এমন সময় একজন মহিলা এসে লোত্তের পানে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ‘আলবার্ত’ নামটা উচ্চারণ করল। এ নামের অর্থ আমি বুঝতে না পেরে সরলভাবে লোত্তেকে তা জিজ্ঞাসা করলাম।
লোত্তে আমার প্রশ্নের উত্তরে বলল, আলবার্ত আমার জীবনের অংশীদার হতে চলেছে। তার সঙ্গে আমার বিয়ের কথাটা একরকম পাকাপাকি হয়ে গেছে।
কথাটা আমি গাড়িতে মেয়েদের মুখ থেকে শুনেছিলাম। সুতরাং তা নূতন নয়। তবু আমার কানে যেন বিষ বর্ষণ করল কথাটা। আমার নাচের ছন্দের তাল কেটে যেতে লাগল বারবার। যদিও অবশ্য লোত্তে তা শুধরে নিতে লাগল।
নাচ তখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। এমন সময় শুরু হলো ঝড়, বৃষ্টি। আমরা পথে আসার সময় দিগন্তে মেঘ জমতে দেখেছিলাম। এখন সেখানে বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করেছে। বজ্রের গর্জনে আমাদের বাজনার সুর চাপা পড়ে যাচ্ছিল। পরে বাজনা থেমে গেল। নাচ বন্ধ হয়ে গেল। খোলা জানালা দিয়ে বিদ্যুতের চমক দেখে আর বজ্রের গর্জন শুনে মেয়েদের অনেকে ভীত হয়ে পড়ল। দুজনে পড়ে গেল মেঝের উপর। আবার অনেক ভয়ে তাদের নিজেদের জড়িয়ে ধরতে লাগল।
এমন সময় বাড়ির মালিক এসে আমাদের অন্য একটি ছোট্ট বন্ধ ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় বজ্রের আওয়াজ তেমন শোনা যাচ্ছিল না। লোত্তে বলল আমরা সংখ্যা গণনার খেলা খেলতে পারি। তোমরা সব গোল হয়ে বসে থাক। আমি তোমাদের চারদিকে ঘুরব। প্রথমে ধীরে, পরে জোরে। যার কাছে। যাব সে তার সংখ্যা বলবে। অর্থাৎ আগের লোকের যে সংখ্যা হবে, পরের লোকের হবে তার পরের সংখ্যা। কিন্তু কেউ যদি তার সংখ্যা আমি তার কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চটপট বলতে না পারে তাহলে আমি তার কান মলে দেব অথবা চড় মারব।
আমাদের সকলকে ঘিরে লোত্তে যখন খুব বেগে ঘুরতে লাগল তখন অনেকেই এবং দুবার আমি চড় আর কানমলা খেলাম। তবু বেশ মজা লাগছিল। খেলা শেষ করে লোত্তের সঙ্গে আমি আবার নাচঘরে গেলাম। তখন ঝড় থেমে গেল।
লোত্তে বলল, আমি ভীষণ ভীরু প্রকৃতির। কিন্তু পরকে সাহস দেবার জন্য তখন আমি সাহসের ভান করছিলাম।
এক জায়গায় লোত্তে তার কনুই-এর উপর ভর দিয়ে বসেছিল। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। সে বলল, তার একটা কবিতার কথা মনে পড়েছে। সে তখন জানালা। দিয়ে প্রকৃতির শোভা দেখছিল। আমি তার চোখপানে তাকিয়ে দেখলাম তার দুচোখ জলে ভরে গেছে।
তার চোখে জল দেখে আমার চোখেও জল আসছিল। আমি সেই জলভরা চোখের উপর থেকে তার একটি হাত টেনে ধরে চুম্বন করেছিলাম। আমি তাকে ধীরে ধীরে আমার জীবনকাহিনী শুনিয়েছিলাম। সে কাহিনী শেষ করে যখন বিছানায় শুতে গিয়েছিলাম তখন রাত দুটো বাজে। ৩৮৪ গোটে রচনাসমগ।
জুন ১০,
পরের দিন সকালকে বড় উজ্জ্বল আর মিষ্টি মনে হচ্ছিল। সকাল হতেই আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিল সকলকে নিয়ে। গাড়িতে আমি সর্বক্ষণ লোত্তের কালো চোখের পানে তাকিয়েছিলাম। সে হয়ত তখন তার বাড়ির কথা ভাবছিল। ভাবছিল। তার বাবা আর ভাইবোনদের কথা।
সে যখন গাড়ি থেকে নেমে গেল তখন আমি তাকে বললাম, আজই বিকালের দিকে আমি তাদের বাড়ি যেতে পারি। সে তাতে রাজি হয়ে মত দিল। তারপর থেকে কি যেন হয়ে গেল। সব ওলট-পালট হয়ে গেল আমার জীবনে। সেদিন থেকে আমার প্রায়ই মনে হতো চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্র সব থেমে গেছে আমার আপন গতিপথে। মনে হতো। রাত্রি-দিন বলে কিছু নেই।
জুন ২১,
এখন আমি প্রচুর আনন্দের মধ্যে আছি। ঈশ্বর যে আনন্দ একমাত্র সাধুসন্তুদের দান করেন সেই রকম আনন্দ আমি উপভোগ করে যাচ্ছি। আমি এখন ওয়ালহেম গায়েই বাস করছি পরম শান্তিতে। এখান থেকে লোত্তেদের বাড়ি মাত্র আধঘণ্টার পথ। অথচ আমি যখন এখানে-সেখানে যারাবরের মতো ওয়ালহেম গাঁটাকে পছন্দ করি তখন কিন্তু ভাবতে পারিনি এ গাঁয়ে এত আনন্দ পাব একদিন।
দেখো উইলেম, মানুষের মধ্যে আছে পরস্পর বিরুদ্ধ দুটো প্রবৃত্তি। একটা প্রবৃত্তির বশে সে নিজেকে প্রসারিত করতে চায়, সে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চায়। আর একটা প্রবৃত্তির বলে সে নিজেকে সঙ্কুচিত ও কেন্দ্রীভূত করতে চায় এক বিশেষ ধরনের প্রথাগত জীবনযাত্রার মধ্যে। সে তারই মধ্যে জীবনের আসক্তি খুঁজে পেতে চায়।
আমার কথাটাই ধরো। আমি যখন এ গাঁয়ে প্রথম আসি তখন এখানকার বন উপবন দেখে মনে হয়েছিল আমি তার শীতল ছায়ার সঙ্গে মিশে যাই। এখানকার পাহাড়-পর্বত দেখে মনে হয়েছিল আমি যেন ওদের মতো উঁচু হই, বিস্তীর্ণ উপত্যকাভূমির মতো আমার বুকটাও প্রসারিত হোক। কিন্তু আমি যখন সত্যি-সত্যিই। ওদের খুব কাছে গেলাম তখন দেখলাম ওরা যা ছিল তাই আছে। শুধু আমার চোখে। ছিল মায়ার কাজল। মানুষ তাই প্রথম জীবনে ঘুরে বেড়িয়ে পড়ে সে চায় এক নিশ্চিন্ত গৃহকোণ যেখানে সে তার সন্তানদল পরিবৃত হয়ে তার প্রিয়তমা স্ত্রীর বুকের কাছে এক নিবিড় গার্হস্থ সুখ উপভোগ করতে পারবে।
আমি এখন রোজ সকাল হতেই সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তোমার ‘হোমার’ বইখানি নিয়ে আমার হোটেলের বাগানে গিয়ে এক গাছতলায় বসে পড়ি। পড়তে পড়তে তন্ময়। হয়ে পড়ি। তখন আমার আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় আমি খুব সুখী।
জুন ২৯,
গত পরশু যখন আমি লোত্তেদের বাড়িতে ছিলাম তখন শহর থেকে ডাক্তার আসে। তাদের বাবাকে দেখতে। আমি তখন মেঝের উপর ছড়িয়ে থাকা লোত্তের ভাইবোনদের সঙ্গে তাসের ঘর তৈরির খেলা খেলছিলাম।
