পূর্বরাগের উচ্ছ্বাসটা উইলেমের মনে কিছুটা থিতিয়ে গেলে ব্যাপারটা ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখল সে। কিন্তু তাতে তার ইচ্ছাটা হয়ে উঠল আরও তীব্র আর সঙ্কল্পটা হয়ে উঠলও আরও অটল। মেরিয়ানার কাছে নিয়মিত যাবার এক পরিকল্পনাও খাড়া করল উইলেম। ঠিক করল সারাদিন কাজকর্ম সারার পর সন্ধ্যার পর বাড়িতে খাওয়ার টেবিলে যথারীতি উপস্থিত থাকবে। বাড়ির সকলের সঙ্গে বসে খাবে। তারপর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে খামারবাড়ি দিয়ে চুপিসারে যাবে রাতে। সোজা চলে যাবে মেরিয়ানার কাছে।
একদিন মেরিয়ানার বাসায় কতকগুলো পুতুল নিয়ে গেল উইলেম। প্রথমে পুতুলগুলোকে নিয়ে নিজেই খেলা করতে লাগল মেরিয়ানা। তাদের প্রেমের কথা শেখালে লাগল। পরে তার আদর গিয়ে পড়ল পুতুলের মালিকের উপর। এমন সময় রাস্তায় গোলমালের শব্দ শোনা গেল। বারবারা বলল, একদল লোক হোটেল থেকে বেরিয়ে মদের নেশায় মাতলামি করছে।
মদের কথা শুনে উইলেম কিছু পয়সা দিয়ে বারবারাকে বলল, আমাদের জন্যও কিছু মদ নিয়ে এস। আমাদের সঙ্গে তুমিও খাবে।
খাবার সময় বারবারা পুতুলনাচের কথাটা তুলল উইলেমের কাছে। উইলেম তার সেই ছোটবেলাকার পুতুলনাচের কথাটা নূতন করে শোনাতে লাগল। সেই সঙ্গে তার বাবার অনুশাসন কথাটাও বলল। বলল, বাবা এসব মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার পুতুলনাচের একটা অনুষ্ঠানের সময় বাবা সব পুতুলগুলো কেড়ে নেন। আমি মাকে তা বলায় মা চেষ্টা করেও বাবার মন ঘোরাতে পারেন নি। বেশি আনন্দ বা ফুর্তি ভালো নয়। সব আনন্দানুষ্ঠাই ভালো নয়। ছেলেরা তো দূরের কথা ভালো-মন্দ জ্ঞান বুড়োদেরও নেই।
আমাদের নূতন বাড়িটা হবার সময় একজন ইঞ্জিনিয়ার বাবাকে বিশেষ সাহায্য করেন। তাঁর সঙ্গে বাবার বন্ধুত্বও ছিল। তিনি একবার জোর করে আমাদের বাড়ির ছাদে একটা পুতুলনাচের ব্যবস্থা করেন। তাঁর পীড়াপীড়িতে বাবা মত দিতে বাধ্য হন। পাড়ার ছেলেদের সব নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অনেক দিন পর আবার পুতুলনাচ দেখলাম। পুতুলনাচ দেখতে আমার বড় ভালো লাগত। যদিও আড়াল থেকে মানুষেরা পুতুলগুলোকে নাড়াত, নিজেরাই কথা বলত, তবু অনুষ্ঠান আরম্ভ হলে আমার মনে হতো পুতুলগুলো সব জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ওরা নিজেরা চলাফেরা ও অঙ্গভঙ্গি করে। অভিনয় করছে, কথা বলছে, হাসছে, কাঁদছে মানুষের মতো। সে এক বিপুল আনন্দমেশানো বিস্ময়। সে বিস্ময়ে শিহরণ লেগেছিল আমার সর্বাঙ্গে।
এইভাবে একে একে মেরিয়ানাকে ছেলেবেলাকার প্রধান প্রধান সব ঘটনা, সব ভালো লাগা মন্দ লাগার কথা একের পর এক করে বোঝাতে লাগল উইলেম। শোনাতে শোনাতে রাত বাড়তে লাগল। ঘুমে চোখ দুটো জড়িয়ে এল মেরিয়ানার। তবু সেদিকে কোনও খেয়াল নেই উইলেমের। শুনতে শুনতে ঘুমভেজা চোখে মেরিয়ানা যখন তার উপর ঢলে পড়ল তখন শুধু তাকে আরও টেনে নিল বুকের কাছে।
আর পুতুলনাচের প্রতি আগ্রহ ও নাট্যপ্রীতির কথা বলতে গিয়ে নাট্যতত্ত্বের মধ্য চলে গেল উইলেম। বলল, ট্রাজেডি আমাদের ভালো লাগত না। ট্রাজেডির থেকে ভালো কমেডি লেখা অনেক কঠিন। কিন্তু হে আমার প্রিয়তমা, কোনও নাটক, কোনও কবিতা যতই ভালো হোক না কেন, আমাকে সেই সৌন্দর্যের জগতে নিয়ে যেতে পারবে না। কোনও কবিতার যাদু নয়, তোমার এই নিবিড় বাহুবন্ধনের মধ্যে যে উত্তপ্ত প্রাণস্পন্দন অনুভব করছি সেই প্রাণস্পন্দনই আমাকে নিয়ে যাবে মায়াময় এক চিত্র সৌন্দর্যের রাজ্যে।
এই বলে মেরিয়ানাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল উইলেম। তার বাহুর চাপ আর কণ্ঠস্বরের আবেগসিক্ত তীব্রতায় জেগে উঠল মেরিয়ানা, জেগে উঠেই নিজের ভুল বুঝতে পারল সে। আর তা সংশোধনের জন্য আদর করতে লাগল উইলেমকে।
এইভাবে মেরিয়ানার নিবিড় সান্নিধ্যের মধ্য দিয়ে রাতের পর রাত কেটে যেতে লাগল উইলেমের। মেরিয়ানাকে যখন প্রথম পায় উইলেম তখন পাওয়ার আনন্দের সঙ্গে আশঙ্কা ছিল। অন্তত সংশয় আর আশঙ্কা ছিল। মনে হতো হয়ত বা এ মিলন স্থায়ী হবে না। কিন্তু এইভাবে দিনের পর দিন নির্বিঘ্নে কেটে যাওয়ায় মনে সাহস বেড়েছে উইলেমের। মেরিয়ানার প্রতি তার যে ভালোবাসার ধারণাটা ভাসা ভাসা ছিল, আশা-আশঙ্কার আলো-ছায়ায় চঞ্চলভাবে কাঁপত অনুক্ষণ, আজ তা বিশ্বাসের দৃঢ় ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত।
উইলেমকে পেয়ে মেরিয়ানাও খুবই সুখী। উইলেমকে কাছে পেলে ছাড়তে মন চায় না তাকে। সে যতক্ষণ কাছে থাকে ততক্ষণ কখনও তার বাহুলগ্ন হয়ে, কখনও বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে থেকে, কখনও তার গলা জড়িয়ে কোনদিকে কাটিয়ে দেয় সময়টা। কিন্তু উইলেমের মতো মেরিয়ানার এই সুখ, মিলনের এই আনন্দ অনাবিল। নয়। উইলেম তার কাছ থেকে চলে গেলেই তীব্র অনুশোচনা জাগে মনে। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিতে থাকে। ভাবে সে প্রতারণা করছে উইলেমের সঙ্গে আর উইলেমের ভালোবাসা পাওয়া মানেই প্রতারণার কাছে সফল হওয়া। এমনকি উইলেম যখন কাছে থাকে তখনও বুকে মুখ গুঁজে থেকে বা তার বাহুলগ্ন হয়েও এই আত্মধিক্কার, অনুশোচনার দংশন হতে রক্ষা পায় না মেরিয়ানা। সে যখনই নিজের অন্তরের পানে তাকিয়ে দেখে তখনই মনে হয় সেটা যেন একফালি শূন্য পতিত জমি। সেখানে দেবার মতো কিছুই নেই তার। মনে হয় একথা যখনি জানতে পারবে উইলেম তখনি সে ছেড়ে চলে যাবে তাকে। কিন্তু এই সংশয় আর শঙ্কার দুঃখ যতই প্রবল হয়ে ওঠে তার মধ্যে ততই সে আরও নিবিড়ভাবে সমস্ত অন্তর দিয়ে জড়িয়ে ধরতে চায় উইলেমকে। তার ভালোবাসার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে চায় নিজেকে।
