মেফিস্টোফেলিস : এখন স্ফুর্তি করো। তুমি তো আগেই ওগুলোকে তোমার উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারতে।
ফাউস্ট : এখন তাহলে ওগুলো সরাবার ব্যবস্থা করো। তবে ঐ বৃদ্ধদের থাকার জায়গা আমি বেছে রেখেছি।
মেফিস্টোফেলিস : ওদের অন্য জায়গায় পুনর্বাসন দান করব। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই দেখবে আবার তারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে জোর দেখাতে এসে কিছুই পাবে না। (বাঁশি বাজাল এবং তিনজন শক্তিশালী লোক এল) তোমাদের প্রভু যা বলে শোনো। আগামীকাল ভোজসভা বসবে জাহাজে।
তিনজন : আমাদের মালিক আমাদের ভালো করে অভ্যর্থনা জানাননি। আমাদের ভোজটা যেন আনন্দের হয়।
মেফিস্টোফেলিস : (দর্শকদের পানে তাকিয়ে) অতীতে যেমন হয়েছে এবারও তাই হবে।
চতুর্থ দৃশ্য
নিশীথ রাত্রি
প্রহরী লিসেউস (প্রাসাদশীর্ষে গান গাইতে গাইতে)
এই প্রাসাদশীর্ষেই আমার বাসস্থান। এখান থেকে চারদিকে দেখাই আমার কাজ। এখান থেকে সারা পৃথিবীর পানে তাকিয়ে দেখি আমি। দূরে নিকটে আকাশে মাটিতে বনে প্রান্তরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিয়ে সব কিছু দেখি। সব কিছুই সুন্দর মনে হয়। সব কিছুতেই দেখি ঈশ্বরের মহিমা। (একটু থেমে) তবে শুধু আনন্দজনক বস্তুই দেখি না। অনেক সময় অনেক বিভীষিকাময় বস্তুও দেখি। নিচের পানে তাকিয়ে অন্ধকারে কি দেখছি আমি। লিন্ডেল গাছের ফাঁকে ফাঁকে আগুন জ্বলছে। বাতাসে যে আগুন বেড়ে যাচ্ছে। এখানে যে কুঁড়েঘরে বুড়ো-বুড়ি থাকে সেটা পুড়ে যাচ্ছে। ওধানে গির্জাটাও ভেঙে যাচ্ছে। ওদের কি উদ্ধার করা হয়েছে জ্বলন্ত ঘর থেকে এ ধরনের বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করার থেকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা ভালো। ভোরের লাল মেঘের মতো দিগন্তটাকে আচ্ছন্ন করে আছে এ আগুনটা।
ফাউস্ট : উপরে কার বিলাপের ধ্বনি শুনছি? আমার প্রহরী কাঁদছে। এ হঠকারী কাজের জন্য এখন বিরক্তিবোধ করছি অন্তরে। তবে ঐ কুঁড়েগুলো উচ্ছেদ করার ফলে এবার চারদিক উন্মুক্ত হলো। আর কিছুর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হবে না আমার অনন্ত প্রসারিত দৃষ্টি। ঐ বৃদ্ধ দম্পতির জন্য আমি অবশ্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেব যাতে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো ওরা উপভোগ করতে পারে ভালোভাবে।
মেফিস্টোফেলিস ও তিনজন শক্তিশালী লোক : ব্যাপারটা খুব সুখের হলো না। আমরা ওদের বন্ধ কুঁড়েতে গিয়ে কড়া নাড়ালাম। কত ডাকাডাকি করলাম। কেউ খুলল না। তখন দরজা ভেঙ্গে আমরা ঢুকলাম। বুড়ো-বুড়ি ছাড়া একজন অপরিচিত ব্যক্তি ছিল। ওরা বাধা দিল। জ্বলন্ত অঙ্গার দিয়ে আমাদের মারতে গিয়ে সে অঙ্গর খড়ের উপর পড়ায় আগুন ধরে গেল। ওরা তিনজনেই মারা গেল। ঐ আগুনের চিতায় তিনজনেই ভস্মীভূত হয়েছে।
ফাউস্ট : আমার কথা তোমরা শোেনননি। আমি বলেছিলাম ঘরের বদলে ঘর দেবে, দুস্যতা করবে না। বর্বরের মতো আঘাত হেনেছে ওদের ওপর। এ পাপ তোমাদের বহন করতে হবে।
কোরাস : প্রাচীন প্রবাদবাক্যে বলে বলবানের কাছে যদি মাথা নত না করো তাহলে বাড়ি-ঘর ও তোমার জীবন সব যাবে। (প্রস্থান)
ফাউস্ট : আকাশের তারাগুলো যেন মুখ লুকিয়েছে। ওদিকে আগুনটাও স্তিমিত হয়ে এসেছে। স্যাঁতসেঁতে হাওয়ার মাঝে মাঝে জ্বলে উঠছে আগুনটা। ধোয়াটা এদিকে আসছে। আমার আদেশটা খুব তাড়াতাড়ি পালিত হয়েছে। কিন্তু ছায়ার মতো কি একটা আসছে এদিকে।
পঞ্চম দৃশ্য
নিশীথ রাত্রি
চারজন ছায়ামূর্তির (নারী) আবির্ভাব
অভাব : আমার নাম হচ্ছে অভাব।
পাপ : আমার নাম হচ্ছে পাপ।
নিষ্ঠা : আমার নাম নিষ্ঠা।
প্রয়োজন : আমার নাম প্রয়োজন।
তিনজন একত্রে : দরজায় খিল দেওয়া রয়েছে। আমরা প্রবেশ করতে পারছি না। বাড়ির মালিক ধনী।
অভাব : আমি ছায়ায় পরিণত হয়ে যাচ্ছি।
পাপ : আমি কিন্তু ছায়া হবে না।
প্রয়োজন : আমার কাছে যারা প্রশ্রয় পায় তারা মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়।
নিষ্ঠা : তোমরা ঢুকতে পারবে না বা সাহস করবে না। কিন্তু দরজায় যে ছিদ্র আছে তাতে আমি ঢুকে পড়েছি। (প্রস্থান)
অভাব : তোমরা চলে যাও এখান থেকে।
পাপ : আমি তোমার পাশে পাশেই থাকব।
প্রয়োজন : প্রয়োজন তপ্ত নিশ্বাসে অভাবের কাছে কাছেই থাকে।
তিনজন একত্রে : ভাসমান মেঘমালায় চাঁদ ঢেকে যাচ্ছে। দূরে আমাদের পিছনে আমাদের ভাই মৃত্যু ধেয়ে আসছে।
ফাউস্ট : (প্রাসাদে) আমি চারটি ছায়ামূর্তিকে আসতে দেখলাম। কিন্তু তিনজনকে যেতে দেখলাম। তারা কি বলল তা বুঝতে পারলাম না। তবে দুটো কথা বুঝতে পারলাম, প্রয়োজন আর মৃত্যু। কথাটা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম আমি। এখনও সেই ভয় থেকে মুক্ত করতে পারিনি নিজেকে। প্রাচ্যের সেই জ্ঞানী লোক অর্থাৎ মাজীদের গুপ্তবিদ্যা যদি আমি শিখে নিতে পারতাম তাহলে হে প্রকৃতি আমি একা মানুষের মতো মানুষ হয়ে দাঁড়াতে পারতাম তোমার মাঝে। জীবনের মানে বুঝতে না পেরে জগৎকে কত অভিশাপ দিয়েছি আমি। এখন বাতাসে এত প্রেতের আনাগোনা হচ্ছে যে পরিত্রাণের পথ দেখতে পাচ্ছি না। অতীতে একদিন যখন যৌবন ছিল তখন এই রাত্রিতে কত স্বপ্নজাল রচনা করেছি। কিন্তু তারপর দুর্ভাগ্য শুরু হলো। সঙ্গে সঙ্গে কুসংস্কারের জালে আবদ্ধ হয়ে গেলাম আমি। ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে একটা দাঁড়িয়ে আছি। আমি। দরজাটা খুলে গেল, অথচ কেউ প্রবেশ করল না। বাইরে কে?
