ফাউস্ট : তারা উঠছে আর পড়ছে। পড়ছে আর উঠছে।
মেফিস্টোফেলিস : এই ধরনের অবস্থা যখন চলছিল, যখন ভয়ে কেউ কোনও কথা বলতে পারছিল না, তখন একজন সমর্থ ব্যক্তি সাহস সঞ্চয় করে বলল, এই অশান্তির মাঝে যিনি আমাদের শান্তি দান করতে পারবেন তিনিই হবেন আমাদের সম্রাট। এখন তুমিই সম্রাট নির্বাচিত হও। দেশকে নূতন করে গড়ে তোলো, শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো।
ফাউস্ট : পুরোহিতের মতো কথা বলছ।
মেফিস্টোফেলিস : সম্রাট এখন শেষ যুদ্ধের জন্য এইদিকেই আসছেন।
ফাউস্ট : তাঁর জন্য আমার কষ্ট হয়। লোক হিসাবে তিনি বড় সরল প্রকৃতির ও ক্ষমাশীল ছিলেন।
মেফিস্টোফেলিস : চলে এস। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। ঐ সংকীর্ণ উপত্যকা হতে তাঁকে মুক্ত করতে হবে। দেখা যাক পাশার চাল কোনদিকে পড়ে। এখনও তাঁর হাতে সম্পদ আছে। চলে এস। (পাহাড়ের মাঝামাঝি উঠে সম্রাটের সেনাদল প্রত্যক্ষ করতে লাগল। আমরা তাঁর সঙ্গে যোগদান করব। জয় তাঁর অনিবার্য।
ফাউস্ট : তার পরে কি হবে জানতে চাই। প্রতারণা, বিভ্রান্তিকর মায়া! ইন্দ্রজাল!
মেফিস্টোফেলিস : না, প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে যুদ্ধজয়ের জন্য। তোমার মহান লক্ষ্যের কথা একেবার ভেবে দেখো। যদি রাজার এ রাজ্য রক্ষা করতে পার। শত্রুর কবল থেকে তাহলে সে রাজ্য একদিন শ্রমের পারিতোষিক হিসাবে দাবি করতে পারবে।
ফাউস্ট : অনেক বিদ্যাতেই পারদর্শিতা দেখিয়েছ। এবার এক যুদ্ধ জয় করো।
মেফিস্টোফেলিস : না, তুমি জয় করবে। তোমাকে প্রধান সেনাপতি করা হবে।
ফাউস্ট : এক বিরাট মর্যাদা দান করছ। কিন্তু সেনাপতিত্বের আমি কিছু বুঝি না।
মেফিস্টোফেলিস : কাজের যা কিছু দোষ বা ত্রুটি তোমার অধীনস্থ লোকদের উপর চাপিয়ে দিয়ে শুধু যশটুকু গ্রহণ করবে। আমি যুদ্ধের সময় অর্থেক মানুষের শক্তি আর অর্ধেক পাহাড়ের বা প্রাকৃতিক শক্তির উপর নির্ভর করলাম।
ফাউস্ট : তুমি কি পার্বত্য জাতির লোকদেরও উত্তেজিত করেছ? ওরা অস্ত্র হাতে নিয়ে আসছে দেখছি।
মেফিস্টোফেলিস : না, তবে ওদের মধ্য থেকে সবচেয়ে ভালো দেখে কয়জনকে বেছে এনেছি।
তিনজন শক্তিশালী বীরের আবির্ভাব
মেফিস্টোফেলিস : আমার লোকরা এসে গেছে। তারা বিচিত্র পোশাক ও অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তোমাকে সাহায্য করবে। তারা বীরত্ব দেখিয়ে শিশুদের আনন্দ দান করবে, শয়তানরূপে বিশ্বাসঘাতকরূপে পালাতে পারবে।
বুল্লী (বিচিতক্রবর্ণের পোশাকপরা হালকা অস্ত্রসহ এক তরুণ) : আমার সামনে কেউ এলেই আমি ঘুষির পর ঘুষি মেরে তার চুলের মুঠি ধরে তাকে চিৎ করে ফেলে দেব।
হ্যাভকুইক (মধ্যবয়সী ভালো পোশাক ও অস্ত্রে সজ্জিত) : এই যুদ্ধের কোনো অর্থ হয় না। এই সব বিবাদ নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক।
হোল্পপার্ট (বয়োপ্রবীণ ও অস্ত্র সজ্জিত) : যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে লাভ আমরা করি তা হাতের ফাঁক দিয়ে গলে যায়। জীবনের জোয়ার মানুষকে নিচের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বৃদ্ধলোকের কথা শুনে চললে ঠকতে হবে না। (তারা পাহাড় থেকে নামতে লাগল)
দ্বিতীয় দৃশ্য
সম্রাটের শিবির সন্নিবেশ। নিচের থেকে রণবাদ্য শোনা যাচ্ছিল।
সম্রাট, প্রধান সেনাপতি ও দেহরক্ষীবৃন্দ
প্রধান সেনাপতি : এই উপত্যকার মাঝে অবস্থান করাই এখন আমাদের বিধেয়। এখানে সরে এসে আমরা ভালোভাবেই সৈন্য সমাবেশ করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের পরাজয় ঘটবে না।
সম্রাট : কি হবে শীঘ্রই তা বোঝা যাবে। তবে এই অর্ধ-আত্মসমর্পণ ও অধাপসরণ নীতি আমি পছন্দ করি না।
প্রধান সেনাপতি : নিচে তাকিয়ে দেখুন মহারাজ, কোথায় আমরা পতাকা উত্তোলন করেছি। যুদ্ধের প্রয়োজনীয় ভূমি আমাদের দখলে। পাহাড়টা ঠিক খাড়াই না হলেও শত্রুদের অশ্বারোহী সেনাদল এগোতে পারছে না। আমাদের অর্ধেক শক্তি পাহাড়ে লুকোনো আছে।
সম্রাট : আমার বলার শুধু একটা কথাই আছে, সাহস আর অস্ত্রের পরীক্ষার মাধ্যমেই গুণ বোঝা যায়।
প্রধান সেনাপতি : ঐ দেখুন, ঐ প্রান্তরের মাঝখানে আপনার পদাতিক সৈন্যদল যুদ্ধে ব্যাপৃত। তাদের বিক্ষিপ্ত বর্শার ফলকগুলো কুহেলীঘেরা সূর্যের আলোয় চকচক করছে। আপনার সেনাদল সংখ্যায় শত্রুদের থেকে অনেক বেশি।
সম্রাট : প্রথমে দৃশ্যটা আমার দেখতে দাও। শক্তিতে দ্বিগুণ মনে হচ্ছে সেনাদলটাকে।
প্রধান সেনাপতি : বাঁ দিকের কথা বলার কিছু নেই। বীর যোদ্ধারা সৈন্যাব্যাস ও অস্ত্রগার পাহারা দিচ্ছে। বিনা রক্তক্ষয়ে কোনও শত্রুসৈন্য প্রবেশ করতে পারবে না সেখানে।
সম্রাট : ওদিকে আমার প্রভুত্বকে অস্বীকার করে, সিংহাসনের মর্যাদাকে লজ্জন করে আমার বিদ্রোহী প্রজাগণ এগিয়ে আসছে আমারই বিরুদ্ধে। নিজের রাজ্য নিজেরাই বিধ্বস্ত করছে। ওদের মতির কোনো স্থিরতা নেই।
প্রধান সেনাপতি : কোনও এক বিশ্বস্ত সৈনিক কোনও খবর নিয়ে আসছে। হয়ত সুসংবাদ আছে।
প্রধান গুপ্তচর : সৌভাগ্যক্রমে আমরা জয়লাভ করেছি। আমাদের পক্ষের সাহস ও সমর কৌশল ফলবতী হয়েছে। তবে এখন অনেক প্রজা শ্রদ্ধাঞ্জলি দান করেছে। রাজাকে।
সম্রাট : জনগণ স্বার্থপর, তারা শুধু আত্মরক্ষার কথাটাই ভালো করে বোঝে। কর্তব্যপরায়ণতা, কৃতজ্ঞতা কোনও কিছুই বোঝে না। তারা এটা বোঝে না যে প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগালে তাদের নিজেদের ঘরও পুড়বে।
