সম্প্রতি একদিন আমি যখন ঝর্নার দিকে বেড়াতে গিয়েছিলাম তখন একটি নিচু শ্রেণীর মেয়ে সেখানে ঘাটে নেমে তার কলসীতে জল ভরছিল। জল ভরা হয়ে গেলে সে চারদিকে তাকিয়ে দেখল সেখানে কেউ নেই। তার মাথায় কলসীটি তুলে দেবার মতো কাউকে না পেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঘাটের সিঁড়িতে। আমি তখন তার কাছে গিয়ে বললাম, চলো, আমি তুলে দিচ্ছি।
সে তখন প্রথমে আপত্তির সুরে বলল, না। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।
আমি বললাম, নাও আর ভণিতা করতে হবে না। এই বলে তার মাথায় কলসীটা তুলে দিতে সে আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল।
মে ১৭,
আমি অনেকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করেছি এখানে, কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এখনও পাইনি কাউকে। কিন্তু জানি না, কি আছে আমার মধ্যে যা এত লোককে আকর্ষণ করে আমার প্রতি। যদি বলো, এখনাকার লোকেরা কেমন, তাহলে বলব, এখানকার লোকরা আর পাঁচ জায়গার লোকের মতোই। বেশির ভাগ সময় তাদের রুজি রোজগারের চেষ্টাতেই কাটাতে হয়। তবে তারা মানুষ হিসাবে সত্যিই খুব ভালো। তাদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে বা নাচগানের আসরে যোগ দিয়ে বড় আনন্দ পেয়েছি।
হায়, আমার যৌবনের বন্ধুকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমি ভাবতেই পারিনি এত তাড়াতাড়ি সে চলে যাবে। আমার সমগ্র অন্তরাত্মার নিবিড়তা দিয়ে আমি আমাদের বন্ধুত্বকে মধুর ও প্রগাঢ় করে তুলেছিলাম। আমাদের দুজনের প্রেমানুভূতি ছিল যেমন সূক্ষ্ম, তেমনি আমাদের সম্পর্কে নিবিড়তা ছিল পবিত্র। সে আমার থেকে বয়সে কিছু বড় ছিল বলেই কি চলে গেল আমার আগে? আমি তাকে কোনওদিন ভুলতে পারব না। তার সংস্পর্শে ও সাহচর্যে আমার সত্তার পূর্ণতাকে নতুন করে অনুভব করি আমি।
দিনকতক আগে এক যুবকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। সে নিজেকে বড় পণ্ডিত পণ্ডিত তাবে। আমি গ্রিক জানি একথা শুনে সে আমাকে খুঁজে বের করে এবং কি কি বই পড়েছে তার কথা বলে।
আর একজন লোকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। লোকটি কোনও এক রাজকুমারের কর্মচারী। সে থাকে আমাদের শহর থেকে মাইলখানের দূরে এক বনের ভিতরে যেখানে তার মালিক প্রায়ই শিকার করতে যায়। তার স্ত্রীর মৃত্যুর পরই দুঃখে সে শহরের বাসা ত্যাগ করে বনবাসে গেছে। তার নয়টি ছেলেমেয়ে। তার বড় মেয়েকে নিয়ে ওরা বেশ মজা করে। তার বাড়িতে আমাকে যাবার জন্য নিমন্ত্রণ করছে।
এ ছাড়া আরও কিছু লোকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে বটে তবে তাদের আমি কোনওমতেই সহ্য করতে পারি না। আজ এইখানেই বিদায় নিচ্ছি।
মে ২২,
মানুষের জীবনটা যে স্বপ্ন তা আমি বেশ করেই বুঝেছি। অনেকেই অবশ্য এর আগে তা বুঝেছে। আমি বুঝছি আজ। যখন দেখি মানুষের কর্মশক্তি ও কর্মপ্রচেষ্টা কত সীমাবদ্ধ, যখন দেখি তার সকল যোগ্যতা ব্যয়িত করে তার প্রয়োজন চরিতার্থ হলেও তার অভাব যায় না জীবনে, যখন দেখি তার জীবনে সকল প্রয়াস, প্রতিশ্রুতি ও আশা ভরসা কুহেলিঘেরা স্বপ্নমোত্র তখন আমি সব আশা ছেড়ে দিই। নীরব হয়ে যাই। তখন আমার মনে হয় এই সমগ্র জগৎটা যেন এক বিরাট কারাগার, যে কারাগারে বন্ধ থেকেও তারা ভিতরকার দেওয়ালগুলোকে চিত্রিত করে চলেছি মূঢ়ের মতো। তখন আমি জগৎ থেকে প্রতিনিবৃত্ত হয়ে ফিরে আমি আমার নিজের মধ্যে। কিন্তু সেখানেও এক আশ্চর্য জগৎ। অতৃপ্ত কামনায় ভরা অস্পষ্ট সে জগতের অন্তহীন অন্ধকারে আমি হাতড়ে বেড়াই যেন।
শিক্ষক আর শিক্ষাবিদরা এ বিষয়ে একমত হবেন যে শিশুরা কি চায় তা তারা নিজেরাই জানে না। আমার মনে হয় বয়স্ক লোকেরাও তা জানে না। তবে সেই সব মানুষেরই সুখী যারা দুঃখের ভাত সুখ করে খায়। বড় মন নিয়ে ছোট কাজ সুষ্ঠুভাবে করে যায়। এ জগতে সুখী তারাই যারা আর পাঁচজন মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে পারে। যারা তাদের ছোট্ট বাগানটাকে স্বর্গের উদ্যানে পরিণত করতে পারে জীবন তারা বন্ধ জেনেও মুক্তির আনন্দ হতে বঞ্চিত হয় না কখনও। কারণ তারা জানে সে কোনও মুহূর্তেই তারা ইচ্ছা করলে বন্ধনকে মুক্তিতে পরিণত করতে পারবে।
মে ২৬,
তুমি হয়ত আগেই জেনেছ ঘুরতে ঘুরতে যে জায়গাটা আমার ভালো লাগে, আমি সেই জায়গাতেই তাঁবু খাঁটিয়ে বাস করতে থাকি। এমনি করে পথ চলতে চলতে হঠাৎ একটা জায়গা ভালো লেগে গেল আমার।
জায়গাটা সত্যিই বড় মনোরম। পাহাড়ের একটা গা। গাটার নাম ওয়ালহোম। গাঁ থেকে বার হলেই চোখের সামনে পড়বে বিস্তীর্ণ এক উপত্যকাভূমি।
আমি যার ঘরে উঠেছি তিনি হচ্ছেন এক বয়স্কা মহিলা। তাঁর মনটা বেশ উদার এবং মুখটা হাসিখুশিতে ভরা। মোটের উপর প্রয়োজনীয় সব কিছুই পাওয়া যায়। জায়গাটা বড় নির্জন আর শান্তিপূর্ণ। আমার বাসার পাশেই আছে দুটো বিরাট লিন্ডেন গাছ। চারদিকের শূন্য প্রান্তরের তাদের লম্বা লম্বা ডালপালা ছড়িয়ে আছে। আমি সেই গাছের নিচে টেবিল-চেয়ার পেতে কফি খাই, অনেক সময় আমার প্রিয় গ্রন্থ হোমার পড়ি। একদিন বেড়াতে বেড়াতে দেখি একটা চার বছরের দেহাতি ছেলে তার এক বছরের এক ভাইকে কোলে নিয়ে বসে আছে। দৃশ্য দেখে আমার এত ভালো লেগে যায় যে আমি সঙ্গে সঙ্গে আঁকতে শুরু করি।
আঁকতে গিয়ে আমার একটা কথা মনে হলো। মন হলো প্রকৃতির মধ্যেই আছে অফুরন্ত সৌন্দর্য আর সম্পদের ভাণ্ডার। অনন্ত সৌন্দর্যময়ী ও সম্পদশালিনী প্রকৃতিই কোনও শিল্পীকে সার্থক করে গড়ে তুলতে পারে। কোনও নিয়মকানুন তা পারে না। নিয়মকানুন মানুষকে কেতাদুরস্ত ও নীতিবাদী করে তোলে ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির প্রতি তার স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি স্বচ্ছ সুন্দর প্রকাশের পথটাকে রুদ্ধ বা জটিল। করে দেয়। যেমন মনে করো ভালোবাসার ব্যাপারটা। মনে করো কোনও একটি যুবক একটি যুবতাঁকে ভালোবাসে। সব সময় তার কাছে কাছে থাকে। তার প্রতিটি কর্মে ও আচরণে তার প্রেমাস্পদের প্রতি তার অকৃত্রিম প্রেমানুভূতির ও সততার পরিচয় দেয়। এমন সময় ধরো, কোনও লোক তাকে উপদেশ দিয়ে বলল, শোনো যুবক, তুমি ভালোবাস ক্ষতি নেই, কিন্তু কাজকর্ম সব বজায় রেখে অবসর সময়ে ভালোবাস, মেয়েটির কাছে অবসর সময়টা স্বচ্ছন্দে কাটাও। কিন্তু ভেবে দেখো, এই উপদেশ মানলে নিয়মকানুনের দ্বারা তার প্রেমানুভূতিকে খর্ব করলে তার প্রেমের সাবলীল গতিপ্রকৃতি কি ক্ষুণ্ণ হবে না?
