ফোর্কিয়া : এই সব মেয়েরা কতক্ষণ ধরে ঘুমোচ্ছে তা আমি জানি না। তারা কি স্বপ্ন দেখছে তাও জানি না। ওরা জেগে ওঠে আশ্চর্য হয়ে যাবে। তবু ওদের জাগাতে হবে। কই জেগে ওঠ তোমরা। সব ঘুম ঝেড়ে ফেলো।
কোরাস : বলো আমাদের, কি করে কি ঘটল। অবিশ্বাস্য হলেও আমরা সব শুনব। এই সব পাহাড় দেখতে আমাদের ভালো লাগছে না।
ফোর্কিয়া : চোখ খুলতে না খুলতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছ তোমরা। তবে শোনো! এই সব পাহাড় আর গুহার মধ্যেই দুই প্রেমিক-প্রেমিকা আমাদের রাজা-রানি আশ্রয় নিয়েছে।
কোরাস : সেকি! এর মধ্যে?
ফোর্কিয়া : বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা এখানে আছে। আমাকে তারা ডেকেছে সেবা করার জন্য। আমি তাদের জন্য ফলমূল, গাছের ছালের সন্ধান করে বেড়াচ্ছি। তারা এখন একা আছে।
কোরাস : এর মাঝে কি ঘরবাড়ি, নদী, প্রান্তর আছে?
ফোর্কিয়া : তোমরা একেবারে অনভিজ্ঞা। এ হচ্ছে এক অনাবিষ্কৃত জগৎ। আমি যখন এর মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম তখন সহসা হাসির শব্দে সচকিত হয়ে তাকিয়ে দেখলাম প্রকৃতি দেবতার মতো সরল সুদর্শন এক তরুণ বালক তার মার কোল থেকে পিতার কোলে আবার পিতার কোল থেকে মার কোলে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। তার মা তাকে এক সময় বলল, তুমি লাফাতে পার যত খুশি, কিন্তু উপরে উঠবে না। তার পিতা বলল, পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে পৃথিবীর মাটিটা ছুঁয়ে থাকবে, শক্তি পাবে। কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল লাফাতে লাফাতে বালকটি পাহাড়ের মাঝে কোথায় হারিয়ে গেল। তার মাতা-পিতা শোকে অধীর হয়ে উঠল। পিতা মাতাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। তারপর আমাদের বিস্ময়ে অভিভূত করে নিয়ে অকস্মাৎ সে হাতে একটি সোনার বীণা নিয়ে হাজির হলো আমাদের সামনে। মাথায় তার অপূর্ব জ্যোতি। অপূর্ব সুর তার কণ্ঠে। একদিন যে ছিল পৃথিবী মাতার সন্তান, আজ সে হয়ে উঠেছে যেন সকল সৌন্দর্য ও চিরন্তন সূরমাধুর্যের অধিষ্ঠাতা দেবতা। অননুভূতপূর্ব বিস্ময়ের সঙ্গে তাকে দেখবে তোমরা।
কোরাস : একে তুমি আশ্চর্যজনক বলছ ক্রেটাকন্যা? এর থেকে কত বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে গেছে অতীতে। আওনিয়ার গান শোননি? হেলাসের রূপকথা শোননি? মাইয়ার পুত্রের গান শোননি? বর্তমানে যা ঘটে তা অতীত ঘটনারই প্রতিরূপ মাত্র। সেই সূক্ষ্ম দেবীর পরম শক্তিশালী পুত্র যখন দানস্বরূপ পরিগ্রহ করে সমুদ্রদেবতার কাছ থেকে ত্রিশূল, রণদেবতা অ্যারেসের কোষ থেকে তরবারি, ফীবাসের কাছ থেকে তীরধনুক, অগ্নিদেবতা হিফাস্টারের কাছ থেকে চিমটে, এমনকি পরম পিতা জিয়াসের কাছ থেকে বজ্রও চুরি করে নেয়, কামদেবতা ইরসকে মল্লযুদ্ধে হারায় এবং দেবী। সাইপ্রিস যখন তাকে আদর করে তখন তার বুক থেকে বেল্ট বা রক্ষবন্ধনীটিও চুরি করে নেয়। (নিকটবর্তী একটি গুহা থেকে গানের সুর শোনা গেল)।
ফোর্কিয়া : এবার শোনো, বিশুদ্ধ গান কাকে বলে। রূপকথার কথা ভুলে যাও। অতীতে কখনও কোনও দেবতা এ গান গায়নি। সে সব দিন চলে গেছে। এ গান অন্তর থেকে বেরিয়ে এসে অন্তরকে স্পর্শ করে। (পাহাড়ের ভিতর চলে গেল)
কোরাস : হে কিতাকৃতি, সত্যই এ গান শুনে অন্তর আমাদের বিগলিত হয়ে যাচ্ছে। চোখে জল আসছে। প্রভাতসূর্যের বিশুদ্ধ উজ্জ্বলতায় পরিপ্লাবিত হয়ে উঠছে আমাদের অন্তরাত্মা। এতদিন জগতে যা আমরা পাইনি তা সব আমরা পেয়েছি আমাদের অন্তরে।
বল্কল ও বৃক্ষপত্রপরিহিত অবস্থায় ফাউস্ট, হেলেনা ও ইউফোরিয়ন
ইউফোরিয়ন : গান শুনে তোমাদের অন্তরে জাগছে শিশুসুলভ উচ্ছলতা, এবার আমার নাচ দেখে তোমাদের অন্তর লাফিয়ে উঠুক।
হেলেনা : প্রেমের মাধুর্য সাধারণত দুজনেই ভোগ করে। তবে তৃতীয় জন কাছে থাকলে আনন্দ বেশি হয়।
ফাউস্ট : তারা যা চেয়েছিলাম তা পেয়ে গেছি। এখন আমি সর্বতোভাবে তোমার, তুমি আমার । জগতের আর কোনও সম্পদ চাই না আমরা।
কোরাস : এখন দীর্ঘকাল ধরে ওরা মিলনের আনন্দ লাভ করবে। এ সঙ্গীত ওদের সে আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেবে।
ইউফোরিয়ন : এখন আমি বৃত্তাকারে লাফাব, ঝপাব। আনন্দের আবেগে নাচব।
ফাউস্ট : কিন্তু ধীরে চলো। শান্তভাবে যা করার করো বৎস! তা না হলে হঠকারিতার ফলে ধ্বংস হয়ে যেতে পার।
ইউফোরিয়ন : আমি আর এখানে চুপ করে স্থির হয়ে থাকব না।
হেলেনা : ভেবে দেখো বৎস। তোমার উপর আমাদের ও তোমার ভবিষ্যতের সব সুখ নির্ভর করছে।
কোরাস : শীঘ্রই হয়ত ওদের মধুর বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। আমার ভয় হচ্ছে।
হেলেনা ও ফাউস্ট : সংযত হও হে হতভাগ্য। আমার ইচ্ছার খাতিরে অন্তত উপরে উঠতে চেও না। সমতলভূমিতেই থাকো। নাচে-গানে উজ্জ্বল করে তোলো, মাতিয়ে তোলো এই সমভূমি।
ইউফোরিয়ন : তোমরা যখন চাইছ তখন আমি সংযত হব। (কোরাসদের টেনে নিয়ে নাচতে লাগল। সবাই আনন্দে নাচো। একেই কি বলে গান আর নাচ?।
হেলেনা : হ্যাঁ, ওদের সঙ্গে নিয়ে নাচতে থাকো।
ফাউস্ট : শীঘ্রই এ নাচ বন্ধ করতে হবে। চুরির ঘটনা দেখে কষ্ট হচ্ছে আমার।
কোরাস : হে সুন্দর বালক, তুমি যখন তোমার হাতগুলো তুলছ তখন তোমার সোনালী কুঞ্চিত কেশরাশি উত্তাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। তোমার লঘুচপল পদভরে লাঞ্ছিত হচ্ছে পৃথিবীর মাটি। আমাদের সমস্ত মনপ্রাণ কেন্দ্রীভূত হয়েছে তোমার কাছে।
ইউফোরিয়ন : এখন থামবে না। কোনও বিরতি নয়। আমি এখন শিকারি আর তোমরা লঘুপদ হরিণীর মতো খেলা করো আমার চারদিকে।
