ফাউস্ট : (অগ্রসর হলো; আর পাশে ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি লোক) সাদর ও সশ্রদ্ধ অভ্যর্থনার পরিবর্তে আমি এনেছি এক শৃঙ্খলাবদ্ধ লোক যে কর্তব্যকর্মে অবহেলা করে আমাকে প্রতারিত করেছে। নতজানু হয়ে এই শ্রদ্ধেয়া নারীর কাছে তোমার অপরাধের কথা ব্যক্ত করো। হে রাজরাজেশ্বরী, এই লোকটি প্রাসাদশীর্ষের প্রহরীরূপে নিযুক্ত হয়েছিল। এর কাজ ছিল প্রাসাদশীর্ষ হতে স্থলপথে, জলপথে ও আকাশপথে দৃষ্টি প্রসারিত করে দেখা যাতে অকস্মাৎ কোনও সমুদ্ৰাগত জলোচ্ছ্বাস অথবা মানুষের জনতা এই দুর্গমধ্যে এসে না পড়ে। কিন্তু সে কর্তব্যে অবহেলা করে সে যার ফলে আপনারা এখানে অরক্ষিত অবস্থায় এসে পড়েন এবং এর জন্য আমরা উপযুক্ত অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করতে পারিনি। এখন এই ব্যক্তিকে ক্ষমা করবেন না শাস্তি দান করবেন সেটা আপনার উপরেই নির্ভর করছে।
হেলেনা : রানি ও বিচারকত্রী হিসাবে আমাকে এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাদান করেছেন আপনি। এটা এক পরীক্ষাও বলা যেতে পারে। যাই হোক, এখন আমি বিচারকের কর্তব্য ও অধিকার অনুযায়ী আসামীর বক্তব্য শুনতে চাই। বলল, তোমার কথা।
দুর্গপ্রহরী লিনসেউস : ঈশ্বরপ্রেরিত এই দৈব মানবীর ক্রীতদাসরূপে নতজানু হয়ে আমি তাকে অবলোকন করতে চাই। তাতে আমি বাঁচি বা মরি। যা হয় হোক। আমি যখন স্বাভাবিকভাবে পূর্ব দিকে সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায় ছিলাম তখন আমায় হতচকিত করে সহসা দক্ষিণ দিকে আবির্ভাব হলো সূর্যের। আকাশে বা দিগন্তে কোনও আলো নেই, অথচ সূর্য উঠল। কেমন যেন স্বপ্নবিষ্ট হয়ে পড়লাম আমি। চারদিক বাষ্পরাশিতে আচ্ছন্ন করে তার মাঝে এক দেবী আবির্ভূত হলেন। তাঁর অসামান্য অপ্রাকৃত সৌন্দর্যের উন্মাদনায় অন্ধ হয়ে গেলাম আমি। আমার দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা ও অন্তরের আনুগত্য সব কিছু বিলিয়ে দিলাম তাঁর পায়ে। আমি আমার প্রহরীর সব কর্তব্য ভুলে গেলাম। আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাচ্ছেন। রূপসৌন্দর্য সকলের সব ক্রোধকে মোহপাশে আবদ্ধ করে, সব ভয়কে মুক্ত করে।
হেলেনা : যে বিপত্তি আমি নিজে এনেছি তার জন্য কাউকে তিরস্কার করব না। ধিক আমাকে। কী দুর্ভাগ্য আমার। আমি যেখানেই যাই সেখানে নরপশুরা সব গুণ ভুলে গিয়ে আমার পিছু পিছু ছুটে চলে। দেবতা-অপদেবতা, দানব-মানব সবাই। মারামারি করে আমার জন্য। আমি শুধু মানুষের দুঃখ তিন-চার গুণ বাড়িয়ে চলি। এই নির্দোষ ব্যক্তিকে ছেড়ে দাও। যাও, ঈশ্বরদত্ত কোনও গুণের অপচয় করো না।
ফাউস্ট : সত্যিই আমি বিস্মিত হে রানি। সুদক্ষ তীরন্দাজের মতো তুমি যে ধনুকে। অব্যর্থ শর সংযোজন করে তাকে ও আমাকে বিদ্ধ করলে তা দেখলাম। তার মতো আমিও আহত। এই রাজদরবারে অনেকেরই এই অবস্থা। এখন আমি আর আমি নেই। আমার বিশ্বস্ত অন্তরের সব আনুগত্যকে বিদ্রোহে পরিণত করেছ তুমি। এখন আমার যা কিছু আছে তা সব অর্পণ করছি তোমার চরণে। হে রানি, তুমি যেমন আসার সঙ্গে সঙ্গে অপরাজেয় শক্তিবলে এই পার্থিব সিংহাসন অধিকার করেছ তেমনি আমার অন্তরের সিংহাসনও অধিকার করো।
লিনসেউল : (সিন্দুক নিয়ে) হে রানি, আমি মুক্ত হয়ে ফিরে এসেছি। আমি রাজ ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ হয়েও ভিক্ষুকের মতো তোমার কৃপাদৃষ্টি ভিক্ষা চাইছি। আমি কি ছিলাম, এখন আমি কি? কি আমি চাই? আমি সব গুলিয়ে ফেলছি। পূর্ব থেকে আমরা পশ্চিমে এসেছি। অসংখ্য মানুষ আনাগোনা করছে। তার শেষ নেই সীমা নেই। প্রচুর ধনরত্ন। একদিন অকাতরে লুণ্ঠন করেছি আমি। আমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কারও কোনও পকেটে বা সিন্দুকের উপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বলে দিতে পারতাম আমি তার মধ্যে কি আছে। স্তূপীকৃত সোনা ও মণিমাণিক্য করায়ত্ত করি আমি। কিন্তু আমার রত্ন তোমাকে উপহার দিতে চাই। সবুজ পান্নার হার তোমার গলে ও বক্ষে শোভা পাক। কর্ণ-কপোল ভূষিত হোক বিবিধ রত্নালঙ্কারে। শুধু কর্ণদেশ হতে ওষ্ঠাধর পর্যন্ত তোমার গোলাপী গণ্ডদ্বয় মুক্ত থাক কোনও অলঙ্কারের লাঞ্ছনা থেকে। তাই আমি সব এনেছি তোমার পায়ে। অপর্ণ করতে। তুমি সিংহাসনে বসার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার সব জ্ঞান শক্তি সম্পদ সমর্পণ করেছি তোমায়। এতদিন ধরে যে ধনসম্পদ অর্জন করেছি আমি তা তুচ্ছ তৃণবৎ ত্যাগ করতে চাই। তার বিনিময়ে শুধু চাই তোমার সুন্দর মুখের এক আয়ত উজ্জ্বল দৃষ্টি।
ফাউস্ট : শীঘ্রই সব সরিয়ে নাও। শাস্তি না পেলেও পরস্কারও কিছু পাবে না। এই দুর্গমধ্যে যা কিছু আছে সব ধনরত্নই তাঁর। সুতরাং বিশেষভাবে দান করার কিছু নেই। যেখানে যত ধনরত্ন আছে সব স্থূপীকৃত করে দাও তা প্রতিটি কক্ষে। অমিত ধনৈশ্বর্যের নিষ্প্রাণ সমারোহে এক নূতন স্বর্গ রচিত হোক। স্বর্গসুলভ বিভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক এই প্রাসাদদুর্গ। কুসুমাস্তাৰ্ণ কার্পেট বিস্তৃত হোক তার চলার পথে। রত্নমণ্ডিত এই সকল ঐশ্বর্যের অহঙ্কার লাঞ্ছিত হোক তার পদ্মকোষতুল্য সুমেদুর পদাঘাতে।
লিনসেউস : একথা যথেষ্ট হলো না। এই গর্বোদ্ধত সৌন্দর্যের দ্বারা মানুষের জীবন সম্পদ অনুশাসিত হয়। এই সৌন্দর্যের উজ্জ্বলতার কাছে সূর্যালোকও ম্লান হয়ে যায়। তাঁর মুখের পাশে সব মূল্যবান বস্তু তাদের সব মহিমা হারিয়ে ফেলে।
হেলেনা : (ফাউস্টকে) আমি তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই। আমার পাশে এসে এই শূন্য আসন অধিকার করো। আমাকেও গ্রহণ করো।
