হেলেনা : লোকটাকে দেখতে কেমন?
ফোর্কিয়া : কোনও দিক দিয়েই খারাপ নয়। আমার তো ভালোই লেগেছিল। সাহসী বীর সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলের মতো চেহারা। এমন ভদ্রজনোচিত ব্যবহার গ্রীকদের মধ্যে পাওয়া যায়। ওদের যদি বর্বর বলা হয় তাহলে নরহত্যাকারী রক্তলোলুপ গ্রীক ও ট্রয়বীরেরা কী? তাছাড়া ওদের দুর্গ তুমি যদি দেখো আশ্চর্য হয়ে যাবে। কী সুন্দরভাবে চারকোণা পাথরগুলো সাজানো। যেমন খাড়াই ও উচ্চতায় আকাশচুম্বী, তেমনি মসৃণ। সেই দূর্গের মধ্যে স্তম্ভ, অলিন্দ, প্রেক্ষাগৃহ সব আছে।
কোরাস : তারা কোন জাতি?
ফোর্কিয়া : দুর্গের মধ্যে প্রশস্ত বড় বড় হলঘরগুলোতে কতরকম পশুপাখি, দেবদেবীর চিত্র ও মূল্যবান ধাতু আছে তার ঠিক নেই। তাতে মাঝে মাঝে নাচের অনুষ্ঠানও হয়।
কোরাস : সেখানে নাচিয়ে আছে।
ফোর্কিয়া : সোনালী চুলওয়ালা অনেক সুন্দর যুবক আছে।
হেলেনা : তোমার মূল বক্তব্য কি তা বলো।
ফোর্কিয়া : তুমিই বলো। একবার শুধু স্পষ্ট করে হ্যাঁ বলো। আমি তাহলে তোমাকে সেই দুর্গের মাঝে নিয়ে যাব।
কোরাস : একটামাত্র ছোট কথা বলে নিজেকে ও আমাকে রক্ষা করো।
হেলেনা : আমি কি একথা মনে করতে পারি যে মেনেলাস এমন অমানবিক নিষ্ঠুরতার সঙ্গে আমাকে আঘাত করবে?
ফোর্কিয়া : তোমার মনে নেই? প্যারিসের মৃত্যুর পর তার ভাই দিফোবাস যখন তোমাকে গ্রহণ করে তখন মেনেলাস তার নাক-কান কেটে দিয়েছিল?
হেলেনা : সেটা তিনি আমার জন্যই করেছিলেন।
ফোর্কিয়া : তোমাকেও তাই করবেন প্রতিহিংসার বশে। এটা জানবে রূপসৌন্দর্য অবধ্য। যার রূপ আছে সে হত্যা করায়, তার জন্য মানুষ মানুষকে হত্যা করে, কিন্তু সে নিজে হত হয় না। (জয়ঢাকের শব্দ শোনা গেল) ঐ জয়ঢাকের শব্দ যেমন কর্ণ বিদীর্ণ করে দেয় তেমনি প্রতিহিংসাও প্রতিহত মানুষের বক্ষকে বিদীর্ণ করে দেয়।
কোরাস : শুনতে পাচ্ছ না রানি ঢাকের শব্দ, দেখতে পাচ্ছ না সুতীক্ষ্ণ তরবারির উজ্জ্বলতা?
ফোর্কিয়া : আমাদের রাজা ও প্রভুকে স্বাগত জানাব আমরা। স্বেচ্ছায় বরণ করে নেব তাকে।
কোরাস : আমাদের কি হবে?
ফোর্কিয়া : তোমরা ভালোই তা জান। রানির মৃত্যু নিজের চোখে দেখবে। কোনও উপায় নেই।
হেলেনা : আমি কি করব ঠিক করে ফেলেছি। বুঝেছি তুমি এক শয়তানী বুড়ি সব ভালোকে খারাপ করে তোলো যাদুবলে। যাই হোক, প্রথমে আমি দুর্গে যাব তোমার। সঙ্গে। পরে কি করব তা কাউকে বলব না। মনের মধ্যেই থাকবে আমার।
কোরাস : আমরা কত আনন্দে যাব সেখানে। মৃত্যু আমাদের পিছনে তাড়া করেও কিছু করতে পারবে না। দুর্গের বিরাট প্রাচীর চারদিক থেকে রক্ষা করে রাখবে আমাদের, ঠিক যেমন করে ট্রয়ে রেখেছিল। (হঠাৎ ঘন কুয়াশা এসে পিছনের দিকটা ঢেকে দিল) একি! দেখো দেখো, বোনেরা। একটু আগে দিনটা কত উজ্জ্বল ছিল। কিন্তু হঠাৎ ইউরোতাস নদীর বুক থেকে উত্থিত বাষ্পরাশির দ্বারা নলখাগড়া গাছের মালা গলায় তটভূমি আচ্ছন্ন ও অবলুপ্ত হয়ে গেল কোথায়। জোড়ায় জোড়ায় ভেসে যাওয়া কলকণ্ঠমুখর হাঁসদের দেখছি না আর। তবে তাদের দূরাগত ভীতিবিহ্বল চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। সে কণ্ঠে আছে ধ্বংস আর মৃত্যুর আভাস। মেঘ আর কুয়াশা আমাদের চারদিকে এমনভাবে ঢেকে দিয়েছে যে পরস্পরকে দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের সামনে কি হার্মিসকে দেখছি? কিন্তু হাতে তার উজ্জ্বল দৈব দণ্ডটি নেই তো? হার্মিস কি আমাদের প্রেতপরিপূর্ণ অন্ধকার নিরানন্দ নরকে নিয়ে যাচ্ছে? একি! হঠাৎ কুয়াশা কেটে যেতেই দেখি এক বিশাল কারাগার। চারদিকে প্রাচীর। আমরা কি সবাই বন্দি হয়ে গেলাম?
কোরাসদলের নেত্রী : হে নির্বোধ নারীর দল। তোমরা বড় অস্থিরমতি। চঞ্চল বাতাসের গতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের মতির পরিবর্তন হয়। সৌভাগ্যে দুর্ভাগ্যে, আনন্দে-বেদনায় বড় বিচলিত হয়ে ওঠ। প্রত্যেকের কথায় ও প্রতিবাদে নত হয়ে যাও। এখন চুপ করে রানির কথা শোনো। দেখে তিনি তাঁর ও আমাদের জন্য কি পন্থা অবলম্বন করেন।
হেলেনা : কোথায় তুমি পাইথোনস? এই অন্ধকার কারাগার হতে তুমি এসে সেই বীর সর্দারের কাছে আমাকে নিয়ে যাও।
কোরাসনেত্রী : বৃথাই আবেদন-নিবেদন জানাচ্ছ রানি। কোনও দিকে কোনও পথ নেই। সেই বিকৃত চেহারার বুড়িটাও নেই। একটা পা না ফেলেও কিভাবে আমরা এখানে এলাম তা বুঝতে পারছি না। গোলোকধাঁধার মতো পথগুলো। কিন্তু ঐ দেখো কত লোক! গ্যালারি ও জানালায় কত লোক এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মনে হয় অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছে।
কোরাস : আমার অন্তরটা হালকা হলো। ঐ দেখো, কার আদেশে একদল সুদর্শন যুবক ছন্দায়িত পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে এইদিকে। তারা সর্বাঙ্গসুন্দর। তাদের মাথায় কুঞ্চিত কেশ, সুন্দর গণ্ডদেশ, রেশমী পোশাক। কিসের প্রশংসা করব? কার্পেটের উপর দিয়ে তারা ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে সিংহাসনের দিকে। সে সিংহাসনে উপবিষ্ট আমাদের রানির মাথার উপর অসংখ্য পুষ্পমালা সাজিয়ে রেখেছে। (সিংহাসনের দুধারে যুবকরা ও অমাত্যরা আসন গ্রহণ করলে মধ্যযুগীয় নাইটের পোশাক পরে ফাউস্ট ধীরে ধীরে আবির্ভূত হলো)।
কোরাসনেত্রী : (ফাউস্টকে মনোযোগসহ দেখে) জানি না এই আদর্শ মানুষটাকে ঈশ্বর পাঠিয়েছেন কি না। তবে বীরত্ব ও মর্যাদায় ইনি যেন ঊর্ধ্বলোকের মানুষ। এই ধরনের মানুষ সর্বত্র জয়লাভ করেন। ধীর সংযত পদক্ষেপে ও উদার গাম্ভীর্যে উনি সিংহাসন অভিমুখে এগিয়ে চলেছেন। হে রানি, মুখ ফিরিয়ে তাকাও।
