কোরাস : বন্ধ হয়ে গেল। নেমে এল নিশীত রাত্রির স্তব্ধতা।
মেফিস্টোফেলিস : এখন সব শেষ।
কোরাস : সব কিছুর শেষ হয়ে গেল।
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু কেন? যা কিছু আমরা সৃষ্টি করি তা যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে এ সৃষ্টির মূল্য কোথায়? ‘শেষ হয়ে গেল’ কথাটা এমনভাবে বলল যাতে মনে হলো কোনওদিন এর আগে। তা তো নয়। সত্তার একটা চিরন্তন অবিনশ্বর অংশ থেকে যায়, মৃত্যু বা সর্বগ্রাসী কাল যাকে শূন্যতায় পর্যবসিত করতে পারে না।
সমাধি
লিমিওর ও কোরাস : হে হতভাগ্য অতিথি, এই ঘরটা খোন্তা কোদাল দিয়ে কোনওরকমে তৈরি করা হয়েছে তোমার জন্য।
মেফিস্টোফেলিস : দেহটা ওর এখন শায়িত, আত্মাটা উড়ে গেছে। আমি ভালোভাবে লক্ষ্য রেখে চলেছি ওর আত্মা এখনও ওর দেহরূপ আবাস ছেড়ে চলে যায়নি। মৃত্যু এখনও সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি এ দেহে। (অদ্ভুত মন্ত্র পাঠ করতে করতে) এস, এস হে নারকীয় জীবরা। এস তোমাদের উন্মুক্ত করাল মুখগহ্বর প্রসারিত করে। হ্যাঁ ঠিক আছে। নরকের দ্বার উন্মুক্ত দেখছি আর সেই দ্বারপথে দেখছি প্রজ্বলিত নারকীয় অগ্নির শিখা। পাপীর আত্মা পসিডনের ভয়ে পাশ কাটিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে তোমাদের চোখে ধুলো দিয়ে। কিন্তু তাকে ধরে ফেলবে। (স্কুলদেহী শয়তানের প্রতি) আত্মার পাখা আছে। সেই পাখাগুলোকে আগে ছিঁড়ে দাও। তাহলেই সে আত্মা পরিণত হবে অসহায় অন্ধ পোকায়। তোমরা তোমাদের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করো, দেখো আত্মাটা যেন পালিয়ে না যায়। (কৃষ্ণকায় শয়তানদের প্রতি) নির্বাপিত দীপ জীবনের অন্ধকার পিঞ্জরে ওর আত্মাটা বিষণ্ণ হয়ে এখনও বসে আছে। পালিয়ে গেলেই তোমাদের তীক্ষ্ণ চঞ্চু দিয়ে সেটাকে ধরে ফেলবে।
দেবদূত : চলে এস আমাদের সঙ্গে। তোমার পাপ ক্ষমা করে দেব।
মেফিস্টোফেলিস : কিসের গোলমাল শুনছি। এই শুভ্রোজ্জ্বল দেবদূতগুলোই আমাদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। ওরা জানে মানুষের ধ্বংস ও নরক প্রাপ্তিতে আমরা আনন্দ পাই। আমরা তাই চাই। ওই সব ভণ্ডের দল এসে আমাদের শিকারকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এবার কিন্তু তোমরা সজাগ থাক শয়তানের দল। তোমরা কবরে ছুটে যাও। এবার এ শিকার হাতছাড়া হয়ে গেলে লজ্জার পরিসীমা থাকবে না। আসলে ঐ দেবদূতগুলো ছদ্মবেশী শয়তান। আমাদের প্রতারিত করে শুধু।
দেবদূতদের কোরাস : হে গোলাপ, ধীরে ধীরে কুসুমিত হয়ে ওঠ। বায়ুবিকম্পিত পাপড়ি দিয়ে মধুর গন্ধ ছড়াও। নবজীবনের বসন্ত তোমাদের ডাকছে। স্নিগ্ধ নিদ্রায় অভিভূত ওই আত্মাকে স্বর্গে বহন করে নিয়ে যাব আমরা।
মেফিস্টোফেলিস : (শয়তানদের) তোমরা বিচলিত হচ্ছ কেন? ওরা ভেবেছে বরফ ছড়িয়ে শয়তানদের তপ্ত উদ্যম শীতল করে দেব। তোমাদের জ্বলন্ত নিশ্বাসে ওদের সব গোলাপ শুকিয়ে যাবে। একি! তোমাদের সব শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে। সাহস হয়ে হয়ে যাচ্ছে!
দেবদূতরা : কৃতজ্ঞতা, দয়া, মায়া, প্রেম, সত্য, সর্বত্র দেবদূতদের জন্য বাতাসকে মুক্ত রাখে, দিবালোককে উজ্জ্বল করে রাখে।
মেফিস্টোফেলিস : ওঃ কী লজ্জার কথা! সব শয়তানগুলো ডিগবাজি খেতে খেতে নরকে পালিয়ে গেল। যাক। আমি একা এখানে থাকব। শুকিয়ে দেব, ব্যর্থ করে দেব ওদের নবজীবনের সব গোলাপগুলোকে। চলে যাও হে গোলাপ। তোমরা মিথ্যা মায়া, তোমাদের সৌন্দর্য দেখতে উজ্জ্বল মনে হলেও হাতে ধরার সঙ্গে সঙ্গে কুৎসিত ও ম্লান হয়ে ওঠ। তবে কেন তোমাদের তোষামোদ করব? আলকাতরা আর গন্ধকের মতো আমার ঘাড়ে এসে পড়ছে চুলগুলো।
দেবদূতরা : কেন এমন করছ? অন্তরে তোমার দুঃখ কিসের? ভালোকে ভালোবাস। অন্ধকার হতে আলোর পথে এগিয়ে যাও।
মেফিস্টোফেলিস : নরকাগ্নির থেকে তীক্ষ্ণতর অগ্নিশিখায় দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে আমার হৃৎপিণ্ড। আমার মাথাটা কেন ঘুরছে? একদিন তাদের সঙ্গে শত্রুতা করেছি, তাদের দেখার সঙ্গে সঙ্গে ঘৃণায কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে আমার নাসিকা। কিন্তু এখন কোনও শক্তির বশবর্তী হয়ে তাদের প্রতি আসক্ত হয়ে উঠছি আমি। তাদের অভিশাপ দেওয়ার সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। অথচ মনে হচ্ছে তাদের এই ছলনায় আমি প্রতারিত হলে আমার মতো নির্বোধ পৃথিবীতে আর কেউ থাকবে না। এখন কত ভালো কত মনোমুগ্ধকর মনে হচ্ছে তাদের। এস, কাছে এস হে সৌন্দর্যের সন্তানগণ, বলো, তোমরা কি লুসিফারের বংশধর নও? তোমরা এত সুন্দর যে তোমাদের চুম্বন করতে ইচ্ছা করছে। তোমাদের পানে তাকাবার সঙ্গে সঙ্গে বিড়ালের মতো সুচতুর কামনারা। চুপিসারে প্রবেশ করছে আমার প্রতিটি শিরায়। শিহরণ জাগাচ্ছে দেহে। তবু কাছে এস একবার দেখি তোমাদের।
দেবদূতরা : আমরা এসেছি। অস্বস্তিতে কুঁচকে উঠছ কেন? (কাছে এল)
মেফিস্টোফেলিস : দেবদূত হলেও তোমরা অভিশপ্ত। তোমরা নর-নারীকে মোহমুগ্ধ করে ভুল পথে নিয়ে যাও। একেই বলে ভালোবাসা? তোমাদের সংস্পর্শে আমি অনুভব করি এক অসহ্য অগ্নি দীপ্তিহীন প্রদাহ। তবু তোমরা একবার হাস। সেই হাসি দেখে আমিও অনুভব করব এক গভীর আনন্দের আবেগ। তোমাদের দেহ। সুসজ্জিত। তোমাদের দেহ উলঙ্গ থাকতে পারত।
দেবদূতরা : সত্যই সব অভিশাপ দূর করে, প্রেমের আলোই সব কিছুকে পরিষ্কার করে তোলে। আত্মশুদ্ধির পর বুকে তাদের টেনে নাও।
