সম্রাট : তোমাদের যা বলার বলেছি। সম্রাটের মুখের কথাই যথেস্ট। যাকে যা দেবার তাও একবার বলা হলে অবশ্যই দেওয়া হবে। স্বাক্ষর দরকার। উপযুক্ত স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ঠিকমতো তার প্রয়োগ হয় তা দেখতে হবে।
প্রধান যাজক ও প্রধান প্রশাসকের প্রবেশ
সম্রাট : তোমরা চারজন রাজন্যকে দেখলে। আমি তাদের বুঝিয়ে দিয়েছি কিভাবে রাজপ্রাসাদ ও রাজদরবার পরিচালিত করতে হবে। তোমরা সকলে যেমন বিশ্বস্ততার সঙ্গে আমার সেবা করে যাবে তেমনি তার প্রতিদানস্বরূপ তোমাদের এক একটি রাজ্য দান করব। পরে সে রাজ্য তোমরা বাড়াতেও পারবে বিভিন্নভাবে। সেখানে তোমাদের বিচারের উপর কোনও আদালতে আবেদন চলবে না। সব করের টাকা তোমরা পাবে। শুধু খনিজদ্রব্য আর মুদ্রা থাকবে আমার অধিকারে। কৃতজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে এইভাবে তোমাদের পদোন্নতি করলাম।
প্রধান যাজক : আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গভীর ধন্যবাদ জানাচ্ছি আপনাকে। আপনি আমাদের নিরাপত্তা দান করে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সম্রাট : আমি আপনাদের উচ্চতর মর্যাদা দান করব। আপনারা আমাকে এই সিংহাসনের উত্তরাধিকারীরূপে অধিষ্ঠিত করুন। এতদিনের যুদ্ধ-বিবাদ সব অনাবিল শান্তিতে পরিণত হোক।
প্রধান প্রশাসক : আপনিই হচ্ছেন প্রথম নরপতি যার সামনে বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত করলাম আমরা। যতদিন আমাদের শিরায় শিরায় বিশ্বস্ততার রক্ত প্রবাহিত হবে ততদিন কখনও অবাধ্য হব না আপনার।
সম্রাট : কয়েকটি শর্তে যে অধিকার ও সম্পত্তি তোমাদের দান করলাম তা দলিলে লিপিবদ্ধ হোক। এই সব সম্পত্তির আয় উপসত্ত স্বাধীনভাবে ভোগ করবে। তোমরা।
প্রধান প্রশাসক : আমি কাগজে তা লিপিবদ্ধ করব। পরে স্বাক্ষর সংযুক্ত হবে তাতে।
সম্রাট : এখনকার মতো সভা ভঙ্গ করলাম। উৎসবের বিষয় নিয়ে আলোচনা করো নিজেদের মধ্যে।
প্রধান যাজক : প্রশাসক চলে গেলেও যাজক রয়ে গেল একটা বিষয়ে আপনাকে সতর্ক করে দেবার জন্য। আমার পিতৃসুলভ হৃদয়টা আপনার জন্য ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
সম্রাট : এই সুখের সময়ে কিসের ভয় অনুভব করছ তুমি?
যাজক : এই সুখের সময়ে এই কথা ভেবে দুঃখ পাচ্ছি যে আপনি সিংহাসনে এখন সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও আপনার মাথায় শয়তান বাস করছে। আমাদের ধর্মগুরু জানতে পারবেন আপনি সেই পুরুষ ডাইনটাকে হাতে পেয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি আপনাকে শাস্তি দান করবেন।
সম্রাট : এই পাপের জন্য আমি গভীর ভয় অনুভব করছি। তোমার শক্তিতে তুমি এই পাটা অনেক লঘু করে দেবার চেষ্টা করবে।
প্রধান যাজক : যে রাজ্যে পাপ প্রবেশ করেছিল সে রাজ্যকে পাপমুক্ত করতে হলে ব্যাপকভাবে ধর্মাচরণ করতে হবে। সকালে উঠেই ঈশ্বরের স্তোত্রগান করতে হবে। দিকে দিকে ধর্ম প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। ঈশ্বরে বিশ্বাস বাড়াতে হবে জনগণের মধ্যে। রাজ্য থেকে নাচগানের উৎসব উচ্ছেদ করতে হবে। পাপীর হৃদয়কে অনুতাপে ভরিয়ে তুলতে হবে।
সম্রাট : আমার অনুপাতবোধ এবং ঈশ্বরের গুণগানের ব্যবস্থাই হবে আমার প্রথম কাজ।
যাজক : এবার চার্চের সঙ্গে রাজার সন্ধি স্থাপন করতে হবে।
সম্রাট : আগের নথিপত্রে দেখছি চার্চ রাজকীয় প্রভাব থেকে মুক্তি চাইছিল। তোমাদের আবেদন আনো। আমি স্বাক্ষর করে দেব।
প্রধান যাজক : (যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে) এই মুহূর্তে কাজ শুরু করে দিন। চার্চের উন্নতির জন্য রাজ্যের সমস্ত আদায় করা কর ব্যয় করুন। আমাদের ব্যয়ভার বহনের জন্য অনেক কিছু দরকার। আপনার কোষাগার হতে কিছু সোনাও দান করবেন। এছাড়া যে সব নিত্য ব্যবহার্য বস্তু আমাদের দরকার, জনগণ আমাদের নীতি উপদেশ সম্বলিত বক্তৃতা শুনে তা দান করবে। যে ব্যক্তি চার্চের জন্য ব্যয় করবে তাকে চার্চ অবশ্যই আশীর্বাদ করবে। (প্রস্থান)
সম্রাট : পাপের পরিমাণ সত্যিই বিরাট। যাদুকরেরা অনেক ক্ষতি করে গেছে। অনুতাপে ভারাক্রান্ত আমার হৃদয়।
প্রধান যাজক : (ঘুরে এসে) ক্ষমা করবেন মহারাজ, উপকূলভাগের যে রাজ্যটা সেই কুখ্যাত যাদুকরকে দান করেছেন, আপনার পাপ স্খলন না হওয়া পর্যন্ত তারও কর ও রাজস্ব আমরা পাব। সেও বাদ যাবে না।
সম্রাট : সে রাজ্যের অস্তিত্ব এখন আর নেই। তা এখন সমুদ্রে ঢুকে গেছে। প্রধান যাজক : যে ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ ও ধৈর্যশীল তার সুদিন আসবেই। (প্রস্থান) সম্রাট : আমার গোটা সাম্রাজ্যটা তোমাদের দান করলে ভালো হতো।
পঞ্চম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
উন্মুক্ত গ্রামাঞ্চল
পথিক : হ্যাঁ, এখানেই আছে সেই বৃদ্ধ দম্পতি। দীর্ঘ তীর্থযাত্রার পর তাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে আবার। বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এখানে এই কুঁড়েঘরে আশ্রয় লাভ করেছি আমি। বৃদ্ধ হলেও তারা ধার্মিক। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আবার দেখতে পাব তাদের।
রসিস (জনৈক বৃদ্ধা) : ধীরে পথিক। আমার স্বামীর ঘুম ভেঙে যাবে। দীর্ঘ নিদ্রার দ্বারা তিনি ক্লান্ত ও অবসন্ন দেহে শক্তি ফিরে পেতে চান।
পথিক : বলো মাতা, তুমিই কি রসিস যিনি আমাকে একদিন সেবা-শুশ্রষার দ্বারা নবজীবন দান করেন, যাকে ধন্যবাদ দেবার জন্য এখানে এসেছি। আমি। (স্বামী এগিয়ে এসে) তুমিই তো ফিলোমন, আগ্রাসী সমুদ্রতরঙ্গের কবল থেকে আমার ধনরত্ন। রক্ষা করেছিলে। আমার দুর্ভাগ্য তোমারই জন্য পরিণত হয়েছিল সৌভাগ্যে। একবার সেই অনন্ত সমুদ্রকে দেখতে পাও।
