আমার ফিরতে আরও কিছুদিন দেরি হবে। তা হোক। কারণ একথা ভাবতে খুবই ভালো লাগছে যে এই বিচ্ছেদের পর আগের থেকে আরও মধুর হয়ে উঠবে আমাদের মিলন। পুনর্মিলনের সেই মধুর নিরবচ্ছিন্নতা এই বিচ্ছেদের সব বেদনা, সব যন্ত্রণাকে ভাসিয়ে দেবে। আমি আমাদের সন্তানের জন্য কিছু ভাবি না। আমাদের মিলনের সুখস্মৃতিরূপেই সে সন্তান আনন্দ বর্ধন করে যাবে আমাদের। একটা কথা প্রায়ই মনে হয় আমার প্রিয়তমা। বক্তৃতামঞ্চ থেকে নাট্যমঞ্চ কোনও অংশে কম নয়। ঈশ্বর এবং প্রকৃতি আমাদের যে শক্তি, যে যোগ্যতা দান করেছেন তার বিকাশ সাধনের জন্য আমি মঞ্চে অবতীর্ণ হব যে কথা দর্শকরা যুগ যুগ ধরে শুনতে চাইছে, তোমাতে আমাতে দুজনে এক সুন্দর জোট বেঁধে সেকথা তাদের প্রাণভরে শোনাব। এত সব কথা মুখে বলে জানানো সম্ভব নয় বলেই চিঠি লিখে জানালাম। এখন এখানেই ইতি। বিদায় প্রিয়তমা, আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। বন্ধ হয়ে আসছে। এখন রাত্রি নিশীথ।
প্রথম কিস্তির কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে গেল উইলেম। আবার তাকে যেতে হবে আর এক জায়গায়। আবার বার হতে হবে। কিন্তু তার প্রস্তুতির জন্য দিনকতক লাগবে। তাই বাড়ি ফিরেই পরদিন বিকালের দিকে মেরিয়ানার সঙ্গে দেখা করতে গেল উইলেম। চিঠিখানা ডাকে ফেলেনি। সঙ্গে করে নিয়ে গেল। ভাবল হাতেই দেবে। বিকালে বা সন্ধ্যায় এর আগে কখনও যায়নি সে মেরিয়ানার কাছে। সাধারণত সে যায় গভীর রাত্রিতে। কিন্তু আজ ঠিক করল, সন্ধে হতেই সে চিঠিখানা তার হাতে দিয়ে আসবে। পরে রাত্রি গম্ভীর হলে গিয়ে তার উত্তর চাইবে।
মেরিয়ানাকে কাছে পেতে ইচ্ছা করছে আর একটা কারণে। বাইরে থেকে যে বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তার বন্ধু ওয়ার্নার এসেছিল তার প্রেম সম্বন্ধে কিছু কথা বলতে। মেরিয়ানার প্রতি তার গোপন প্রেম, তার বাড়িতে গভীর রাত্রিতে নিয়মিত যাওয়া এসব কথা সব জেনেছে ওয়ার্নার। শুধু তাই নয়, সে মেরিয়ানা সম্বন্ধেও অনেক খবর সংগ্রহ করেছে। ওয়ার্নার তাকে সাবধান করে দিয়েছে, মেরিয়ানা ভালো মেয়ে নয়। মেরিয়ানা তাকে উপরে ভালোবাসার ভান করলেও আসলে আর একটা লোকের কাছে সাহায্য নেয়। আর একটা লোকের সঙ্গে তার আছে এক গোপন সম্পর্ক।
ওয়ার্নারের কথা শুনে মনটা কিছু খারাপ হলেও মেরিয়ানার প্রতি কিছুমাত্র বিশ্বাস হারায়নি উইলেম। মেরিয়ানার মতো সুন্দরী মেয়ে কখনও খারাপ হতে পারে, সে কখনও বিশ্বাস করতে পারে না একথা। তার ভালোবাসা কখনও মিথ্যা হতে পারে না। এ বিশ্বাস এখন অটুট আছে তার।
এই অটুট বিশ্বাসে বুক বেঁধে মেরিয়ানার বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল উইলেম। ঘরে ঢুকেই ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেরিয়ানার বুকে। দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। কিন্তু আবেগের প্রবলতায় একটা জিনিস লক্ষ্য করেনি উইলেম। মেরিয়ানার আদর-অভ্যর্থনায় ও আচরণে আগের মতো আন্তরিকতা নেই, আবেগের সেই উষ্ণ নিবিড়তা নেই।
সেটা যে নেই মেরিয়ানা নিজেও সচেতন সে বিষয়ে। তাই তার কারণ হিসাবে একটা যুক্তি দেখাল। বলল, আজ তার শরীর খারাপ। উইলেম বলল, এখন এসেছে এমনি দেখা করতে, আজ রাতে আবার আসবে সে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মৃদু প্রতিবাদ জানিয়ে মেরিয়ানা বলল, আজ না, অন্যদিন এসো। আজ শরীরটা বড় খারাপ।
কোনও কিছু সন্দেহ না করে সরল বিশ্বাস মেরিয়ানার সব কথা মেনে নিল উইলেম। এ নিয়ে সে আর পীড়াপীড়ি করল না। তবে অনেক আশা অনেক উৎসাহ নিয়ে যে চিঠিটা তুলে দিতে এসেছিল মেরিয়ানার হাতে, সে চিঠিটা বার করল না। পকেটেই তা রয়ে গেল। মেরিয়ানার এই নিরুত্তাপ ভাব দেখে সে চিঠি তার হাতে দেবার কোনও যুক্তি খুঁজে পেল না উইলেম।
তবে সবেমাত্র সন্ধে হয়েছে। মেরিয়ানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ি ফিরে গেল উইলেম। কয়েক দিনের বিচ্ছেদের পর নিবিড়তর মিলনের আশায় সম্ভাব্য যে আনন্দের আবেগ ও উত্তেজনার ঢেউ উত্তাল হয়ে উঠেছিল বুকে, সে ঢেউ আপনা হতেই অসময়ে ফেটে মিলিয়ে গেল। মনে মনে মুষড়ে পড়ল উইলেম। বাড়িতে থাকতে ভালো লাগল না কিছুতেই। তাই পোশাক পরে আবার বেরিয়ে পড়ল পথে।
পথে বার হতেই এক অচেনা পথিকের সঙ্গে দেখা হলো। পথিক তাকে কোনো এক ভালো হোটেলের সন্ধান দিতে বলল। কথা বলতে বলতে তাকে সঙ্গে করে নিকটবর্তী একটা হোটেলে নিয়ে গেল উইলেম। হোটেলে পৌঁছে পথিকটি উইলেমকে এক কাপ চা খেয়ে যাবার অনুরোধ করল। হাতে কোনও কাজ না থাকায় উইলেম বসে পড়ল ভদ্রলোকের কাছে। উইলেমের পরিচয় জানতে পরে পথিকটি বলল, সে নাকি তার পিতামহকে চিনত। তার পিতামহের কেনা যে ছবিগুলো তার বাবা বিক্রি করে দেন সে ছবিগুলো সে নাকি কিনে নেয়। যাই হোক, একথা-সেকথার পর ভদ্রলোক উইলেমকে বলল, তুমি ভাগ্যে বিশ্বাস করো? তুমি কি বিশ্বাস করো অদৃশ্য কোনও শক্তি উপর থেকে আমাদের জীবনকে চালনা করছে?
উইলেম বলল, তোমার মতো এক যুবকের পক্ষে একথা সাজে না।
ভদ্রলোক তখন বলল, মনে করো তুমি একটা বড় কাজ করতে চলেছ অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু মাঝপথে অকস্মাৎ কোনও বাধা এসে গেল। তুমি তা করতে পারলে না। এখানেও কি তুমি নিয়তির বিধানে বিশ্বাস করবে না?
উইলেম বলল, একথার উত্তর এত তাড়াতাড়ি এখানে দেওয়া সম্ভব নয়।
