবা। সে নিজেও তা স্বীকার করে এবং সঙ্গে সঙ্গে থিয়েটারের ম্যানেজার তাকে অভিনয়ের কাজ থেকে বরখাস্ত করবে এই ভেবে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। পরে দেখা যায় ম্যানেজার কোনওভাবে কথাটা জানতে পেরে সত্যি সত্যিই তাকে বরখাস্ত করে। তারপর আমি শহর ছেড়ে চলে আসি।
