ফোর্কিয়া : সেই সুন্দর উজ্জ্বল প্রাণের অগ্নিশিখা উড়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু এই পোশাক। কবিরা এই নিয়েই বেঁচে থাকবে। তাদের আমি প্রতিভা দান করতে না পারলেও অন্তত পোশাকটা দিতে পারব।
প্যানথালিন : তাড়াতাড়ি করো। হে রানির সহচরীরা, এখন আমরা সমস্ত ইন্দ্রজালের প্রভাব থেকে মুক্ত। তোমাদের রানি এখন ধীর পায়ে ধাপে ধাপে নরকে নেমে চলেছেন বিষণ্ণ রাজার পাশে। তার বিশ্বস্ত সহচরীরাও চলো সেখানে।
কোরাস : রানিরা সব জায়গাতেই সুখে থাকে। সব জায়গাতেই সম্মান পায়। নরকে গিয়েও নরকের দেবী পার্সিফোনের সঙ্গে সম্মানের সাথে থাকবে রানি। আর আমরা পড়ে থাকব ফলহীন গাছেঘেরা এক প্রান্তরে। বাদুড়ের মতো শুধু কিচমিচ করব আমরা।
কোরাসনেত্রী : যারা নাম-যশ চাও না, বড় কাজ করতে চাও না তারা নিষ্প্রাণ জড়বস্তুর মতো। তারা চলে যাও। আমি রানির কাছে যাব। সেবা ও বিশস্ততার পরিচয় দেব। (প্রস্থান)
সকলে : উজ্জ্বল লিলাকে মানুষের মতো বেড়াতে না পারলেও আমরা নরকে কখনও যাব না। প্রকৃতি আমাদের বিদেহী প্রেত করেছে।
কোরাসদলের এক অংশ : আমরা বাতাসের মতো এই সব গাছের শাখাদের সঙ্গে কথা বলব। দেখব তারা কেমন ফুলে-ফলে ভরে ওঠে। গাছ থেকে ফল পড়লে কত লোক আসবে তা কুড়োতে। আমাদের পায়ের তলায় নত হবে।
দ্বিতীয় অংশ : আমার এই সব পাহাড়ের ধারে থেকে পাখির গান শুনব।
তৃতীয় : আমার এই সব নদীর সঙ্গে বন ও প্রান্তরের মধ্য দিয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে চলে যাব।
চতুর্থ অংশ : আমরা এইসব আঙ্গুরক্ষেতের চারদিকে থাকব। আঙ্গুরক্ষেত্রের মালিকরা কত কষ্ট করে আঙ্গুর চাষ করে আঙ্গুল ফলিয়ে তার থেকে মদ তৈরি করে তা দেখব আমরা। (যবনিকাপাতের সঙ্গে সঙ্গে ফোর্কিয়া মুখোশ খুলে ফেফিস্টোফেলিসে পরিণত হলো) ভালো জায়গাতেই অবস্থান করছেন সম্রাট।
চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
উচ্চ পর্বতমালা
একটি পর্বতশৃঙ্গের উপর মেঘ এসে জমল
ধীরে ধীরে ফাউস্টের প্রবেশ
ফাউস্ট : উপর থেকে এখানে এক গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে দেখে আমি এই পর্বতশৃঙ্গে নেমে পড়েছি। যে মেঘমালা আমাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল তা এখন আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্বদিকে চলে গেছে। সেই ভাসমান তরঙ্গায়িত মেঘমালা সহসা জুনো, লেডা বা হেলেনার মতো এক পরমা সুন্দরী নারীর আকার লাভ করল। কিন্তু পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল বাষ্পরাশির মধ্যে। পরে তা এক ধূসর পাহাড়ের মতো দিকচক্রবাল আচ্ছন্ন করে দাঁড়িয়ে রইল। অতীতের অনপনেয় স্মৃতিপুঞ্জ মূর্ত হয়ে উঠল যেন বুকে। পার্থিব দেহসৌন্দর্য প্রহেলিকায় পরিণত হয়ে গেলেও আত্মিক সৌন্দর্যের একটি জ্যোতি আজ আমার মনে জেগে আছে এবং তা আমাকে ঊর্ধ্বে আকর্ষণ করছে। আমার সত্তার শ্রেষ্ঠ অংশটিকে নিয়ে যাচ্ছে দূরে। (মেফিস্টোফেলিস এগিয়ে এল)।
মেফিস্টোফেলিস : এই নরকের রাজ্যে কেন তুমি লম্বা লম্বা পা ফেলে পায়চারি করছ তা তুমি নিজেই জান। এই নরকের ভিত্তিভূমিতে আমি তাদের দেখতে চাইনি।
ফাউস্ট : মিথ্যা মনগড়া রূপকথার কখনও অভাব হয় না তোমার। এই ধরনের এক রূপকথা হয়ত আবার বলতে চাও।
মেফিস্টোফেলিস : যখন ঈশ্বর আমাদের পাতালে পাঠিয়ে দেয় তখন আমরা সেখানে গিয়ে এক অনির্বাণ আগুনের শিখায় তপ্ত হয়ে উঠছি। তার উপর এক জায়গায় অনেক লোক থাকায় সেই গরমে সর্দি-কাশি প্রভৃতি নানারকম রোগ হতে লাগল। তখন পৃথিবীর সীমাটা বাড়াবার প্রয়োজন হলো। আর তা করতে গিয়ে সব ওলট-পালট হয়ে গেল। নিচেকার লোক উপরে চলে এল আর উপরকার তোক নিচে চলে গেল। পৃথিবীতে যে সব আইন প্রণীত হয়েছে তার উদ্দেশ্যও হলো সমাজের উপরতলার লোককে নিচে আর নিচের তলার লোককে উপরে আনা। এ রহস্য পরে সবাই জানতে পারবে।
ফাউস্ট : আমি যখন পাহাড় দেখি তখন জানতে চাই না কোথা হতে কেমন করে এসব হলো। তবে আমার মনে হয় প্রকৃতি যখন নিজের মধ্যে নিজে পূর্ণতা অর্জন করেছে তখন সে পৃথিবীকে গোলাকাররূপে সৃষ্টি করে। তারপর তার মধ্যে থরে থরে কত পাহাড় সাজিয়ে দেয়। পাহাড়ের তলায় উপত্যকা, গিরিপথ, তারপর সবুজ প্রান্তর ও বনভূমি–কত কি সাজিয়ে দেয়। প্রকৃতি পৃথিবীর যেখানে যা রেখেছে তাই যথেষ্ট। তার উপর কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। সেটা হবে উন্মাদ ও হঠকারীর কাজ।
মেফিস্টোফেলিস : তুমি তা বলবে। তুমি ভাবছ এই দিবালোকের মতো সহজ। কিন্তু যারা তা নিজের চোখে দেখেছে তারা বলবে অন্য কথা। আমি তখন সেখানে ছিলাম, যখন পৃথিবীর তলায় এই রকম ওলট-পালট চলছিল, যখন গরম আগুনের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল আর মনকন হাতুড়ি দিয়ে পাহাড়গুলোকে পিটিয়ে পিটিয়ে স্থাপন করছিল পৃথিবীর বুকের উপর। শিক্ষিত লোকদের সব পাণ্ডিত্য ব্যর্থ ও রহস্য উঘাটনে। সরলপ্রাণ বিশ্বাসসর্ব সাধারণ মানুষ সহজভাবে নেমে নিয়েছে এ সত্যকে। আমার মতো শয়তানের কৃতিত্ব এই যে আমি এক আশ্চর্য খঞ্জ পথিকের মতো ক্রাচে ভর দিয়ে অনেক পাহাড় উপত্যকা পার হয়ে চলেছি অজানা রহস্যের সন্ধানে।
ফাউস্ট : শয়তানের প্রকৃতিটা কেমন তা এখন দেখা দরকার।
মেফিস্টোফেলিস : প্রকৃতির মধ্যে শয়তান আছে। আমাদের মতো শয়তানের কাজ হলো বড় বড় পরিকল্পনা করা। অনেক হৈ-চৈ গোলমাল ও শক্তি অপচয় করেও অবশ্য কিছু হয় না পরিশেষে। তবু আমরা অনেক উপরে উঠেছি। আমার বাইরের আকার ও লক্ষণ দেখে কিছু বুঝতে পার না? এই অনতিক্রম্য বিরাট উচ্চতা থেকে যে রাজকীয় গৌরব ও শক্তির জৌলুস বিচ্ছুরিত করি তা দেখে তোমার শক্তির দম্ভলাভের জন্য লালসা জাগে না?
