সেদিন তার নিজের ঘরে কিছু বই ও কাগজপত্র ঘাঁটছিল, এমন সময় তার বন্ধু ওয়ার্নার এসে ঘরে ঢুকল। ঢুকেই তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলল, আবার ঐসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করছ? তুমি তো শুধু একটা কিছু লিখতে শুরু করবে, আর কিছু পরেই সেটা ফেলে রাখবে। কোনও একটা লেখা বা কাজ তুমি কখনও একেবারে শেষ করো না। এটা তোমার বড় দোষ।
উইলেম বলল, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষ কোনো কাজে সফলতা লাভ করে পূর্ণতা লাভ করে।
এই বলে উইলেম একটা নাটক বার করে দিল তার কাগজের স্তূপ থেকে। ওয়ার্নার সেটা দেখেই বলল ওটা ফেলে দাও, আগুনে পুড়িয়ে দাও। ও লেখাটা আমার বা তোমার বাবার কারোই ভালো লাগেনি। লেখার ছন্দটা ভালো হয়েছে, কিন্তু আসলে বক্তব্যটা বাজে। এতে তুমি যে আদর্শ ব্যবসায়ী চরিত্র এঁকেছ তা একেবারে অচল।
উইলেম ক্ষীণ প্রতিবাদের সুরে বলল, তোমাদের মতো ব্যবসাদারেরা শুধু জীবনের পথটাকে বড় করে দেখে, কিন্তু জীবনের চূড়ান্ত অর্থের কথাটা তলিয়ে দেখে না।
ওয়ার্নার বলল, আমার মনে হয় তুমিও আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের কাজকর্ম ও ভাবধারার প্রতি মোটেই সহানুভূতিশীল নও। যদি হতে তাহলে বুঝতে ব্যবসাগত কাজকর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের কত বড় বড় গুণ ও অন্তরবৃত্তি বিকাশলাভ করে।
উইলেম বলল, অবশ্য আমি যে দেশভ্রমণ করতে চলেছি তাতে আরও কিছু শিক্ষা হবে আমার। আরও অনেক কিছু দেখতে পাব। বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে ওয়ার্নার বলল নিশ্চয়। তুমি যে কোনও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বাজারে গিয়ে দেখবে ব্যবসায়ীরা। আসলে কি চায়। নদী, সমুদ্র, আকাশ মাটির বেশির ভাগই তো পৃথিবীর রাজা রাজড়ারা অধিকার করে রেখে দিয়েছে। আমরা ব্যবসায়ীরা কিছু পণ্যদ্রব্য নিয়ে কেনাবেচা করে জীবনধারণের কিছু উপকরণ সংগ্রহ করতে চাই। পণ্যদ্রব্যের ক্রমাগত হাত বদল হচ্ছে। আর তার মধ্য দিয়েই ব্যবসায়ীরা কিছু লাভ করছে। তুমি কোনও শহরে গিয়ে দেখবে সব মানুষই কিছু না কিছু করছে। অসংখ্য কর্মব্যস্ত মানুষ নিরন্তর এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই একটা করে উদ্দেশ্য আছে, লক্ষ্য আছে। কর্মব্যস্ত সেই মানুষের ভিড়ের মধ্যে তুমিও নিজেকে মিশিয়ে দিতে পার। দেখবে তার মধ্যে সত্যিই আনন্দ আছে, দেখবে প্রতিটি পণ্যদ্রব্যের প্রচলনগতিই মানুষের জীবনকে গতি দান করে। অর্থ দান করছে।
এ-কথার কোনও প্রতিবাদ করল না উইলেম। বাধা দিলো না কোনওরূপ। বুদ্ধিমান ওয়ার্নার বাধা না পেয়ে বলে যেতে লাগল, যারা পরিশ্রমী, কর্মঠ, বুদ্ধিমান, বাস্তববাদী, ভাগ্যদেবী তাদেরই মাথার উপর জয়ের মুকুট পরিয়ে দেন। জানবে প্রতিটি পণ্যের মূল্য বুঝে সময় বুঝে তাকে চালনা করা বড় কঠিন কাজ এবং এর জন্য প্রচুর বুদ্ধি এবং দূরদর্শিতার দরকার। তুমি তোমার কল্পনাশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও কাব্যপ্রতিভাকে যদি এইদিকে চালাতে পারতে তাহলে তুমিও অনেক কিছু করতে পারতে। যখন কোনো পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে নোঙর করার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ী জাহাজ থেকে মাটিতে পা দেয়, তার জীবন ও পণ্যসম্পর্কিত অনিশ্চয়তা আর খেয়ালী সমুদ্রের কবল থেকে মুক্ত হয়ে নিশ্চিত মাটির জগতে ফিরে আসে তখন যেন সে নবজীবনের আনন্দে হয়ে ওঠে আত্মহারা, তখন তার সেই আনন্দ দেখে যে কোনও সাধারণ মানুষ ও আনন্দ লাভ না করে পারে না। তবে অবশ্য ব্যবসার ব্যাপারে এটাও ঠিক যে সব সময় অঙ্কের হিসাবে কাজ হয় না। অঙ্কের হিসাব যতই নির্ভুল হোক, ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন না হলে ব্যবসাতে চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করা যায় না।
দুজনের স্বভাবের মধ্যে কিছু অমিল থাকলেও উইলেম ও ওয়ার্নারের মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে তেমনি তাদের বাবাদের মধ্যেও গড়ে উঠেছে দীর্ঘকালের বন্ধুত্ব। ব্যবসাগত প্রবৃত্তির দিক থেকে উইলেমের বাবা বৃদ্ধ মেস্তার আর ওয়ার্নারের বাবা বৃদ্ধ ওয়ার্নার দুজনেই সমান। তবে বৃদ্ধ মেস্তার বেশ কৃপণ প্রকৃতির। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুব হিসেব করে চলেন। বাড়িতে বড় একটা কাউকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ান না। বৃদ্ধ ওয়ার্নার কিন্তু একজন পাকা ব্যবসায়ী হলেও খাওয়ার ব্যাপারে অনেক উদার। আমোদ-প্রমোদের দিকেও তার নজর আছে। জীবনকে কিভাবে ভোগ করতে হয় তা তিনি জানেন। দুজনেই একই কারবারের শরিক।
সেদিন বৃদ্ধ মেস্তার ও বৃদ্ধ ওয়ার্নার এক জায়গায় বসে কারবার সম্বন্ধে কথা বলছিলেন। মেস্তার তাঁর ছেলে উইলেম সম্বন্ধে খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করেন। বৃদ্ধ ওয়ার্নার পরামর্শ দিলেন, তোমার ছেলেকে একবার বাইরে পাঠিয়ে দাও। কাজকর্ম শিখুক। অনেক জায়গায় অনেক কোম্পানিতে আমাদের করবারের অনেক টাকা পড়ে আছে। সেই টাকাগুলো ও গিয়ে আদায় করুক, তাহলে তাদের সঙ্গে আমাদের ব্যবস্থাগত সম্পর্কগুলো নূতন করে গড়ে উঠবে।
বৃদ্ধ মেস্তার তাতে রাজি হলেন সঙ্গে সঙ্গে। ঘোড়ার জন্য আটকাচ্ছিল। কিন্তু মেস্তার ঠিক করলেন আগামী পরশু দিন সোমবারেই উইলেম চলে যাক।
উইলেমকে ডেকে পাঠানো হলো। তাকে জানিয়ে দেওয়া হলো সিদ্ধান্তের কথা। একথা শুনে খুশি হলো উইলেম। একটানা একঘেয়ে জীবনযাত্রা থেকে মুক্ত নূতন জায়গায় জীবন শুরু করার সুযোগ আপনা হতে এসে গেল তার। শুধু তাই নয়, তার মধ্যে ভাগ্যদেবীর প্রসন্নতার আভাস পেল। তবে একবার মেরিয়ানার সঙ্গে দেখা করতে হবে। রাত্রির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল উইলেম।
