এমন সময় ওয়ার্নার ঘরে ঢুকল। ঢুকেই উইলেমের কাণ্ড দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। তার বুঝতে দেরি হলো না উইলেম কি করছে। উইলেম নিজে থেকেই বলল, যে কাজে আমার কোনও সহজাত প্রতিভা বা যোগ্যতা নেই তা যে সত্য সত্যই আমি ছেড়েছি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেবার জন্যই আমি এ কাজ করছি।
ওয়ার্নার তাকে বাধা দিয়ে বলল, কোনও কবিতা সৃষ্টি হিসাবে সার্থক বা পূর্ণতা অর্জন করতে না পারলেও তা পুড়িয়ে ফেলার কোনও যুক্তি থাকতে পারে না।
উইলেম বলল, কবিতা হয় রসোত্তীর্ণ হবে অথবা তার অস্তিত্ব থাকবে না। যার কাব্যসৃষ্টির কোনও জন্মগত প্রতিভা নেই তার এ কাজে হাত দেওয়া মোটেই উচিত নয়। যদি তা সে করে তাহলে বলব সে বিষয়ে সে প্রতারণা করছে সকলের সঙ্গে, নিজের সঙ্গে। সব মানুষের মধ্যেই কিছু না কিছু অনুকরণপ্রবৃত্তি আছে। সে ভাবে প্রকৃতি জগতে ও মানব জগতে তোনও বস্তু বা ঘটনা দেখলেই তার প্রতিরূপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এ বিষয়ে তার ক্ষমতা আছে।
ওয়ার্নার বলল, তোমার অন্তরের অনুভূত সত্যগুলোকে এভাবে জোর করে নির্বাসিত করা উচিত নয়। এই সব স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলোর সঙ্গে মানিয়ে চলাই ভালো। কারণ এগুলোকে অস্বীকার করলে নিজের আত্মাকেই অস্বীকার করা হয়। তাছাড়া এটা এক নির্দোষ আনন্দের ব্যাপার। এ আনন্দ ত্যাগ করার কোনও অর্থই হয় না।
উইলেম বলল, কি কারণে আমি এসব পুড়িয়ে ফেলেছি। তার কারণ হলো এই যে এই কাগজপত্রগুলোর মধ্যে আমার অতীতের কামনা-বাসনাগুলো সব লেখা আছে। বর্তমানে আমি যতই এই সব কিছু থেকে নিজেকে মুক্ত করে জীবনের কোনও বৃহত্তর অর্থ চাই ততই এই সব লেখাগুলো আমাকে সেই সব ব্যর্থ কামনা-বাসনাদের কথা জোর করে মনে পড়িয়ে দেয়। আমার তা মোটেই ভালো লাগে না। মোটেই না।
এই বলে আরও দুটো কাগজের প্যাকেট পুড়িয়ে ফেলল উইলেম। আর তার সামনে হতবুদ্ধি হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল বিব্রত ওয়ার্নার। তার করার বা বলার আর কিছুই ছিল না। এর আগে সে উইলেমকে দু তিনবার বাধা দিতে গিয়েও পারেনি।
এমনি করে প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাব্যসাধনা ও শিল্পসাধনায় জলাঞ্জলি দিয়ে কাজ-কারবার ও পৈত্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে খুব বেশি করে মন দিল উইলেম। ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট লোকদের সঙ্গে কথাবার্তা, লেখা চিঠিতে কিছু কিছু কাব্যিক আবেগের সংমিশ্রণতার সাফল্যের মাত্রা ক্রমেই বাড়িয়ে দিতে লাগল। ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগল উইলেম। তখন তার বাবা আবার বাইরে পাঠাবার মনস্থ করলেন তাকে। বললেন, বাইরে যেসব পাওনা টাকাগুলো পড়ে আছে বেশ কিছুদিন ধরে সেগুলো আদায় করে আনুক।
এবার উইলেমকে পাঠানো হলো পার্বত্য অঞ্চলে। ঘোড়ায় চেপে রওনা হয়ে পড়ল উইলেম। পার্বত্য এলাকায় এই তার প্রথম যাওয়া। পাহাড়ের উত্তুঙ্গ, শৃঙ্গ, শ্যাওলাধরা বড় বড় পাথর, গভীর খাদ প্রভৃতি দেখতে খুব ভালো লাগছিল তার। আপনা থেকে মুখ দিয়ে গান বেরিয়ে এল উইলেমের। তার সঙ্গে নিজের লেখা কিছু গানও।
এমন সময় কয়েকজন লোকের কাছে শুনল হকড নামে এক জায়গায় এক নাটকের অনুষ্ঠান হবে।
অবাক হয়ে গেল উইলেম কথাটা শুনে। এই পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে আবার থিয়েটার! তা যদি হয় আমি অবশ্যই তা দেখতে যাব।
লোকগুলো বলল, থিয়েটার হবে এক কারখানায়। কারখানার মালিক তার কর্মচারীদের নিয়ে একখানা নাটক মঞ্চস্থ করছে। এখানে তো আর কোনও আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা নেই। তাই মালিক মাঝে মাঝে ওই থিয়েটারের আয়োজন করে।
উইলেম সেখানে গিয়ে দেখল কারখানার মালিক তাদের কারবারের একজন খরিদ্দার। তার কাছে তাদের কোম্পানি কিছু টাকাও পাবে। তার কাছে দেনাদারদের যে তালিকা আছে তাতে তারও নাম আছে। যাই হোক, উইলেমকে দেখে খুশি হলো সেই কারখানার মালিক। সব টাকা মিটিয়ে দিল সঙ্গে সঙ্গে। তার থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা করল। তার স্ত্রী বলল, উইলেমকে দেখতে ঠিক তার বাবার মতো।
রাতে নাটক দেখে বিশ্রাম করে পরের দিন সকালে আবার হোটেলে চলে গেল উইলেম। কিন্তু টাকা আদায়ের ব্যাপারে এই পার্বত্য এলাকায় বিশেষ সুবিধা করতে পারল না সে। আইনগত বিষয়ে পরামর্শদাতারও একান্ত অভাব এখানে। দুচারদিন এই পাহাড়-জঙ্গলে রাজ্য ছেড়ে সমতলভূমির দিকে রওনা হলো উইলেম।
উঁচু-নিচু বন্ধুর পার্বত্য পথ, ছায়াঘন জঙ্গল, তার উপর মেঘ বৃষ্টি কুয়াশা প্রভৃতির অবাঞ্ছিত অন্যভ্যস্ত অভিজ্ঞতার পর সমতলে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল উইলেম। উর্বর ঘাসেঢাকা সবুজ উপত্যকা, অবারিত সুন্দর প্রান্তর, আর তার বুক চিরে বয়ে যাওয়া কত মন্থরগতি নদী দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল তার। এমনি এক নদীর ধারে ছোট্ট এক সাজানো সুন্দর এক শহর পেয়ে গেল উইলেম।
শহরের মধ্যে খোঁজ করে একটা ভালো পান্থশালায় উঠল উইলেম। দেখল তার সামনে ভিড়। কোথা হতে এক দড়ির খেলা দেখানো নাট্যদল এসেছে। রাত রাত্রি থেকে দু-তিনদিন ধরে তাদের খেলা দেখানো চলবে।
কিছুক্ষণ পরেই এক ফুলওয়ালী মেয়ে ফুল বেচতে এল। উইলেম তার থেকে কিছু ফুল কিনল। তার কিছু পরে তার ঘরের উল্টো দিকে এক ঘরের জানালায় তার হঠাৎ চোখ পড়ল, এক সুন্দরী যুবতী চুল আঁচড়াচ্ছে। হঠাৎ একটি ছেলে এসে বলল, আপনি যে ফুল কিনেছেন তার থেকে কিছু ঐ ভদ্রমহিলা চাইছেন। সানন্দে তা দিল উইলেম।
