মেরিয়া এজিপটিয়াকা : যে স্থানে ঈশ্বরের অক্ষয় অমর দেহটি স্নাত হয়, ঈশ্বরের যে স্থূল দেহ একদিন আমাকে দ্বারপথ হতে ফিরিয়ে দেয়, জনহীন পরিত্যক্ত দেশে চব্বিশ বছর ধরে যে অনুতাপ আমি ভোগ করে আসছি, শেষ বিদায়ের যে বাণী আমি সেখানে বালুকারাশির উপর লিখে আসি–সেই সব কিছুর নামে শপথ করছি আমরা।
তিনজন একসঙ্গে : হে দেবী ক্ষমা করো। আমরা পাপাত্মা হলেও অনুতপ্তা, তোমার মহান উপস্থিতি হতে আমাদের বিমুখ করো না। আমরা না বুঝে যে ভুল যে পাপ করে ফেলেছি তা ক্ষমা করো। আমাদের আশীর্বাদ করো।
উনা পেনিটেনটাম (পূর্বে মার্গারেট নামে অভিহিত) : হে দয়াবতী, তোমার চিরনির্মল হাস্যচ্ছটা বিকীর্ণ করে আমাকে পরম সুখের প্রতিশ্রুতি দান করো। তোমরা কৃপায় যেন আমার প্রেমাস্পদ তার পাপ স্খলন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার সঙ্গে স্বর্গালোকে এসে মিলিত হয়।
স্বর্গীয় বালকরা : আমাদের জীবন পরিণতি লাভ না করতেই আমরা জীবন হারাই তবু ঈশ্বর আমাদের ভালোবাসেন, তিনিই আমাদের যাবতীয় শিক্ষা দান করেন। তার প্রতি আমাদের ভালোবাসা আমাদের প্রতি তার ভালোবাসাকে বাড়িয়ে দেয়।
মার্গারেট : (ফাউস্টকে দেখে) এখানে স্তোত্রগান শুনে সে ধীরে ধীরে নবজন্ম লাভ করছে। তার পার্থিব সত্তা অবগত হচ্ছে। অনন্ত যৌবনশক্তি ফিরে পাচ্ছে সে। স্বর্গীয় দিব্যজীবন লাভ করার আগে তাকে কি কি করতে হবে তা শিখিয়ে দেব আমি।
মেটার গ্লোরিওসা : ওকে আরও ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে যাও পথ দেখিয়ে। ও তোমার কথা শুনবে। তোমার মনের কথা বুঝবে।
ডাক্তার মেরিয়ানাস : হে অনুতাপিনীর দল, মুখ তুলে তাকাও। উনি ওঁর মুখমণ্ডল হতে এক স্বর্গীয় জ্যোতি বিচ্ছুরিত করে তোমাদের মুক্তি দান করছেন। তাঁর আশীর্বাদে ধন্য হয়ে নবজন্ম লাভ করো। আমাদের সকলের আত্মা আমাদের কুমারী মাতা স্বর্গলোকের অধিশ্বরী মেরীর প্রতি উৎসর্গীকৃত হোক।
সাফারিংস অব ইয়ং ওয়ার্দার (উপন্যাস)
সাফারিংস অব ইয়ং ওয়ার্দার (উপন্যাস)
আমি যথাসম্ভব যত্নসহকারে হতভাগ্য ওয়ার্দারের জীবনকাহিনী সংগ্রহ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপিত করছি। জানি, এর জন্য আপনারা আমাকে অবশ্যই ধন্যবাদ দেবেন। তার মন ও চরিত্রের মহানুভবতার জন্য তাকে শ্রদ্ধা না করে পারবেন না। তেমনি তার দুর্ভাগ্যের জন্য চোখের জল না ফেলেও পারবেন না।
হে সদাশয় পাঠকবর্গ, যাঁরা হতভাগ্য ওয়ার্দারের মতোই দুঃখ ভোগ করেছেন, তাঁরা অবশ্যই তার দুঃখময় জীবনকাহিনী থেকে কিছু সান্ত্বনা পাবেন। এবং বইটি তাদের জীবনের পরম বন্ধুর মতো কাজ করবে যারা ভাগ্যক্রমে অথবা নিজ দোষে এর চেয়ে ভাল বই-এর সংস্পর্শে আসতে পারেননি।
প্রথম
মে ৪, ১৭৭১
এখান থেকে আমার পক্ষে চলে যাওয়াটা সত্যি কত সুখের। হে আমার প্রিয় অন্তরঙ্গ বন্ধুগণ, মানুষের অন্তর সত্যই বড় অদ্ভুত। তা না হলে যাদের আমি এত ভালোবাসি, যাদের সঙ্গে আমি এতদিন জড়িয়ে ছিলাম অবিচ্ছেদ্যভাবে, তাদের ছেড়ে যেতে এত আনন্দ হবে কেন? তবু জানি, এর জন্য আমাকে ক্ষমা করবে তোমরা। ভাগ্যক্রমে যাদের সংস্পর্শে এসেছিলাম তারা আজ কত দুঃখ পাচ্ছে আমার জন্যে। হতভাগিনী লিওনোর। তবু এতে আমার কিন্তু কোনও দোষ ছিল না। তার বোনের রূপসৌন্দর্য আমাকে মোহমুগ্ধ করেছিল ঠিক, কিন্তু তার বোনের মধ্যে আমার জন্য যে এক প্রেমগত দুর্বলতা গড়ে উঠেছিল ধীরে ধীরে, তার জন্য আমি কি করতে পারি? তথাপি আমি কি নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলতে পারি? তার সেই প্রেমানুভূতিকে আমি কি প্রশ্রয় দিইনি? তার প্রেমের স্বাভাবিক অভিব্যক্তিগুলো দেখে আমি কি আনন্দ পাইনি? মানুষের জীবন কত আশ্চর্য দেখো। নিজের অবস্থার শোচনীয়তার অনুশোচনা করার অধিকার তার আছে। তবে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি শুধু নিজের দুর্ভাগ্য বা দুঃখের কথাই বলব না, তার সঙ্গে আমার জীবনের অনেক জ্ঞাতব্য তথ্যও জানাব আপনাদের। আমি বর্তমানকে উপভোগ করব অতীত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। অতীত অতীতই থেকে যাবে। মানুষ প্রায়ই বিবর্ণ বর্তমানকে ছেড়ে কল্পনার পাখায় ভর করে বর্ণাঢ্য অতীতে উড়ে যেতে চায় বলেই তার দুঃখ অনেক বেড়ে যায়। আর তার মনটা এমনভাবে গড়া যে তা না গিয়ে পারে না সে।
দয়া করে আমার মাকে বলবে, আমি তার কথা যতদূর সম্ভব মেনে চলব এবং যথাশীঘ্র চিঠি দিয়ে সবকিছু জানাব। আমি আমার পিসিমার সঙ্গে দেখা করেছি। তার মেজাজটা কড়া হলেও তার অন্তরটা খুব ভালো। সম্পত্তির যে উত্তরাধিকার হতে আমরা বঞ্চিত আছি সে সম্বন্ধে আমার মার অভিযোগের কথা আমার পিসিমাকে আমি জানিয়েছি। তিনি তার কারণ আমাকে সব বুঝিয়ে বলেছেন এবং যে কোনও শর্তে তিনি সে সম্পত্তির অধিকার আমাদের উপর ছেড়ে দিতে পারেন এবং আমাদের দাবির থেকে বেশিও দিতে পারেন তাও বলেছেন। এত সব কথা এই মুহূর্তে বলব না। মাকে শুধু বলবে সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তার কোনও খারণ নেই। এ ব্যাপারে আমি একটা জিনিস ভালো করে বুঝেছি, মানুষে মানুষে আসল হিংসা ও প্রতারণার থেকে ভুল বোঝাবুঝিটা আরও ভয়ঙ্কর।
এখানকার নির্জনতাটা সত্যি ওষুধের মতো কাজ করছে আমার অন্তরের ক্ষতের উপর। আমার হিমশীতল অন্তরের কম্পমান সত্তাটার উপর বসস্ত তার নব-যৌবনের সব মধুর উত্তাপটুকু ঢেলে দিচ্ছে। থোকা থোকা ফুলের প্রাচুর্যে ফেটে পড়েছে প্রতিটি গাছপালা, বনঝোঁপ। যে কোনও দিকে একবার তাকালেই সৌরভের বিশাল সমুদ্রে মন ভাসতে থাকে। আর তার মধ্য থেকে প্রচুর পরিমাণে বাঁচার আনন্দ খুঁজে পাই।
