মে ২৭,
আমার আবেগ আর বাগিতার স্রোতে ভাসতে ভাসতে অনেক দূর চলে গিয়েছিলাম। আমার ছবির বিষয়বস্তু সেই ছেলে দুটো সম্বন্ধে সব বলা হয়নি। মাঠের ধারে পড়ে থাকা একটা লাঙলের উপর বসে আমি ছেলে দুটোর ছবি আঁকছিলাম; বড় ছেলেটার নাম ফিলিপ। এইভাবে অনেকক্ষণ কেটে গিয়েছিল। অবশেষে বিকালের দিকে তার মা এল শহর থেকে। মেয়েটি বয়সে যুবতী এবং তার মাথায় ছিল একটা ঝুড়ি।
ছবি শেষ করে আমি বললাম, ফিলিপ, তোমার কাজ শেষ হয়ে গেছে। ফিলিপ তার ভাইকে কোলে করে একভাবে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে ছিল। তার মা আমাকে বলল, তার বড় ছেলেকে সঙ্গে করে শহরে গিয়েছিল দুটো জিনিস কিনতে। তার স্বামী সুইজারল্যান্ডে গেছে। সেখানে তার একক খুড়তুতো ভাই-এর কিছু সম্পত্তি পেয়েছে সে। কিন্তু বেশ কিছুদিন তার স্বামীর কাছ থেকে কোনও খবর বা টাকা-পয়সা পায়নি সে। তার ফলে বড় কষ্টে ছেলেদের মানুষ করতে হচ্ছে তাকে।
তবু দেখলাম, মেয়েটির কোনও ক্ষোভ না অভিযোগ নেই। সহজভাবে সহ্য করে চলেছে ভাগ্যের সব বিড়ম্বনা। জীবনের দুঃখময় দুঃসহ অস্তিত্ব হাসিমুখে প্রশান্তচিত্তে এইভাবে বহন করে চলার ক্ষমতা যাদের থাকে তাদের সে ক্ষমতা দেখে মনে বল পাই। আমার চিত্তের সব বিক্ষোভ, সব অশান্তি দূর হয়ে যায়। আমি দিনের শেষে সেদিন ছেলেগুলির হাতে একটি পেনি দিলাম। এরপর রোজ তাদের সঙ্গে দেখা হয়। আমি কফি খাবার সময় কিছুটা করে চিনি দিই। মাখন ও রুটি খাবার সময় তার অংশ দিই তাদের। আর প্রতি রবিবার তাদের হাতে দিই একটা করে পেনি।
মে ৩০,
ছবির সম্বন্ধে যে কথা বললাম, কবিতার সম্বন্ধেও ঠিক সেই কথা খাটে। আসলে কোনটা সুন্দর বা অসুন্দর কবিদের তা দেখার দৃষ্টি থাকা চাই আর তার প্রকাশ করার সাহস ও ক্ষমতা থাকা চাই। এ বিষয়ে আমার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলব। ঘটনাটা ঘটেছে ওয়ালহেম গাঁয়েই।
আজ একটি তরুণ চাষি যুবকের সঙ্গে আলাপ হলো আমার। সে এক বিধবা মহিলার অধীনে চাকরি করে। মহিলাটির যৌবন আর নেই, তবু তার স্বাস্থ্য এখনও অটুট আর বড় চমৎকার। তাঁর প্রথম স্বামী তার উপর পীড়ন করত বলে সেই দুঃসহ স্মৃতির বশবর্তী হয়ে উনি আর কাউকে বিয়ে করেননি। এবং স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে বৈধব্য জীবনযাপন করে চলেছেন। কিন্তু তার আচরণ বড় সৌজন্যপূর্ণ। মন বড় উদার। ছেলেটি বুঝতে পারে না, যে মেয়ের এত সুন্দর দেহমন সে কেন লাঞ্ছিত হতো তার স্বামীর দ্বারা। সে মহিলাটির বিভিন্ন গুণের অকুণ্ঠভাবে প্রশংসা করতে লাগল। মহিলাটির প্রতি তার আনুগত্য আর অব্যক্তনিবিড় প্রেমানুভূতির শীতল অন্তঃসলিলা আর মনটাকে স্পর্শ করল। তার কথা বলার আন্তরিক ভঙ্গিমা, তার কণ্ঠের সঙ্গতিপূর্ণ মাধুর্য, তার চোখের দৃষ্টির অবদমিত উত্তাপ–এই সব কিছুর মাধ্যমে সে তার যে মানসী ও অদৃশ্য আনন্দপ্রতিমাকে মূর্ত করে তোলার চেষ্টা করছিল, আমার মনে জেগে উঠল তার ছবি। তাকে দেখতে আমার ইচ্ছা হলো। কিন্তু পরক্ষণে ভাবলাম না, মেয়েটিকে কোনওদিন নিজের চোখে দেখব না। দেখব সেই ছেলেটির চোখে, সেই ছেলেটির অব্যক্ত প্রেমানুভূতির রঙে-রসে যে মেয়েটি অপরূপা ও অনিন্দ্যসুন্দরী হয়ে উঠেছে। সে আমার চোখের সামনে এলে হয়ত তাকে আর তেমন দেখাবে না।
জুন ১৬,
তুমি লিখেছ কেন আমি তোমাকে চিঠি লিখি না এখন নিয়মিত। তুমি বিজ্ঞ। তুমি নিশ্চয়ই ব্যাপরটা বুঝতে পারবে। আমি বেশ ভালোই আছি। আমি সম্প্রতি আমার মনের মানুষকে খুঁজে পেয়েছি। আমি তাকে ঠিক জানি না।
কথাটা একসঙ্গে বলে ফেলা সম্ভব হবে না আমার পক্ষে। আনন্দের আবেগে আমার মনটা এখন আমার কানায় কানায় ভরা বলেই হয়ত ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না আমি সব কথা ব্যক্ত করার। কি করে ঘটল ব্যাপারটা তা আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারছি না।
সত্যিই এক দেবদূত। তুমি বলবে সব লোকই তার প্রেমাস্পদকে দেবদূত ভাবে। আমিও ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না কেন তাকে দেবদূত বলছি, কোন গুণের দিক থেকে পূর্ণতা অর্জন করেছে সে। তবু একথা সত্যি যে আমার সমগ্র অন্তরাত্মাকে আত্মস্থ করে ফেলেছে সে। বুদ্ধির সঙ্গে সরলতা, দয়ার সঙ্গে দৃঢ়তা, শান্তশীতল আত্মিক প্রশান্তির সঙ্গে উষ্ণনিবিড় এক প্রাণচঞ্চলতা, সব কিছু মিলেমিশে অতুলনীয় করে তুলেছে তাকে আমার চোখে।
কিন্তু এত কথা বলেও আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না। তার দেহের একটি অঙ্গেরও যথাযথ বর্ণনা দিতে পারছি না। অন্য সময় বলব। না না, অন্য সময় নয়, এখনি বলব। এখন না বললে আর কখনও বলা হয়ে উঠবে না।
আমি তাকে দেখে বিচলিত না হয়ে পারিনি। আর আটটি ভাইবোনের মাঝে তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই আমি। এখানে আমি সত্যি সত্যি সুখী উইলেম।
তোমাকে এর আগে একবার লিখেছিলাম এক রাজকর্মচারী তার বনমধ্যস্থ বাসভবনে আমাকে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। আমি যাইনি। হয়ত যেতাম না। কোনও দিনই, ঘটনাক্রমে যদি না একদিন হঠাৎ গিয়ে পড়তাম সেখানে।
সুযোগটা এসে গেল হঠাৎ। আমাদের পাড়ার ছেলেরা এমন একটা নাচের আসরের আয়োজন করেছিল যেখানে যেতে হলে সেই বন আর ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে হবে।
আমরা সেদিন একটি ঘোড়ার গাড়িতে করে রওনা হলাম আমাদের সঙ্গে জনকতক মহিলাও ছিলেন। তাঁরাও এই অনুষ্ঠান দেখতে যাচ্ছিলেন। আমার এক জ্ঞাতি ভাইও সঙ্গে ছিল। গাড়ি বনপথের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলল। আমার জ্ঞাতি ভাই বলল, দেখবে মেয়েটি কত সুন্দর। তাকে আমরা যাবার পথে তাদের বাড়ি থেকে তুলে নেব গাড়িতে। ওর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য শহরের একটি লোক চেষ্টা করছে।
