ওর কিছু পরে লার্তেস নামে এক ভদ্রলোকে এসে আলাপ করল উইলেমের সঙ্গে। আলাপ-পরিচয়ের পর লার্তেস উইলেমকে সঙ্গে করে সেই সুন্দরী যুবতীর ঘরে নিয়ে গেল। লার্তেসই আলাপ করিয়ে দিল। যুবতীটি প্রথমেই তার ফুলের জন্য ধন্যবাদ জানাল উইলেমকে। উইলেম দেখল মেয়েটি সত্যিই সুন্দরী।-তার চোখ, মুখ, চুল সব মিলিয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে তার দেহের লাবণ্যকে। লার্তেস বলল, আমি আর ফিলিনা একই নাট্যদলের অংশীদার। আমরা জাহাজে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে যেতে নেমে পড়েছি এখানে। জায়গাটা খুব ভালো লাগায় দু-চারদিন থেকে যেতে চাই।
উইলেমকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল ফিলিনা। সে তখন একটা কালো পোশাক পরেছিল। পোশাকটা একটু ছোট হলেও তাকে সুন্দর দেখাচ্ছিল। উইলেমের একটা হাত ধরে তাকে নিয়ে গেল তার শোবার ঘরে। ফিলিনার একটা হাতে ছিল উইলেমের দেওয়া সেই গোলাপ ফুলটা।
লার্তে দোকান থেকে কিছু মিষ্টি নিয়ে এল উইলেমের জন্য। এসেই ফিলিনার কোলের উপর কিছু চিনির রসে পাক দেওয়া বাদাম ছুঁড়ে দিল। তা দেখে ফিলিনা উইলেমকে লক্ষ করে বলল, দেখছেন, এই বীরপুরুষ আমাকে কত শিশু ভাবছে। অথচ উনিই এই সব জিনিস খেতে বেশি ভালোবাসেন।
উইলেম হেসে ফেলল কথাটা শুনে। লার্তেস প্রস্তাব করল, আজকের দিনের আবহাওয়াটা বড় চমৎকার। চলো বাইরে কোনও গ্রামাঞ্চলে গিয়ে বেড়িয়ে আসি। ওখানেই খাওয়াটা সেরে নেব।
ফিলিনা উৎসাহিত হয়ে বলল, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। তাহলে আমাদের এই নবপরিচিত বন্ধুটিও বেশ কিছুটা আনন্দ পান।
উইলেম বলল, আমি আমার ঘর থেকে মুখ-হাত ধুয়ে চুলটা আঁচড়ে আসছি।
ফেলিনা বলল, আপনি এটা এখানেই সারতে পারেন। এই বলে সাবান পাউডার প্রভৃতি সব প্রসাধন্দ্রব্যের ব্যবস্থা করে দিল সঙ্গে সঙ্গে।
সকলে তৈরি হয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করল। ফিলিনার মনটা বড় নরম। যাবার পথে ভিখিরি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু না কিছু পয়সা ছুঁড়ে দিচ্ছিল সে। অবশেষে মিল নামে একটা পান্থশালায় এসে পৌঁছল ওরা। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে খাবার জন্য তৈরি হলো তারা। এমন সময় ওরা দেখল অদূরে স্থানীয় খনিশ্রমিকরা এক নাচগানের অনুষ্ঠান করছে। অনুষ্ঠানটা একই সঙ্গে গীতি ও নৃত্যনাট্য ধরনের। তাতে দেখা গেল মঞ্চের উপর এক খনিশ্রমিক গাঁইতি দিয়ে কয়লা কাটছে আর গান গাইছে। এমন সময় এক কৃষক এসে তাকে গানের মধ্যে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কেন সে মাটি কাটছে। কেন সে তার জমিটাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। খনিশ্রমিক তার উত্তরে বলল, এইভাবেই মাটির ভিতর থেকে সব খনিজ সম্পদ বার করে আনতে হয়। তাতে অসংখ্য মানুষের মঙ্গল হয়। এভাবে দেখা গেল প্রথমে কৃষকটি রেগে গেলেও পরে খনিশ্রমিকের কথায় শান্ত হয়ে চলে গেল।
অনুষ্ঠান শেষ হলে ওরা অন্যত্র চলে গেল কথাবার্তা শুরু করল নিজেদের মধ্যে। ফিলিনা গান শুরু করল। তার গলাটা বড় মিষ্টি। গান শুনতে শুনতে ওরা আবার সেই শহরের হোটেলে ফিরে গেল। সন্ধ্যায় হবে হোটেলের সামনে দড়ি নাচের খেলা। ফিলিনা বলল, তোমাদের ঘরের চেয়ে আমার ঘরটা এ বিষয়ে সবচেয়ে সুবিধাজনক। তোমরা দুজনেই আমার ঘর থেকে অনুষ্ঠান দেখবে।
অনুষ্ঠানের প্রথমে কিছু অপটু ছেলেমেয়ে ও কিছু আনাড়ি লোক খেলা দেখিয়ে হাসাল দর্শকদের। অবশেষে এল এ খেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দুজন বড় খেলোয়াড় নার্সিস আর লান্দ্রিনেত্তে।
অনুষ্ঠান শেষে খেলোয়াড়দের তাঁবুর বাইরে অদ্ভুতদর্শনা একটি মেয়ে দেখে তাকে ডাকল উইলেম। মেয়েটি ওদের কাছে আসতে উইলেম জিজ্ঞাসা করল তার বয়স কত।
মেয়েটি বলল, তা সে জানে না। তাদের দলের কেউ জানে না।
উইলেম আবার জিজ্ঞাসা করল, তোমার বাবার নাম কি?
মেয়েটি বলল, সে শয়তানটা মারা গেছে।
উইলেমের মনে হলো, মেয়েটির বয়স বারো-তের হবে। তার মুখ-চোখ ভালো। বয়স অনুপাতে তার স্বাস্থ্য খুবই উন্নত। কিন্তু সেই অনুপাতে তার হাত-পাগুলো পুষ্ট হয়নি। তাকে দেখতে সত্যিই ভালো লাগছিল উইলেমের। ফিলিনা তাকে কিছু মিষ্টি দিতেই সে চলে গেল।
লার্তেস আবার একটা প্রস্তাব আনল। আগামীকাল জাগারহানস শহরে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সারবে। জাগারহানস হচ্ছে এক বিরাট বনাঞ্চল। খুব নিস্তব্ধ আর মনোরম। বেড়াবার জায়গা হিসেবে চমৎকার। ওরা তিনজনেই যাবে।
আনন্দের মিষ্টি উত্তেজনায় সারারাত ভালো ঘুম হলো না উইলেমের। সকাল। হতেই মুখ-হাত ধুয়ে কাপড়-জামা পরে ফিলিনার ঘরে গিয়ে দেখে ফিলিনা নেই। বেশ কিছুটা হতাশ হয়ে লার্তেসের ঘরে গেল উইলেম। লার্তেস শান্ত কণ্ঠে বলল, ফিলিনা যেখানে যাক তারা দুজনে যাবে।
রওনা হবার আগে কিছুক্ষণ মেয়েদের সম্বন্ধে কথাবার্তা হলো ওদের মধ্যে। উইলেম লক্ষ করল মেয়েদের সম্বন্ধে খুব একটা উৎসাহ নেই লার্কেসের। একসময় লার্তেস বলল, ফিলিনা কাউকে ঠকায় না। অবশ্য সাময়িকভাবে নিরাশ করতে পারে। সে মেয়ে হিসাবে আদিমাতা ঈভের সুযোগ্য বংশধর। সে এমনই এক জাতের মেয়ে যে দেওয়া-নেওয়ার মাত্রা সম্বন্ধে অতিমাত্রায় সচেতন। তাকে যতটুকু দেবে, ঠিক ততটুকুই পাবে তার কাছ থেকে।
সহসা মেরিয়ানার কথাটা মনে পড়ে গেল উইলেমের। জাগারহানসের জঙ্গলে গিয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত ঘুরতেই একটা পাথরের ধারে ফিলিনাকে একা একা বসে। থাকতে দেখল ওরা। লার্তেস তাকে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল তার সঙ্গীরা কোথায়। ফিলিনা উত্তরে বলল, সে আগেই তাদের বিদায় দিয়েছে। ফিলিনা বলল, লোকগুলো ভীষণ কৃপণ প্রকৃতির। হোটেলে খেতে গিয়ে বার বার প্রতিটি জিনিসের দাম জিজ্ঞাসা করছে আর এ ওর মুখপানে তাকাচ্ছে। আমি ওদের ভাবগতিক বুঝতে পেরে ওয়েটারকে এমন এক ডিনারের অর্ডার দিলাম যার বেশির ভাগ উপকরণ হোটেলে নেই। অগত্যা ওরা বাইরে চলে গেল। ওরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। আমিও ওদের বিদায় দিয়ে মুক্তি দিলাম। আর ওরা এক দিকে মুখ করবে না।
