ওদের বাড়ির কাছে গাড়িটা থামতেই একজন ঝি এসে বলল, লোত্তে এখনি আসবে। আমি গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘরের ভিতর চোখ মেলে তাকাতেই তার রূপ দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলাম আমি। অমন রূপবতী আমি কখনও দেখিনি আমার জীবনে। মেয়েটি আমাকে দেখে বলল, ক্ষমা করবেন, আমার জন্য আপনাদের কষ্ট করতে হলো।
সে তখন তার ভাইবোনদের জন্য রুটি কেটে সকলের হাতে দিচ্ছিল। আমি বুঝলাম তারই নাম লোত্তে। লোত্তে বলল, আমি যাবার জন্য পোশাক পরতে ও তৈরি হতে গিয়ে রুটি কাটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। অথচ আমি ছাড়া এ কাজ করার আর কেউ নেই।
তার কথার উত্তরে আমি কি বলব কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তার অপরূপ অঙ্গসৌষ্ঠব ও রূপলাবণ্য, তার মধুর কন্ঠস্বর ও নম্র আচরণে আমি বিমুগ্ধ ও বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। অভিভূত হয়ে পড়েছিল আমার অন্তর।
ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির নাম লুই। বয়স দু বছর। তার মুখখানা দেখতে বড় ভালো। আমি তার কাছে গিয়ে তার সঙ্গে ভাব করলাম। ওরা আমাদের পানে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। লোত্তের কথায় সে আমার করমর্দন করতে এলে আমি তাকে কোলে নিয়ে চুম্বন করলাম।
মেয়েদের মধ্যে লোত্তের পরের বোন সফি। লোত্তের অনুপস্থিতিতে তারই হাতে থাকবে সংসারের ভার। লোত্তে তাকে সব বুঝিয়ে দিল। দুটি ভাই বাইরে আমাদের গাড়ির পিছনে বসেছিল। ওদের বাবা ঘোড়ায় চেপে কোথায় বেড়াতে গেছেন।
লোত্তে এসে বসতেই আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিল। আমাদের জ্ঞাতি ভাই লোত্তেকে চিনত। সে লোত্তেকে বলল, যে বইটা পাঠিয়েছিলাম পড়েছ? লোত্তে বলল, আমার ভালো লাগেনি। আগের বইটাও ভালো লাগেনি। যখন ছোট ছিলাম সংসারের কোনও দায়িত্ব ছিল না, তখন যে কোনও উপন্যাস হাতে পেলেই পড়ে ফেলতাম বাছবিচার না করে। কিন্তু এখন সময় কম সুতরাং বাছাই করতে হয়। আমার ভালো লাগে সেই সব উপন্যাস যার মধ্যে আমি পাই আমার বাস্তব জীবনের সার্থক প্রতিচ্ছবি। সুখ-দুঃখ-আনন্দ বেদনায় ভরা যে পারিবারিক জীবন আমি যাপন করছি সেই ধরনের পারিবারিক জীবনের কথা যে সব উপন্যাসে থাকে সেই সব উপন্যাস সত্যিই খুব ভালো লাগে।
লোত্তের সব কথা আমার মনঃপূত হচ্ছিল না। তবু আমি তার কোনও প্রতিবাদ করতে পারছিলাম না। কারণ তার চোখ-মুখ ও কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে দারুণ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তবে সে গোল্ডস্মিথের লেখা ভিকার অব ওয়েকফিল্ড নিয়ে যখন কথা বলল তখন তার প্রতিবাদ না করে আমি থাকতে পারলাম না। তাও অনেক পরে প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু সেকথা আর না বাড়িয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল লোত্তে।
উপন্যাসের কথা ছেড়ে লোত্তে এল নাচের কথায়। নাচের প্রসঙ্গ তুলে সে আবেগের সঙ্গে বলল, নাচা বা নাচ দেখার আনন্দ যদি খারাপ হয় তাহলে আমি বলব নাচের থেকে ভালো শিল্প কি তা আমার জানা নেই। যত দুঃখেই পীড়িত হোক না আমার মন, পিয়ানোতে একটা নাচের সুর বাজাতেই সব দুঃখ দূর হয়ে যায় আমার।
যে যখন কথা বলছিল তখন আমি তার কালো চোখের পানে সর্বক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। তার উত্তেজিত ও মৃদুকম্পিত ওষ্ঠাধর, তার তপ্ত ও রক্তাভ গণ্ডদ্বয় আমার অন্তরাত্মাকে আকৃষ্ট করে রেখেছিল একান্তভাবে। আমি নিবিষ্ট মনে তার আদর্শের কথাগুলি শুনে যাচ্ছিলাম বিনা প্রতিবাদে। অথচ সে কথার মানে কি তা বুঝতে পারিনি। বুঝতে চাইনি। অবশেষে যখন গাড়ি এসে ঘটনাস্থলে থামল আর আমি নামলাম তখন আমার মনে হচ্ছিল এতক্ষণ আমি স্বপ্ন দেখছিলাম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে ।
দুজন ভদ্রলোকে এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে গেলেন নাচের আসরে। নাচ শুরু হলো। লোত্তে প্রথমে নাচল অন্য জনের সঙ্গে। পরে আমার সঙ্গে কোয়াড্রিল নাচ নাচল। নাচতে নাচতে দেখলাম নাচের মধ্যে এমনভাবে ডুবে গেছে লোত্তে যে আর কোনও কিছু তার মনে নেই। মনে হলো জগত ও জীবনের আর সব কথা ভুলে গিয়ে পরিবার ও সমাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে শুধু নাচের মধ্যে ডুবে আছে।
নাচ শেষ হয়ে গেলে আমি তাকে আর একবার এই নাচ নাচতে অনুরোধ করলাম। সে বলল, একবার কেন দুবার নাচব। তবে তারপর ওয়ালৎস নাচ নাচতে হবে তার সঙ্গে। তার সবচেয়ে এই জার্মান নাচ ওয়ালস ভালো লাগে। তবে এই নাচে অংশীদার ভালো হওয়া চাই এবং সে নাচে বিশেষ দক্ষতার দরকার হয় বলে সকলে পারে না।
ওয়ালস নাচতে গিয়ে আমার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন লঘু হয়ে গেল আপনা থেকে। আমার আকাঙ্ক্ষিত যে পরমাসুন্দরী মেয়েকে আমি ধরে আছি, তার স্পর্শের মধুর নিবিড়তায় আমার দেহ যেন লঘু হয়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। আমার মনে হলো আমাদের দেহের কোনও ভার নেই। আমার আত্মা যেন এই লঘু দেহটা ধারণ করে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে যে কোনও জায়গায় উড়ে যেতে পারে। আমার মনে হলো আমার প্রিয়তমা লোত্তের হাত ধরে আমি এমনি করে অনন্তকাল ধরে নেচে চলতে পারি। নাচতে নাচতে সারা হলটা আমরা দুজনে ঘুর বেড়ালাম বাহুবদ্ধ হয়ে।
নাচ শেষ করে আমরা কিছু কমলালেবু খেলাম। লোত্তে নিজে বেশি না খেয়ে অন্য মেয়েদের দিয়ে দিল।
এবার লোত্তের সঙ্গে আমি তৃতীয়বার কোয়াড্রিল নাচতে শুরু করলাম। নাচতে গিয়ে তার চোখে দেখলাম এক সরল অনাবিল আনন্দের স্বচ্ছ সুন্দর প্রকাশ। মনে হলো, তার অন্তরের অসাধারণ শুচিতা ও পবিত্রতাই ফুটে উঠেছে সে চোখের আনন্দে।
