একজন অফিসার বলল, তা তো হবে না। তোমার প্রেমিককে গ্রেপ্তার করে আটক রাখা হবে, তার বিচার হবে। আর তোমাকে বাবার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
মেয়েটি দৃপ্ত কণ্ঠে বলল, আমার প্রেমিকের দোষ নেই। ও তো আমাকে জোর করে আনেনি। আমি স্বেচ্ছায় এসেছি ওর সঙ্গে। আমি কোনও অপরাধ করিনি। তবু আমাকে লজ্জাজনক অবস্থার মধ্যে ফেলা হয়েছে। অথচ কোনও উচ্চ আদালতে আমাদের নিয়ে গেলে আমরা মুক্তি পাব।
আর্লম্যান নামে একজন বয়োপ্ৰবীণ তদন্তকারী অফিসারকে উইলেম অনুরোধ করল ওদের কথা বিবেচনা করার জন্য। অফিসার মেয়েটির লম্বা বক্তৃতা শুনেও বেশ কিছুটা অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। বেশ ভিড় জমে গিয়েছিল। কিন্তু কি করবেন তা ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না।
অফিসার যাই করুক ওদের দেখতে বড় ভালো লাগছিল উইলেমের। ওদের প্রতি এক সকরুণ সহানুভূতির সঙ্গে সঙ্গে কবিসুলভ এক ভাবানুভূতি জেগে উঠল তার মনে। তার মনে হলো, প্রেমের দুটি রূপ আছে-একটি সলজ্জ, অন্যটি সোচ্চার। একটির রূপ প্রচ্ছন্ন, ললিতকোমল ও শান্ত, অন্যটি প্রকাশ্য, দৃপ্ত এবং সংগ্রামশীল। উইলেম এতদিন প্রেমের যে রূপ দেখে এসেছে সে প্রেম ভীরু, দুর্বল, আত্মগোপনকারী। কিন্তু আজ মেয়েটির স্পষ্ট স্বীকারোক্তি আর দৃপ্ত কষ্টস্বরের মধ্যে প্রেমের একটি অদৃষ্টপূর্ব রূপ দেখে ধন্য হলো উইলেম। যে প্রেম গোপন গৃহকোণ থেকে প্রকাশের স্বচ্ছ আলোয় নিজেকে টেনে এনে রাজপথের উপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের কথা অকপটে ঘোষণা করতে পারে, সব বাধাকে অস্বীকার করে সমাজ ও সংসারে আপন প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানাতে পারে, সে প্রেমের মধ্যে অবশ্যই এক বিরল গৌরব আছে। সে গৌরব দেখে নিজেকে ধন্য মনে করল উইলেম।
অফিসার আর্লম্যানের কাছে ওদের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুমতি চাইল উইলেম। আর্লম্যান সহজেই সে অনুমতি দান করল। উইলেম সোজা মেলিনার প্রেমিকের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, আমি দেখব একটা মিটমাট করতে পারি কি না। মেয়েটির বাবা আমাদের কাজ-কারবারের সঙ্গে জড়িত। কিছু লেনদেনও আছে। মনে হয় সফল হতেও পারি।
দুঃখে মুহ্যমান যুবকটি কিছুটা ভরসা পেল। সে আগে থিয়েটারে অভিনয় করত। এবার সে উইলেমের সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কথাবার্তা বলতে লাগল। উইলেম ভেবেছিল বন্দি ব্যাঙ যেমন মুক্তির পাবার সঙ্গে সঙ্গে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি যুবকটি মুক্তি পেলে দুজনেই অভিনয়ের জগতে চলে যাবে। উইলেম বলল, সুযোগ্য অভিনেতার জন্য যা যা দরকার অর্থাৎ সুন্দর চেহারা, মধুর কণ্ঠস্বর, তীক্ষ্ণ অনুভবশক্তি-তা সবই তোমার আছে।
কিন্তু যুবকটি বলল, তা আছে। তবে আমি আর মঞ্চে ফিরে যাব না ভবিষ্যতে।
কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেল উইলেম। কিন্তু তার প্রেমিকের কথা সমর্থন করে মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছে। আমরা আর অভিনয় করব না। অন্য কিছু কাজ-কারবারের কথা ভাবছি।
উইলেম বলল, অভিনেতার জীবনে কত সুযোগ আছে। তার ভবিষ্যৎ কত উজ্জ্বল। তাছাড়া যার যা পেশা তাই নিয়েই থাকতে হয়। তাতেই উন্নতি হয়। যখন তখন এক পেশা ছেড়ে অন্য পেশা ধরতে নেই।
মেলিনা বলল, আপনি কখনও অভিনয়ের কাজ করেননি, তাই একথা বলেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঈর্ষা, ম্যানেজারদের পক্ষপাতিত্ব, দর্শকদের নিয়ত পরিবর্তনশীল রুচি প্রভৃতি পদে পদে বাধা, কত অসুবিধা ভোগ করতে হয় অভিনেতাদের তার ঠিক নেই।
যুবকটি বলল, যাই হোক, আপনি মিটমাটের চেষ্টা করুন। আমার প্রেমিকার বাবাকে বলেন কেরাণি, কর আদায়কারীর যে কোনও পদে আমি চাকরি করতে রাজি আছি। যে কোনও একটা চাকরি পেলেই তাতে আমার চলে যাবে।
উইলেম কথা দিল, পরের দিন সকালেই সে মেয়েটির বাবার সঙ্গে কথা বলবে।
হোটেলে রাতটা কাটিয়েই সকালে বেরিয়ে পড়ল উইলেম। উইলেম গিয়ে দেখল মেয়েটির বাবা বাড়িতেই আছে। তাকে সব কথা বিজ্ঞতার সঙ্গে বুঝিয়ে বলল, লোকটিও কথা কথা ধৈর্য ধরে শুনল। শুনে যা বলল, তাতে উইলেম একরকম সাফল্যই লাভ করল। লোকটি বলল, তার মেয়ে যুবকটিকে বিয়ে করতে পারে। সে মামলা তুলে নেবে। তাদের কোনও শাস্তিও দেবে না। কিন্তু বিয়ের পণ হিসাবে কোনও যৌতুক পাবে না। তাছাড়া তার মেয়ে তার মাসির যে সম্পত্তি পেয়েছিল। তা তার বাবার কাছে বছর কতেকের জন্য রাখতে হবে। অর্থাৎ তার বাবাই তার আয় উপসত্ত্ব ভোগ করবে। উইলেম তার মেয়ে-জামাইকে ঘরে রাখার জন্য অনুরোধ করল লোকটিকে। কারণ এখন ওদের কোনও সংস্থান নাই। লোকটি তার উত্তরে বলল, তার মেয়েকে ঘরে জায়গা দিতে তার কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে। ছোকরাটিকে নিয়ে। ওই ছোঁড়াটার উপর তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীরও লোভ ছিল। কিন্তু যুবকটির দৃষ্টি ছিল তার মেয়ের উপর। তাই তারা পালিয়ে যায়।
কথাটা শুনে লজ্জায় পড়ে গেল উইলেম। এই গোপন কথাটা জানলে সে এ অনুরোধ করত না।
যাই হোক, মিটমাটের ব্যবস্থা শেষ করে মনটাকে স্থির করে মেরিয়ানাকে একখানা চিঠি লিখল উইলেম। কয়েকদিন ধরে তার মনে হচ্ছিল, রাত্রিবেলায় খাওয়ার পর কাগজ নিয়ে বসে পড়ল। লিখল,
যে মধুর রাত্রি তার নীল আবরণ দিয়ে আমাদের ঢেকে রাখত, আমাদের মিলনের নিবিড়তাকে মধুর করে রাখত, সেই রাত্রিরই শান্ত নীরব আকাশে তোমাকে চিঠি লিখছি মেরিয়ানা। এখন আমি এক নববিবাহিত যুবকের কাছে আছি যার সামনে জীবনের এক নতুন দিগন্ত খুলে গেছে, যে একটু পরেই তার নববধুর বুকের উপর গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাদের প্রেম স্বভাবতই তোমার কথা, আমাদের ভালোবাসাবাসির কথা মনে পড়িয়ে দিল নতুন করে, আরও তীব্র করে।
