ফাউস্ট : হে রানি, নতজানু হয়ে অবনত মস্তকে তোমার এ দান গ্রহণ করতে দাও আমায়। তোমার যে হাত আমায় তোমার পাশে তুলে নিতে চায় সে হাতকে প্রথমে চুম্বন করতে দাও। এই অনন্ত ভুখণ্ডসমন্বিত তোমার রাজ্যের রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করো আমাকে। আমি একাধারে তোমার রক্ষক, উপাসক ও দাস রয়ে যাব চিরদিন।
হেলেনা : অনেক আশ্চর্য জিনিস দেখলাম ও শুনলাম। বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে আমার সমগ্র অন্তরাত্মা। অনেক কিছু জানতে ইচ্ছা করছে। তবে এখন একটা কথা বলো, ঐ লোকটি এমন অদ্ভুতভাবে এত সুন্দর সুন্দর কথা কি করে বলল?
ফাউস্ট : আমাদের এখানকার লোকদের কথা যদি তোমার ভালো লেগে থাকে তাহলে আমাদের গান শুনে অভিভূত হয়ে যাবে তুমি। সে গান এখনই শুরু উচিত।
হেলেনা : তুমিও ঐভাবে ঐ সব কথা বলত পার?
ফাউস্ট : এটা তো সহজ কথা। অন্তর কামনার ব্যাকুলতায় পূর্ণ হয়ে উঠলেই মানুষ চারদিকে তাকিয়ে দেখে
হেলেনা : কে তার সে আবেগের অংশ নেবে।
ফাউস্ট : সেই আবেগের মুহূর্তে অতীত বা ভবিষ্যৎ কিছুই থাকে না। থাকে শুধু একমাত্র বর্তমান।
হেলেনা : বর্তমানেই থাকে তখন একমাত্র পরম সুখ।
ফাউস্ট : এই বর্তমানেই আছে আমার সকল সম্পদ ও সৌভাগ্য। আর আমি কি চাই?
হেলেনা : আমার হাত।
কোরাস : অবশেষে আমাদের রানি এই দুর্গাধিপতির সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে প্রকাশ্যে আবদ্ধ হলেও আমরা অবশ্য ইলিয়ামের পতনের পর থেকেই যৌথভাবে বন্দিনী রয়ে গেছি। নারীরা চিরকালই পুরুষের প্রেম অভ্যস্ত। এ ব্যাপারে তারা ঠিকমতো বাছাই। করতে পারে না। গ্রাম্য দেবী ফনও কোনও এক সোনালী চুলওয়ালা রাখালের প্রেমে ধরা দিতে পারেন। ওঁরা খুব কাছাকাছি বসে রয়েছে দুজনে। ওদের পরস্পরের কাঁধে। কাঁধ ঠেকছে, হাঁটুতে হাঁটু, হাতে হাত। নরম সিংহাসনের উপর আন্দোলিত হচ্ছে ওঁদের দেহ। সিংহাসনের রাজকীয় মহিমা ওঁদের অন্তরের আবেগকে দমিয়ে রাখতে পারছে না।
হেলেনা : আমার মনে হচ্ছে আমার কাছ থেকে দূরে চলে এসেছি আমি। আবার মনে হচ্ছে খুব নিকটে এসেছি। তবু আমার বলতে ইচ্ছে করছে, আমি এখানেই আছি। আমি এখানে।
ফাউস্ট : আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। বিকম্পিত হচ্ছে আমার দেহ। কথা বলতে পারছি না। স্থানকালহীন এক স্বপ্নের জগতে যেন আমি বাস করছি।
হেলেনা : আমার মনে হচ্ছে আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে। তোমার সঙ্গে মিলেমিশে এক নবজীবন লাভ করেছি আমি যেন। এই মিলনের ফলে আমারই এক অজানিত সত্তা পরম সত্য হয়ে উঠেছে আমার কাছে।
ফাউস্ট : কোথা হতে কি করে হলো তা জানতে চেও না। জীবন মানেই কর্তব্য হলেও এখন সে কর্তব্য দূরে থাক।
ফোর্কিয়া : (অকস্মাৎ প্রবেশ করে) প্রেমের মধুর আবেগ তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেল। বিপদের আভাস পাওনি? জয়ঢাকের শব্দ শোননি? মৃত্যু এগিয়ে আসছে। মেনেলাস তার দলবল নিয়ে এ দুর্গ আক্রমণ করেছে। তোমাদের লোকজনদের যুদ্ধে ডাকো। (ফাউস্টকে) আর তোমার অবস্থা হবে দিফোবাসের মতো, কারণ, তুমি এই নারীর শালীনতা নষ্ট করেছ। একে একে সব বধ হবে।
ফাউস্ট : হঠাকারী বিপদ এইভাবেই আসে। দুঃসংবাদ সংবাদদাতাকে কুৎসিত করে ফেলে। আর তুমি দুঃসংবাদ দান করেই আনন্দ পাও বেশি। কিন্তু এখন তা হবে না। এখানে কোনও বিপদ প্রবেশ করতে পারবে না। (বিস্ফোরণ, সশস্ত্র সৈন্যদলের প্রবেশ) এইমাত্র সেই নারীর প্রসন্নতা লাভ করে যে বীরত্বের সঙ্গে বীরদের প্রতিহত করে।
শক্রদলের নেতা : (এগিয়ে এসে) কখনও উত্তর থেকে দক্ষিণে, কখনও পূর্ব থেকে পশ্চিমে আমরা অবিরাম এগিয়ে চলেছি। পাইলসে আমরা সমুদ্রপথ ছেড়েছি। আমাদের সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গ্রীসের উপকূলে। এই দূর্গে আমাদের নেতা মেনেলাস বিলম্ব করবেন না। তিনি আবার সমুদ্রে ফিরে গিয়ে জলদুস্যরূপে লুণ্ঠনকার্য চালাবেন। স্পার্টার রানির রাজত্বের অধীনে থেকে তোমরা এ রাজ্যের সব সম্পদ উপভোগ করবে। (ফাউস্ট সিংহাসন থেকে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজন্যবর্গ তাকে ঘিরে ধরল।)
কোরাস : যে লোক কোনও সুন্দরীকে একান্তভাবে করায়ত্ত করতে চায় তাকে আগে দৃঢ়হাতে অস্ত্র ধরতে হবে। তোষামোদের দ্বারা কোনো নারীকে কেউ লাভ করলেও রক্ষা করতে পারবে না। দস্যুরা অপহরণ করে নিয়ে যাবে। এ জন্য আমাদের এই রাজাকে সকলের থেকে বড় মনে না করে পারছি না। কারণ উনি শক্তি ও ত্যাগের সমন্বয় ঘটিয়ে শত্রুসৈন্যদের বশীভূত করে রেখেছেন। আজ এমন ক্ষমতা কার আছে। যে তাঁর কাছ থেকে রানিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়? বাইরের শক্তিশালী শত্রুকে উপেক্ষা করে তিনি এই সুরক্ষিত দুর্গপ্রাচীরের মধ্যে তাঁকে রক্ষা করবেন।
ফাউস্ট : ওদের প্রত্যেকের হাতে কিছু কিছু ধনরত্ন দিয়ে দাও। আমরা যেমন আছি তেমনই থাকব। ওরা তাহলে অন্যান্য শত্রুদের হাত থেকে তোমাদের সমুদ্র পাহাড়বেষ্টিত রাজ্যটিকে রক্ষা করবে। এ রাজ্যের প্রভূত সম্পদের কিছু কিছু অংশ প্রতিটি জাতিই পেতে পারে। এখানকার পর্বতমালা ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে তোমাদের। অতুলনীয় সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশের মাটিতে লেডার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন তোমাদের এই রানি। এদেশের তুষারাবৃত পর্বতমালার মাঝে মাঝে গড়ে উঠেছে কত ঝর্নাবিধৌত অরণ্যসমাচ্ছন্ন জনপদ, কত পশুচারণক্ষেত্র। এখানকার মানুষরা জন্মসুখী। এখানে দেবতারাও মাঝে মাঝে নেমে আসেন মানুষের জন্য। জিয়াসপুত্র অ্যাপোলোও এখানে একদিন নেমে এসেছিলেন রাখালের বেশে। (রানির পাশে বসে) ভূস্বর্গ আর্কিডিয়ার মতো এদেশে চিরসুখ বিরাজ করে। অনন্ত যৌবন ও সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে তোমাদের জীবন। (রাজসভায় দৃশ্যটি রূপান্তরিত হলো পার্বত্যপ্রদেশে। চারদিকে পাহাড় আর বন দেখা গেল। ফাউস্ট ও হেলেনা অন্তহিত। কোরাসদলের মেয়েরা ঘুমন্ত ও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে এখানে-সেখানে।
