ফিলোম্যান : (রসিসকে) নাও, তাড়াতাড়ি করে ঐ বাগানে গাছের ছায়ায় আমাদের খাবার দাও। (পথিককে) সমুদ্রের যেখানে বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালার কবলে পড়েছিলে তুমি সেইখানে বহুদিন আগে বাঁধে ঘেরা স্বর্গোদ্যানের মতোই এক বাগান। এখন হয়ত দেখতে পাচ্ছ না না সেখানে গড়ে উঠেছিল এক সবুজ জনপদ। যাই হোক, চলে এস, খাবার প্রস্তুত। জাহাজগুলো বন্দরের অভিমুখে চলেছে রাত্রির আশ্রয় নেবার
জন্য।
দ্বিতীয় দৃশ্য
ছোট বাগানবাড়ি
খাবারের টেবিলে তিনজন
রসিস : (পথিককে) তুমি যাচ্ছ না কেন? কত জিনিস এনেছি তোমার জন্য।
ফিলোমন : সে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনার কথা জানতে পারবে। ওকে সব। বলো।
রসিস : সত্যিই ব্যাপারটা অলৌকিক। ভাবতেও কেমন যেন লাগে। মনে হয় এটা যেন কোনও অশুভ ভুতুড়ে শক্তির কাজ।
ফিলোমন : এখানকার এই রাজ্যটা তাকে দান করে সম্রাট কি দুঃখ-অনুতাপে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছেন? এই নিম্ন উপকূলভাগে সেই লোকটা হঠাৎ এসে তাঁবু খাঁটিয়ে সবুজ মাঠের উপরে এসে প্রাসাদ গড়ে তোলার জন্য কাজ শুরু করে দিল।
রসিস : দিনরাত কাজ হতে লাগল। রাতেও আগুন জ্বেলে অনেক লোক কাজ করত। অনেক খাল কেটে সেগুলো সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করে দিল। আমাদের চাষের জমিগুলো সে দখল করে নেবে। সে আমাদের রাজা আর আমরা তার প্রজা।
ফিলোমন : ক্ষতিপূরণস্বরূপ চাইছে আরও ভালো জমি।
রসিস : সে জমি জলে ভেসে যাবে, তার চেয়ে পাহাড়ের উপর বসতি স্থাপনের চেষ্টা করো।
ফিলোমন : এখন চলল গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করি। স্তোত্রগান গাই। সূর্যের শেষ রশ্মিও মুছে গেছে। চলো নতজানু হয়ে ঈশ্বরের প্রতি আমাদের প্রাচীন বিশ্বাসকে। মুখরিত করে তুলি স্তোত্রগানে।
তৃতীয় দৃশ্য
প্রশস্ত প্রমোদ উদ্যান। পাশ দিয়ে চওড়া খাল, রাস্তা চলে গেছে।
বৃদ্ধ ফাউস্ট চিন্তান্বিত অবস্থায় পায়চারি করছিল।
লিনসেউস (প্রহরী) : এখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। জাহাজগুলো পোতাশ্রয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। এর পরে এই খালে প্রবেশ করবে জাহাজগুলো। সমুদ্র নাবিকরা আশীর্বাদ করবে তোমায়। (ছোট এক ঘণ্টার ধ্বনি শোনা গেল নিচের থেকে)
ফাউস্ট : ঐ অভিশপ্ত ঘণ্টার ধ্বনি যেন আমাকে উপহাস করছে। আমার রাজ্য সামনের দিকে অনন্ত প্রসারিত। শুধু পিছনে দুস্ট বাধার জন্য আমার সুন্দর পরিকল্পনাটা সার্থক হতে পারছে না। বাদামী রঙের ঐ কুঁড়েটা তার ভগ্নপায় গির্জাটা আমার দখলে নেই। ঐ ঘণ্টাধ্বনি এই কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আমাকে। পূর্ণ আনন্দ লাভ করতে পারছি না আমি। বিরক্তিকর পুরণো কাঁটার মতো এই চিন্তাটা বিঁধছে আমার মনে। মনে হচ্ছে দূরে চলে যাই।
প্রহরী : একটা একতলা জাহাজ মালপত্র নিয়ে এখানে ভিড়ল। তাতে সিন্দুক, বাক্স, বস্তা কত কি রয়েছে।
মেফিস্টোফেলিস ও তিনজন শক্তিশালী লোক
কোরাস : পাল নামাও। এখানেই আমরা নামব। আমাদের মালিককে নমস্কার। (তারা নেমে মালপত্র নামাল)।
মেফিস্টোফেলিস : আমরা বিভিন্নভাবে আমাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছি। আমাদের প্রভু আমাদের কাজের প্রশংসা করলে আমরা খুশি হব। আমরা মাত্র দুটি জাহাজ নিয়ে গিয়েছিলাম সমুদ্রে। ফিরে এসেছি বিশটা জাহাজ নিয়ে। তার সঙ্গে এনেছি প্রচুর মালপত্র। অনন্ত সমুদ্রে মানুষের মন থাকে উদার উন্মুক্ত। কোনও দুশ্চিন্তা থাকে না। সেখানে শক্তি মানেই অধিকার। তাই দিয়ে সহজেই সেখানে তুমি মাছ ও জাহাজ ধরতে পার। আমি মনে করি যুদ্ধ ব্যবস্থা আর জলদস্যুতা–দুটোই এক। একে অন্য থেকে আলদা করা যায় না।
তিনজন শক্তিশালী ব্যক্তি : কোনও ধন্যবাদ পেতে পারি না আমরা? তার মুখে দেখছি বিরক্তির চিহ্ন। আমাদের মনে হচ্ছে রাজার ধন দেখে উনি বিরক্তি বোধ করছেন।
মেফিস্টোফেলিস : তোমরা তোমাদের অংশ তো নিয়ে গেছ। আর বেতন হিসাবে কিছু চেও না।
শক্তিশালী ব্যক্তিরা : আমরা স্মৃতি করার জন্য সামান্য কিছু নিয়েছিলাম। আমরা সমান অংশ দাবি করি।
মেফিস্টোফেলিস : প্রথমে মালপত্রগুলো সাজিয়ে দাও পরপর। এত ধনরত্ন লাভ করার পর তিনি কখনোই কার্পণ্য করতে পারেন না। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের প্রাপ্য দিয়ে দেবেন এবং ভোজও দান করবেন। কাল এস, আমিও থাকব। (তারা চলে যেতে ফাউস্টের প্রতি) মুখ ভার করে কুঞ্চিত ড্র নিয়ে বসে আছ। তোমার এই সৌভাগ্যের কথা শুনেও শুনছ না। আজ দেখো সমুদ্রকে তোমার এই কূলে নিয়ে এসেছি। আজ তুমি হাত বাড়িয়ে বলতে পার সারা পৃথিবীটাকে তুমি হাতের মুঠোর মধ্যে ধরবে। একদিন তোমার এইখানেই যে পরিকল্পনাটা খাড়া করা হয়েছিল সেই পরিকল্পনা আমরা কিভাবে সার্থক করেছি তা দেখ। তোমার সেবকরা জলভাগ ও স্থলভাগ থেকে কত সম্পদ এনেছে তা দেখ।
ফাউস্ট : এখনও ঐ অভিশপ্ত ঘরটা রয়েছে ওখানে। অন্তরে যেন যেন হুল ফোঁটাচ্ছে। সহ্য করতে পারছি না আর। একথা বলতে লজ্জা হচ্ছে আমার। চুন সুরকির ঐ কুঁড়েটার নিশ্বাস যেন ঐ ঘণ্টাধ্বনিও সমস্ত বাতাসটাকে দূষিত করে দিচ্ছে।
মেফিস্টোফেলিস : এই ঘৃণাটা তোমার জীবনটাকে স্বাভাবিকভাবেই তিক্ত করে তুলছে। এই অভিশপ্ত ঘণ্টাধ্বনি এই সন্ধ্যার আকাশকে যেন আরও অন্ধকার করে দিয়ে বলছে জীবনটা স্বপ্নমাত্র।
ফাউস্ট : ঐ অভিশপ্ত ঘণ্টার একটানা একঘেয়ে শব্দটা আমার পাওয়া সব ধনরত্নের উজ্জ্বলতা ম্লান করে দিচ্ছে। আমি বিরক্তি অনুভব করছি।
