মেরিয়ানার বাড়িতে নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল মেরিয়ানা। তাদের আসন্ন বিচ্ছেদের কথা সব খুলে বলল উইলেম। বলল, আমি যেখানে ব্যবসার কাজে যাচ্ছি সেখানে ঘর পেলেই তোমাকে নিয়ে যাব। আশা করি। বিয়েতে তোমার কোনও আপত্তি হবে না।
মেরিয়ানা এ-কথার কোনও উত্তর দিল না। তার চোখের জল চেপে রেখে শুধু নীরবে চুম্বন করতে লাগল উইলেমকে। তাকে বুকের উপর চেপে ধরল আরও জোরে। এরপর বিদায় নেবার আগে একবার উইলেম জিজ্ঞাসা করল সে পিতা হতে চলেছে কি না। তাতেও কোনো স্পষ্ট উত্তর দিল না মেরিয়ানা। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে একটা চুম্বন করল।
পরের দিন সকালে বুকে এক গম্ভীর হতাশা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠল মেরিয়ানা। নিঃসঙ্গতার এক দুর্বিষহ বেদনায় ভারী হয়ে উঠল তার অন্তরটা। যাকে সে মনেপ্রাণে ভালোবাসে তার সেই ভালোবাসার মানুষ দূরে চলে যাচ্ছে আর যাকে সে ভালোবাসে না অথচ সে জোর করে তাকে পেতে চায় এই অবাঞ্ছিত মানুষটা কাছে আসার ভয় দেখাচ্ছে। চোখ দিয়ে জলের ধারা নীরবে বয়ে যেতে লাগল মেরিয়ানার।
বারবারা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, চুপ করো, শান্ত হও, কেঁদে কেঁদে সুন্দর চোখদুটো নষ্ট করো না বাছা। দুজন প্রেমিককে সহ্য করা কি একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার নয়? একজনকে যদি ভালোবাসতে নাই পার তাহলে তার ভালোবাসার প্রতিদানস্বরূপ তাকে অন্তত কিছু ধন্যবাদ দিতে পার। তাকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে পার।
সে-কথায় কান না দিয়ে মেরিয়ানা বলল, হায়, আমার হতভাগ্য উইলেম একদিন রাতে আমার কাছে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায় আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, সে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে গেছে। স্বপ্নে দেখছে সে যখন এক দূর পার্বত্য অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল একা একা তখন হঠাৎ আমাকে একটা পাহাড়ের চূড়ার উপর দেখতে পায়। কিন্তু আমাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে যেতেই আমি সেই চূড়া থেকে কোথায় নেমে যাই। এইভাবে আমাদের বিচ্ছেদের আভাস আগেই পেয়েছিল সে। সে সেই স্বপ্নে আরও দেখেছিল অন্য একটা লোক কোথা হতে এসে আমার হাত ধরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমায়।
বারবারা এবার অধৈর্য হয়ে বলল, তুমি তো জান, আমি তোমার জন্য সব কিছু করতে পারি। এখন বলো, কি চাও, কি পেলে খুশি হবে তুমি।
মেরিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কি আর চাইব আমি? যে উইলেম আমাকে ভালোবাসে, যাকে আমি ভালোবাসি সে ব্যবসার কাজে আটকে পড়ে থাকবে বিদেশে।
বারবারা বলল, হ্যাঁ ওরা এমনই প্রেমিক যারা শুধু হৃদয় ছাড়া আর কিঝুঁই সঙ্গে আনে না। হৃদয় আর ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না তাদের প্রেমিকাদের।
মেরিয়ানা বিরক্ত হয়ে বলল, এখন ঠাট্টা রাখো। কাজের কথা ভাব, সে আমাকে বিয়ে করতে চায়।
বারবারাও বিরক্ত হয়ে বলল, অমন নিঃস্ব অবস্থায় বিয়ে করার লোক আমাদের অনেক আছে।
মেরিয়ানা বলল, আমাকে দুটোর মধ্যে একটাকে বেছে নিতেই হবে। তবে আমার গর্ভে যে সন্তান বেড়ে উঠছে তার খাতিরে উইলেমকে আমাকে পেতেই হবে। এখন ঠিক করে ফেল আমি কি করব।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বারবারা বলল, যৌবনে মানুষ বড় চরমপন্থী হয়ে ওঠে। দুটোর একটাকে কেন বাছতে হবে? একই সঙ্গে দুজনের কাছ থেকে লাভ আর আনন্দ পেতে দোষ কি? একজনকে তুমি ভালোবাসবে আর একজনকে তার দাম দেবে। তবে একটা কাজ আমাদের করতে হবে। দুজন প্রেমিক যেন কেউ কাউকে দেখতে না পায়।
মেরিয়ানা বলল, যা করার করো। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না।
উইলেমকে প্রথমে এক জায়গায় যেতে হলো ঘোড়ার জন্য। বৃদ্ধ ওয়ার্নার একটা চিঠি দিয়েছিলেন সঙ্গে। চিঠিটা দেখলেই মালিক পত্রবাহককে ঘোড়া দিয়ে দেবে। কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে উইলেম দেখল বাড়ির মালিক নেই। তার স্ত্রীরও মনমেজাজ খারাপ। উইলেম চিঠিটা দেখাতেই গিন্নী বলল, তাদের সৎ মেয়ে হঠাৎ এবটা ছোকরার সঙ্গে পালিয়ে গেছে। তাই তার বাবা মেয়ের খোঁজে ব্যস্ত।
উইলেম কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাড়ির মালিক এসে গেল। উইলেমের চিঠি দেখে বিশেষ খাতির করল উইলেমকে। সঙ্গে সঙ্গে তার ঘোড়াটা দিয়ে দিল। তবে রাত্রিটার মতো উইলেমকে তার বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করতে বলল।
রাতটা কোনওরকমে কাটিয়ে এবং লোকটাকে তার মেয়ের জন্য কিছু সান্ত্বনা দিয়ে পরের দিন সকালে ঘোড়ায় চেপে তার আসল গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা হলো উইলেম। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই এক অশ্বারোহী সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী দেখে থমকে দাঁড়াল। শুনল, মেয়েটি তার প্রেমিকসমেত ধরা পড়েছে।
একটা গাড়িতে খড়ের উপর তাদের বসিয়ে রাখা হয়েছে। ওদের দুজনকে দেখে মায়া হলো উইলেমের। মেয়েটিকে দেখে সাবালিকা মনে হলো। মনে হলো ওর বাবা জোর করে অন্যায়ভাবে শাস্তি দিয়ে চায় মেয়েটাকে। দুজন তদন্তকারী অফিসার মেয়েটাকে জেরা করতে লাগল। মেয়েটা নির্ভিকভাবে বলতে লাগল, আমার বয়স কত জানতে চাইছেন? আমি আপনার বড় ছেলের সমবয়সী। আমার সৎ মা বাড়িতে আমায় এমন জ্বালাতন করতেন যে সে বাড়িতে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না আমার পক্ষে। তাছাড়া আমি যার সঙ্গে এসেছি তাকে ভালোবাসি। তাকে আমি অনেক আগে থেকেই সাথী হিসাবে বরণ করে নিয়েছি।
