চা খেয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ল উইলেম। পথে কোথায় একজন লোক। একটা মিস্টি গানের সুর বাজাচ্ছিল বাদ্যযন্ত্রে। সেই সুর শুনতে শুনতে হঠাৎ মেরিয়ানার কথা মনে পড়ল তার। ইচ্ছা না থাকলেও ধীরে ধীরে মেরিয়ানার বাড়ির সামনে গিয়ে হাজির হলো। তখন বেশ রাত হয়েছে। সদর দরজা বন্ধ। তবু তার সামনে বোয়াকটায় একটু বসল উইলেম। দরজায় কাঠগুলোয় হাত বুলিয়ে দেখল। এই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কতদিন মেরিয়ানা তার জন্য অপেক্ষা করেছে কত উষ্ণনিবিড় আগ্রহে। দরজার চৌকাঠ পার হবার সঙ্গে সঙ্গে তাকে কত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরেছে। কিন্তু সে দিন কি আর ফিরবে না? আজ কেন তাকে যেতে নিষেধ করল মেরিয়ানা? কিন্তু এসব কথা এখানে বসে ভেবে কোনও ফল হবে না।
এই সব ভাবতে ভাবতে আবার বাড়ির পথে রওনা হলো উইলেম। কিন্তু কয়েক পা যেতেই হঠাৎ পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল আধো অন্ধকারে কোন এক পুরুষের ছায়ামূর্তি মেরিয়ানার বাড়ির সদর দরজা থেকে নিঃশব্দে বার হয়ে কোথায় চলে গেল। এক অদম্য কৌতূহলের বশে পথের উল্টো দিকে এগিয়ে চলল উইলেম লোকটাকে অনুসরণ করার জন্য। সে স্পষ্ট দেখল লোকটা মেরিয়ানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা পথ ধরে চলে গেল। কিন্তু উইলেম কিছুটা এগিয়ে যেতেই আর তাকে দেখা গেল না। হয়তো কোনও পাশের গলিপথে ঢুকে পড়েছে।
বাড়ি ফিরে এ বিষয়ে সব সন্দেহ, সব সংশয় মন থেকে মুছে ফেলল উইলেম। সেই চিঠিটা বার করে তার শেষে কয়েকটা কথা জুড়ে দিল। লিখল, হে আমার প্রিয়তমা, গত রাতে তোমার কি হয়েছিল? কেন তুমি যেতে নিষেধ করলে আমায়?
তোমার হয়ত ওখানে থাকতে আর ভালো লাগছে না। কিন্তু ধৈর্য ধরো, সময়মতো। আমি তোমার একটা ব্যবস্থা করবো। ওই কালো গাউনটা পরেছিলে কেন? আমি তো তোমাকে একটা সাদা নাইটগাউন পাঠিয়েছি। সেটা পরলে তোমাকে বড় সুন্দর দেখাবে। চিঠি পাঠাবে বুড়ি সিবিলের মাধ্যমে। শয়তান নিজে তাকে দূত আইরিস হিসাবে বেছে নিয়েছে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
এমন অনেক রোগ আছে যা বলবান লোকদের ধরলে বেশি দুর্বল করে দেয়, বেশি করে কায়দা করে। উইলেমের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো। মেরিয়ানার সঙ্গে তার ব্যর্থ প্রেম সম্পর্কটা একটা দুষ্ট রোগের মতো অত্যধিক আবেগে স্ফীত উইলেমের অন্তরটাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেল একেবারে। তবু একেবারে আশা ছাড়ল না উইলেম। তার ধারণা আবার মিলন ঘটবে তাদের। সব সংশয়, আর ভুল বোঝাবুঝির মেঘ কেটে যাবে নিঃশেষে।
কিন্তু তার বন্ধু ওয়ার্নার মেরিয়ানার জীবন সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে যেভাবে তার মুখোশ খুলে দিয়েছে তাতে তার প্রতি মেরিয়ানার প্রতারণার বিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। অবশেষে উইলেম যখন দেখল মেরিয়ানাকে ফিরে পাওয়া আর সম্ভব নয় তার পক্ষে তখন তার অভাবটাকে আর এক চরম ক্ষতি বলেই ধরে নিল। কিন্তু আবার সঙ্গে সঙ্গে দেখল এ ক্ষতি সহজভাবে সহ্য করা অসম্ভব তার পক্ষে। নিজের অন্তরকে ঘৃণা করতে লাগল উইলেম। নীরব অশ্রু আর অবদমিত শোকাবেগকেই একমাত্র ওষুধ বা প্রতিকার বলে ভাবতে লাগল।
বর্তমানের দুঃখটাকে ভোলার জন্য অতীতের হারিয়ে যাওয়া সুখের ও মিলনের দিনগুলোকে কল্পনার রং-রস দিয়ে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করে নূতন করে। কিন্তু তাঁরা বাঁচে না। উইলেম শুধু একবার অতীতের গভীর অন্ধকার খাদটার মধ্যে নিবিড় হতাশার সঙ্গে তাকায়। তারপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মধ্যে। এইভাবে বর্তমানের জীবনযন্ত্রণাকে ভুলতে গিয়ে স্বেচ্ছায় আর এক যন্ত্রণার জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে উইলেম। যৌবনে স্বাভাবিক উন্মাদনা বশে তার বর্তমানের ক্ষতিটাকে অপূরণীয় ভেবে এক বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা দান করে।
প্রথম প্রেমে এক তিক্ত ব্যর্থতা লাভ করার সঙ্গে এক বিরাট রূপান্তর এল উইলেমের জীবনে। প্রেমের ক্ষেত্রে তার আকাঙ্ক্ষিত বস্তুকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গে শিল্প সাধনার প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণা জাগল তার মনে। কবিতা লেখা ও অভিনয় করার মধ্যে কোনও যুক্তি খুঁজে পেল না। তার মনে হলো কবিতা কতকগুলো শব্দের ছন্দোবদ্ধ গ্রন্থন যার মধ্যে গাঁথা থাকে কতকগুলো বাঁধাধরা নীরস চিন্তা আর আবেগ। আবার তার চেহারা, আবেগানুভূতির স্বচ্ছন্দ ও সংযত প্রকাশ, তার বাকভঙ্গিমা, অঙ্গভঙ্গি প্রভৃতি সব মিলিয়ে তার যে সহজাত অভিনয়প্রতিভা ছিল এবং যার নিয়মিত চর্চা করলে সে একজন উচ্চস্তরের অভিনেতা হতে পারত, সে প্রতিভাও বিষাদ ঠেকল তার কাছে।
এখন কাব্যসাধনা ও অভিনয়চর্চা দুইই ছেড়ে ব্যবসার কাজে মন দিল উইলেম। কখনও এক্সচেঞ্জে, কখনও কাউন্টিং হাউসে, কখনও বিক্রয়কেন্দ্রে, স্টোরে, কখনও অফিসঘরে বা প্রচারকেন্দ্রে সব সময় ঘুরে বেড়াত উইলেম অক্লান্তভাবে। তার উপর যখন সে কাজের ভার দেওয়া হতো, সে তাই প্রচুর যত্নও পরিশ্রমের সঙ্গে করত। তার এই নূতন কর্মতৎপরতা দেখে তার বন্ধুরা বিস্মিত হলো, তার বাবা খুশি হলেন।
মন থেকে সব প্রেম ও কাব্যসাধনার স্মৃতি চিরতরে মুছে দেবার জন্য একদিন সন্ধের সময় নিজের ঘরে আগুন দিয়ে সব চিঠিপত্র ও লেখা কবিতা পোড়াতে লাগল উইলেম। তার এতদিনের প্রিয়বস্তুগুলো তারই চোখের সামনে দেখতে দেখতে পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
