নিষ্ঠা : আমি আছি।
ফাউস্ট : কে তুমি?
নিষ্ঠা : আমি আছি।
ফাউস্ট : দূর হয়ে যাও।
নিষ্ঠা : আমি যেখানে আছি সেখানেই থাকব।
ফাউস্ট : সাবধান, কোনও যাদুর কথা বলবে না।
নিষ্ঠা : একমাত্র বিপন্ন ব্যক্তি ছাড়া কেউ আমার কথা শুনতে চায় না। জলে-স্থলে সর্বত্রই সব সময় আমাকে পাওয়া গেলেও কেউ আমাকে চায় না। কোনও মানুষ আমাকে মূর্ত দেখতে চায় না। তুমি নিষ্ঠাকে চেন না?
ফাউস্ট : ক্ষুধা আর কামনার তাড়নায় সারা জগৎ ঘুরে বেড়িয়েছি আমি। যা আমার ভালো লাগেনি আমি তা ছেড়ে দিয়েছি। একটি কামনা তৃপ্ত একটি ক্ষুধা নিবৃত্ত হলে আর এক কাম্যবস্তুর জন্য ছুটে চলেছি। জগতের আসল রূপটা আমার দেখা হয়ে গেছে। এই জগতের পরপারে কি আছে তা আমি দেখতে চাই না। অমরত্বের কোনও প্রয়োজন নেই। এই জীবনের অর্থ ও চূড়ান্ত মূল্য এই জগতের মাঝেই খুঁজে পেতে হবে। সুখদুঃখের ফুল ও কাঁটা ছড়ানো পথে নিরন্তর এগিয়ে যেতে হবে মানুষকে চির অতৃপ্ত মন নিয়ে।
নিষ্ঠা : আমি যাকে একবার ধরি সে জীবনে কোনওদিন সুখ পায় না। সব পেয়েও কিছুই পায় না সে।
ফাউস্ট : থামো। তুমি আমাকে কোনওদিন ধরতে পারবে না। চলে যাও। তোমার কথা শোনার কোনও প্রবৃত্তি নেই আমার। তুমি জ্ঞানী লোকদেরও বোকা বানিয়ে দাও।
নিষ্ঠা : সে যাবে না আসবে? সে কি করবে? নিষ্ঠা ছাড়া সে কিছুই করতে পারবে না। মাঝপথে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। না শুরু, না শেষ, না বন্ধন, না মুক্তি তন্দ্রাচ্ছন্ন মানুষের মতো সে শুধু ঝিমোবে। নরকই তার একমাত্র উপযুক্ত স্থান।
ফাউস্ট : হে ছায়ামূর্তি, তুমি আমার মধ্যে যতই ভয়ের সঞ্চার করো না, আমি তোমাকে স্বীকার করব না। আমি দানব বা অপদেবতাদের ভয় করলেও তোমাকে করব না।
নিষ্ঠা : এইবার আমার অভিশাপ ভোগ করো। আমি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সমগ্র সত্তা, সমগ্র অস্তিত্ব অন্ধকার হয়ে যায়। তোমারও তাই হবে ফাউস্ট।
ফাউস্ট : রাত্রির অন্ধকার আমার চারদিকে বেশি করে ঘন হয়ে উঠছে। কিন্তু অন্তরের অন্তঃস্থলে প্রচুর আলো রয়েছে। আমার পরিকল্পনার সবটুকু সার্থক না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না আমি। নাও, সবাই এই মুহূর্তে যন্ত্রপাতি হাতে নিয়ে কাজে লেগে পড়। এ কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। এর জন্য সবচেয়ে ভালো পুরস্কার পাবে। এই বিরাট কাজ শেষ হলে সবাই বুঝবে একটা মন হাজারটা হাতের সমান।
ষষ্ঠ অধ্যায়
প্রাসাদসংলগ্ন রাজসভা। মশাল।
মেফিস্টোফেলিস : (তদারক হিসাবে) কই এদিকে এস, লিমিওর।
লিমিওর : অবিলম্বে আমরা কাজে লেগে গেছি। জায়গা মাপের ফিতেও এনেছি। কিন্তু আমাদের সাহায্য কেন চাওয়া হলো বুঝলাম না।
মেফিস্টোফেলিস : কোনও কারুকার্যের প্রয়োজন নেই। আগেকার কালের মতো কোনওরকমে কাজটা শেষ করলেই হবে। এক বিরাট আয়তক্ষেত্রাকার জায়গা খুঁজতে হবে।
লিমিওর : যৌবনে কত আশা করে প্রেম করেছিলাম। কিন্তু এখন বার্ধক্যে জর্জরিত আমি। আসতে আসতে এক কবরে পড়ে গিয়েছিলাম আমি।
ফাউস্ট : তোমাদের যন্ত্রপাতির শব্দ শুনে বড় আনন্দ হচ্ছে আমার। আমার জন্য জনগণ কঠোর পরিশ্রম করছে। উদ্ধত সমুদ্রতরঙ্গমালাকে প্রতিহত করার জন্য, সমুদ্রকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার জন্য কর্মব্যস্ত হয়ে উঠেছে রাত্রির পৃথিবী। শ্রম ও সাধনার মধ্য দিয়ে মানুষ পৃথিবীকে নতুন রূপ দান করবে।
মেফিস্টোফেলিস : বাঁধ নির্মাণ করার জন্য তুমি আমাদের বৃথাই খাটাচ্ছ। সমুদ্র দেবতার সঙ্গে তুমি লড়াই করছ। সমুদ্রের শয়তানরা তোমাকে ঘিরে ফেলবে। তোমার ধ্বংস অনিবার্য।
ফাউস্ট : তুমি একজন কর্মপরিদর্শক মাত্র।
মেফিস্টোফেলিস : হ্যাঁ আমি তাই।
ফাউস্ট : শক্তিশালী বহু লোক সংগ্রহ করো যে কোনও ভাবে। পুরস্কারের লোভ দেখাও। অথবা আসতে বাধ্য করো পীড়ন দ্বারা। এই পরিখা খননের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন আমাকে খবর দেবে কতটা কাজ হলো।
মেফিস্টোফেলিস : এ কাজ শেষ হলে পরিখা হবে না, হবে তোমার কবর।
ফাউস্ট : ঐ পাহাড়টার পাদদেশে একটা বদ্ধ জলাশয় আছে। ওটা আমার এক দুশ্চিন্তার কারণ। খাল কেটে এই জলটাকে প্রবহমান করে দিতে চাই আমি। সেই জলে লক্ষ লক্ষ লোক চাষ-আবাদের সুযোগ পাবে। কত জমি উর্বরতা প্রাপ্ত হয়ে সবুজ ফসলে ভরে উঠবে। চারদিকে পাহাড়ঘেরা এক সুরক্ষিত জায়গায় এক নূতন সুজলা সুফলা পৃথিবী গড়ে উঠবে। সেই ভূ-স্বর্গের পাশে অসংখ্য সমুদ্রতরঙ্গ কূল অতিক্রম করার জন্য গর্জন করবে। কিন্তু অসংখ্য মানুষের সমবেত চেষ্টায় তা পারবে না। আমি এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি নিত্য নূতন বাধা জয় করার মধ্যে দিয়েই মানুষ তার সত্তার পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করবে। এখানেই থাকবে আমার সারা জীবনের সঞ্চিত জ্ঞানের স্বাক্ষর আর সার্থকতা। এইখানেই অতিবাহিত হবে আমার জীবনের শেষ দিন। এক স্বাধীন চিরসমৃদ্ধ ও চিরসুন্দর দেশের উপর গড়ে উঠবে এক স্বাধীন জাতি। আমি বেশ বুঝতে পারছি আমার এই পার্থিব দেহ ক্ষয় হয়ে যাবে একদিন। তবু এই মুহূর্তে এক চরম সার্থকতায় সমৃদ্ধ এক পরম সুখের ভাবসমুন্নতি অনুভব করছি আমি। (ফাউস্ট পড়ে গেল মাটিতে) লিমিওর তাকে শুইয়ে দিল)
মেফিস্টোফেলিস : সুখ কোনও আনন্দ বা তৃপ্তি দান করতে পারত না তার মাকে। ক্ষণবিলীন কতকগুলো অলীক ছায়ামূর্তিকে সুখ ভেবে জড়িয়ে ধরত তাদের। এই নিঃস্ব রিক্ত মুহূর্তটাকে এক পরম প্রাপ্তি হিসাবে চিরকালের মতো জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু যে কাল সব কিছু গ্রাস করে সেই অমোঘ অপরিহার্য কালগ্রাসে পতিত হয়ে মাটিতে ঢলে পড়ল ও। বন্ধু হয়ে গেল ঘড়ির কাটা। আমাকে ও সব সময় বাধা দিয়ে চলত।
