একথা-সেকথার পর হঠাৎ একসময় ফিলিনা বলল, তোমরা দুজনে কিছু ফুল নিয়ে এস্র। বেশি করে আনবে।
ওরা দুজনে ফুল আনলে সেই ফুল দিয়ে একটা মালা গেঁথে নিজের গলায় পরল ফিলিনা। তারপরেও অনেক ফুল অবশিষ্ট থাকায় আর একটা মালা গেঁথে উইলেমের গলায় গম্ভীরভাবে পরিয়ে দিল। তখন লার্তেস হেসে বলল, আমাকে তাহলে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হবে?
ফিলিনা তখন নিজের গলা থেকে মালাটি খুলে লার্তেসের গলায় পরিয়ে দিল। বলল, শূন্য হাতে কাউকে ফিরতে হবে না।
লার্তেস শুধু বলল, এখান থেকে আমরা দুজনেই যদি তোমার প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী হই?
ফিলিনা তখন নীরবে লার্তেসের মুখের কাছে তার মুখটা বাড়িয়ে দিল যাতে লার্তেস চুম্বন করতে পারে। তার পরমুহূর্তে দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করলে উইলেমকে। তারপর বলল, পুরুষ নারীর কাছে সাধারণত যা চায় তা আমি তোমাদের দুজনকেই দিলাম। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনও কারণ নেই।
ফিলিনা বলল, এখন সবেমাত্র বিকেল। চলো ওদের খেলা আরম্ভ হবার আগেই আমি কিছুক্ষণের জন্য নাচব। আমাদের ঘরে চলো।
ঘরে গিয়ে ফিলিনার সঙ্গে লার্তেসও নাচতে লাগল। কিন্তু উইলেম ভালো নাচতে জানে না। তার অভ্যাস নেই। তখন লার্তেস ও ফিলিনা দুজনেই উইলেমের হাত ধরে তাকে নাচ শেখাতে লাগল।
ওদের দড়িনাচের খেলা আরম্ভ হবার আগে হঠাৎ আসরের সামনে একটা গোলমাল শুনে ছুটে গেল উইলেম। দেখল মিগনন নামে সেই অদ্ভুতদর্শনা মেয়েটিকে দলের ম্যানেজার নির্মমভাবে মারছে। মিগনন নাকি ডিমের নাচ দেখাতে রাজি হয়নি।
মিগননের চিৎকারে লোক জড়ো হয়েছিল। তার প্রতি করুণাও অনেকের জেগেছিল। কিন্তু ম্যানেজারের শাসনের কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করার সাহস পায়নি। উইলেম ছুটে গিয়ে ম্যানেজারের গলার জামার কলারটা চেপে ধরল। তার হাতের চাপে মিগননকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো ম্যানেজার। আর ছাড়া মেয়ে মিগনন তীরবেগে কোথায় ছুটে পালিয়ে গেল। লোকটা তখন আস্ফালন করতে বলতে লাগল, কোথায় পালাবি, আমি তোকে খুন করব। তুই ডিমের নাচ দেখাব বলে দর্শকদের দেখাসনি।
উইলেম বলল, তার আগে এই শহরের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে গিয়ে তোমাকে বলতে হবে ওকে কোথা থেকে তুমি চুরি করে এনেছ? আমি তোমাকে সহজে ছাড়ব না। এর জন্য যেখানে যেতে হয় যাব।
ম্যানেজার তখন বলল, আমি ওর পেছনে যা খরচ করেছি সেই খরচটা আমাকে দিয়ে দিন। তারপর ওকে নিয়ে যা খুশি করুন। আমাদের দেখার দরকার নেই।
উইলেম বলল, ঠিক আছে। খেলা ভেঙে যাক। আমি তোমার দাবি মিটিয়ে দেব।
অনুষ্ঠান শেষে হ্যাঁনেজারকে একশো ডুকেট দিয়ে মিগনানকে যুক্ত করল উইলেম। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে কোথাও পাওয়া গেল না। উইলেমের ভয় হতে লাগল ভয়ে ও মনের দুঃখে কোনও পুকুরে ঝাঁপ দেয়নি তো বেচারি।
পরের দিন সকালেই নাচের দল তাঁবু গুটিয়ে চলে গেল। আর তার কিছু পরেই কোথায় হতে মিগনন এসে হাজির হলো উইলেমের সামনে। উইলেম তখন বাইরের ঘরে লার্তেনের সঙ্গে বসেছিল। লার্তেস বলল, কোথায় ছিলি। এখন থেকে তুই মুক্ত। তোমাকে আমরা কিনে নিয়েছি লোকটার কাছ থেকে।
মিগনন খুশি হয়ে বলল, কত দাম দিতে হয়েছে?
লার্তেস বলল, একশো ডুকেট।
আর কোনও কথা না বলেই ওদের ঘর পরিষ্কারের কাজে লেগে গেল মিগনন।
হঠাৎ রাস্তায় গোলমাল শুনে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উইলেম দেখল, একটা চতুর্দোলায় নাসিস আর লান্দ্রিনেত্তাকে বসিয়ে বাহকরা শহর পরিক্রমা করছে। খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তার কথা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে তাই তাদের যাবার সময় তাদের একবার দেখার জন্য বিরাট ভিড় জমে যায় পথের দুধারে দুপাশের বাড়িগুলোর বারান্দা ও ছাদে। সমগ্র দল তাদের জন্য গর্বিত। তাই তাদের নিয়ে সারা শহর পরিক্রমার ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। নাসির্স ও লান্দ্রিনেত্তার খাতির ও জনপ্রিয়তা দেখে সমগ্রভাবে নাট্যশিল্প সম্বন্ধে শ্রদ্ধা জাগল উইলেমের মনে। লার্তেস ও ফিলিনাকে বলল উইলেম, জনগণের কাছ থেকে এই বিপুল শ্রদ্ধা ও সম্মান লাভ করা কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব? সত্যিকারের প্রভাবশালী অভিনেতার মর্যাদা দিতে মানুষ জানে।
উইলেমের কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারল না লার্তেস। লার্তেস ও ফিলিনা দুজনেই তাই চুপ করে রইল।
ফিলিনা আর মিগনন দুজনেই বেশ একটা গভীর ছাপ ফেলেছিল উইলেমের মনে। ওদের দুজনের কাউকে ছেড়ে যেতে মন সরছিল না তার। তাই যাই যাই বা উঠি উঠি করেও যেতে পারছিল না। তাই কাজের অজুহাত দেখিয়ে আরও কিছুদিন বয়ে গেল হোটেলটায়। লার্তেস ও ফিলিনার সাহচর্যে দিনগুলো তার কোনওমতে কেটে যাচ্ছিল।
এমন সময় হঠাৎ একদিন মেলিনা আর তার নবপরিণীতা স্ত্রী এসে হাজির হলো সেই হোটেলটায়। মেয়েটির বাবাকে বলে ওদের বিয়ের ব্যবস্থা উইলেমই করে দেয়। বিয়ের পরে ওদের ঘরে জায়গা দিতে রাজি হয়নি মেয়ের বাপ। তাই তারা কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে-সেখানে। মেলিনা ভালো অভিনতো বলে ভালো থিয়েটারের দলের সন্ধান করে বেড়াচ্ছে এখানে-সেখানে। কার কাছে এই ধরনের এক থিয়েটারের দলের সন্ধান পেয়েই এখানে এসে হাজির হয়েছে এরা।
উইলেম লার্তেস ও ফিলিনার সঙ্গে মেলিনাদের পরিচয় করিয়ে দিল। বলল, ওরা দুজনেই সুযোগ্য অভিনেতা। কিন্তু ওদের তেমন পছন্দ করল না লার্তেস ও ফিলিনা। বরং ওদের মনে হলো ওদের তিনজনের মিলিত সাহচর্যে কেমন সুন্দরভাবে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। তার মাঝে কোথা হতে একটা বাধা এসে জুটল।
