ফাউস্ট : হ্যাঁ জাগে। আমার মনে এক বিরাট পরিকল্পনা গড়ে ওঠে। কিছু অনুমান করতে পারছ?
মেফিস্টোফেলিস : তা বুঝেছি। আমি আর একটা বড় নগর বা রাজধানী অধিকার করব। তাতে থাকতে একটা বিরাট বাজার। কত তরিকরকারি ও মালপত্রে ভরা সে বাজারে অনবরত থাকবে মানুষের ভিড়। তার কাছাকাছি বড় রাস্তার ধারে আমি আরামে ও অফুরন্ত অবসরে বাস করব। সামনে থাকবে প্রসারিত গ্রাম্য প্রান্তর। আমার বাড়ি থেকে পিঁপড়ের মতো সারবন্দি কর্মব্যস্ত মানুষের আনাগোনা দেখতে বড় ভালো লাগবে আমার। অসংখ্য মানুষ আমাকে সম্মান করবে, শ্রদ্ধা করবে।
ফাউস্ট : না, আমি তাতে সন্তুষ্ট নই। কি হবে তাতে? কোনও জনপদের মানুষ ভালো খেল, মাখল, লেখাপড়া শিখল, সংখ্যা বৃদ্ধি করল। কিন্তু শেষে দেখবে ক্ষোভ বাড়তে থাকতে দিনে দিনে। তাতের সন্তুষ্ট করতে পারবে না কিছুতে।
মেফিস্টোফেলিস : তাহলে আমি আমার সচেতন শক্তি ও সুরুচির সাহায্যে কোনও এক মনোরম স্থানে প্রাসাদোপম এক প্রমোদভবন নির্মাণ করব। পাহাড়, সবুজ। মখমলের মতো ঘাসে ঢাকা প্রান্তর, সাজানো বাগান, ঝর্না সব থাকবে তার সীমানার মধ্যে। চিত্তবিনোদনের জন্য থাকবে অনেক সুন্দরী নারী। নারী শব্দটা আমি সব সময় বহুবচনে প্রয়োগ করতে চাই। এইভাব এই নিভৃত নির্জন ভবনে অনন্ত উজ্জ্বল আরামঘন অবকাশ যাপন করব আমি।
ফাউস্ট : এও ভালো নয়।
মেফিস্টোফেলিস : তাহলে বুঝেছি তুমি কি চাও। সেটা কিন্তু খুবই সাহসের ব্যাপার। চাঁদের কাছাকাছি চলে গেছে তোমার উচ্চাভিলাষ। তোমার বাতিকগ্রস্ত মন কি চাঁদের রাজ্যটাকেও দখল করতে চায়?
ফাউস্ট : না ঠিক তা নয়। এই পৃথিবীর মাটিতেই এখনও অনেক কিছু করার আছে। কত বিস্ময়কর পরিকল্পনা মাথায় আসছে। নূতন শক্তিও কর্মোদ্যম অনুভব করছি আমি।
মেফিস্টোফেলিস : তুমি তাহলে বীরের মতো গৌরব অর্জন করবেই? মনে হচ্ছে বীরাঙ্গনারা সঙ্গিনী হয়েছে তোমার।
ফাউস্ট : শক্তি ও সম্পদলাভের অভিলাষ পেয়ে বসেছে আমায়। তার জন্য কাজ করতে হবে। কাজই আসল কথা, গৌরব নয়।
মেফিস্টোফেলিস : কবিরা তার বিচার করবে। তোমার নির্বুদ্ধিতা থেকে নিবুদ্ধিতাই বাড়বে। ভবিষ্যৎ প্রমাণ করবে তোমার গৌরব।
ফাউস্ট : তোমার যা নাগালের বাইরে তার বিষয় জানবে কি করে? হিংসাগ্রস্ত কণ্টকিত তোমার অন্তর মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা জানতে পারে না।
মেফিস্টোফেলিস : তোমার ইচ্ছা-অভিলাষ তোমার থাক। তবে তার কথা বিশ্বাস করে আমায় বলতে পার।
ফাউস্ট : উন্মুক্ত সমুদ্রের উপর চোখ পড়ে গেল আমার। দেখলাম অসংখ্য তরঙ্গমালা আপনার থেকে উত্তাল হয়ে উপকূলভাগকে আক্রমণ করার জন্য উদ্দাম বেগে ছুটে চলেছে। মনে হলো, ও তরঙ্গ আমাদেরই উত্তেজিত রক্তের উদ্ধত তুফান সকলের সব অধিকারবোধকে গ্রাস করার করার ছুটে চলেছে স্বাধিকার প্রমত্ত অবস্থায়। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম সে তরঙ্গমালা গর্জন করতে করতে ফিরে আসছে। করায়ত্ত। লক্ষ্যবস্তুকে ছেড়ে দিয়ে চলে আসছে।
মেফিস্টোফেলিস : এটা এমন কিছু নূতন ব্যাপার নয়। শত সহস্র বছর ধরে এ। ঘটনা দেখে আসছি আমি।
ফাউস্ট আবেগের সঙ্গে) : যে সমুদ্রতরঙ্গ কূল পাবিত করে ছুটে চলে তার জলরাশি কিন্তু সৃজনীশক্তিবিহীন। তা কোনও উষর ভূমিকে উর্বর করতে পারে না। এই উদ্দেশ্যহীন প্রকৃতির নিষ্ফল সমারোহ আমাকে হতাশ করে তোলে মাঝে মাঝে। তবু আমি প্রতিনিবৃত্ত হই না। আমি দেখছি একমাত্র পাহাড়ই সমুদ্রকে দমন করতে পারে। উদ্ধত উদ্বেল তরঙ্গমালা অটল পাহাড়ের পদতলে শান্ত হরিণশিশুর মতো খেলা করতে থাকে। আমিও তেমনি ঐ উত্তুঙ্গ পাহাড়ের মতোই মাথা তুলে উঠতে চাই। সমস্ত প্রতিকূলতার তরঙ্গমালাকে প্রতিহত করে ফিরিয়ে দিতে চাই।
(দূর হতে সামরিক সঙ্গীতের শব্দ আসছিল)।
মেফিস্টোফেলিস : কত সহজে কথাটা বললে! ঢাকের শব্দ শুনতে পাচ্ছ?
ফাউস্ট : জ্ঞানী ব্যক্তিরা আসন্ন যুদ্ধের কথা শুনতে চায় না।
মেফিস্টোফেলিস : যুদ্ধ বা শান্তির কালে সুযোগ গ্রহণ করাই হলো জ্ঞানীর কাজ। বিজ্ঞ ব্যক্তিরা যে কোনও অবস্থা থেকেই কিছু না কিছু লাভ করার চেষ্টা করেন। তাঁরা লক্ষ্য করে যান। এখন সুযোগ উপস্থিত। সে সুযোগ গ্রহণ করো ফাউস্ট।
ফাউস্ট : তোমার ওসব ঐন্দ্রজালিক ধনরত্নের মধ্যে আমি নেই। কি বলতে চাও ভালো করে বলল।
মেফিস্টোফেলিস : আমি এটা বেশ বুঝতে পেরেছি সম্রাটের এখন বিরাট দুর্দিন সমাগত। তুমি জান আমরা সেখানে থাকাকালে অনেক মায়াময় ধনসম্পদ তাঁকে দান করি। তার ফলে তার লোভলালসা বেড়ে যায়। তার উপর বয়সে যুবক বলে সহজেই উচ্ছলতায় গা ঢেলে দেন। সততা এবং কামনা, সুশাসন এবং ভোগবাসনা এই দুটো জিনিস কখনও পাশাপাশি চলতে পারে না।
ফাউস্ট : এক বিরাট ভুল করেছেন তিনি। সুশাসক হতে হলে নিজের ইচ্ছা ও কামনা-বাসনাকে বিশ্বস্ত প্রজাকূলের স্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে চলতে হবে।
মেফিস্টোফেলিস : সে সুশাসন তিনি করতে পারেন নি। তিনি ভোগবাসনায় গা ঢেলে দেন। ফলে সারা রাজ্যে দেখা দেয় নিদারুণ অরাজকতা। উচ্চ-নীচ সকলে মারামারি করতে থাকে পরস্পরের সঙ্গে। ভাই ভাইকে হত্যা করে। এমনকি ধর্মস্থানেও নরহত্যা চলতে থাকে। ব্যবসায়ীরা অসহায় বোধ করতে থাকে। চারদিকে বইতে থাকে প্রতিহিংসার স্রোত। শাসনের অভাবে সকলেই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার জন্য।
