ফোর্কিয়ারা : সেখানে গিয়ে বন্দিনীরূপে দীর্ঘকাল দাসত্ব ভোগ করতে হয় তোমায়? অথবা অফুরন্ত প্রেমের আনন্দ ভোগ করো?
হেলেনা : সে আনন্দের কথা আর বলো না। অফুরন্ত দুঃখ এসে জমা হয় আমার বুকে।
ফোর্কিয়ারা : তবু লোকে বলে তোমাকে একই সঙ্গে ইলিয়াম ও ঈজিপ্টে দেখা যায়।
হেলেনা : আমার অভিভূত চেতনাকে আর বিব্রত করে তুলো না। এখন আমি বলতে পারব না আমি কে।
ফোর্কিয়ারা : আবার লোকে বলে একিলিসও তোমার প্রতি প্রেমাসক্ত হয়। ভাগ্যের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সে তোমাকে ভালোবাসে।
হেলেনা : মনে মনে স্বপ্নের মাঝে তার সঙ্গে হয়েছিল আমার বিবাহ। আমি আর পারছি না। (মূৰ্ছিত হয়ে ঢলে পড়ল)
কোরাস : থামো থামো। ভেড়ার চামড়াঢাকা নেকড়ে কোথাকার। একটিমাত্র দন্তবিশিষ্ট ভয়ঙ্কর মুখগহ্বর থেকে এর থেকে ভালো কথা আর কি আশা করা যায়? আবার কখন কোথায় হিংসার বিষ ছড়াবে? অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের গর্ভ থেকে সব খারাপ কথা তুলে নিয়ে এসো। থামো থামো, রানি নড়ে উঠেছেন। (হেলেনা চেতনা ফিরে পেয়ে উঠে দাঁড়াল।)
ফোর্কিয়ারা : ক্ষণকালের জন্য অচৈতন্যের অন্ধকার মেঘমালায় দিবালোকের মতো তোমার যে উজ্জ্বল দেহসৌন্দর্য আচ্ছন্ন হয়েছিল এতক্ষণ এখন তা আবার প্রকটিত হয়ে আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। সে সৌন্দর্য আমাদের কুৎসিত রূপকে নীরব ভাষায় ধিক্কার দিলেও আমি সৌন্দর্যের মর্ম বুঝি।
হেলেনা : মূৰ্ছা হতে চেতনা ফিরে পেলেও আমি বড় ক্লান্ত। ঠিকমতো পা ফেলে চলতে পারছি না। তথাপি রানি হিসাবে আমাকে সাহস অবলম্বন করতেই হবে।
ফোর্কিয়ারা : রাজকীয় গৌরবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তুমি এবার আমাদের আদেশ করো কি করতে হবে।
হেলেনা : এতক্ষণ ঝগড়া করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে। রাজার আদেশ, দেবতাদের কাছে পূজার বলি দেবার ব্যবস্থা যথাশীঘ্র করো।
ফোর্কিয়ারা : সব কিছু প্রস্তুত–জল, পাত্র, ছুরি। কিন্তু বলির পশুর নাম বলো।
হেলেনা : রাজা সে কথা কিছু বলেননি।
ফোর্কিয়ারা : বলনেনি? কী দুঃখের কথা!
হেলেনা : কিসের দুঃখ বোধ করছ তুমি?
ফোর্কিয়ারা : হে রানি, বলির বস্তু হচ্ছ তুমি।
হেলেনা : আমি?
ফোর্কিয়ারা : আরে তোমার এই সব দাসীরা।
হেলেনা : হায়! কী ভয়ঙ্কর! অথচ এটা আমি আগেই আশঙ্কা করেছিলাম।
ফোর্কিয়ারা : কোনও পরিত্রাণ নেই।
কোরাস : আমাদের কি হবে?
ফোর্কিয়ারা : হে প্রেমূর্তিগণ, পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছ। মানুষদের মতো তোমরাও আলোকোজ্জ্বল পৃথিবী ছেড়ে যেতে ভয় পাও। (দরজার কাছে বামনাকৃতির কতকগুলি জীব দেখা দিল) এস তোমরা, এখানে যা পার ক্ষয়ক্ষতি করো। মুল্যবান কার্পেট পেতে দাও। তার উপর রানি নতজানু হয়ে পূজার বলি হিসাবে নিজেকে উৎসর্গ করবেন। পাত্রগুলো জলপূর্ণ করো। কারণ বলির পর কারো রক্ত ধুয়ে ফেলতে হবে। তারপর রানির মৃতদেহকে উপযুক্ত মর্যাদাসহকারে সমাহিত করতে হবে।
কোরাসনেত্রী : চিন্তামগ্ন অবস্থায় রানি দাঁড়িয়ে আছেন। তার দাসীরা উৎপাটিত তৃণগুলের মতো ম্লান। এখন প্রধানা দাসীরূপে আমার কিছু কর্তব্য আছে। তুমি বয়োপ্রবীণা অভিজ্ঞতাসম্পন্না। তোমাকে না চিনে ওরা আক্রমণ করেছিল। এখন বলো সত্যই পরিত্রণের কোনও উপায় আছে কি না।
ফোর্কিয়ারা : সেটা কিন্তু নির্ভর করছে একমাত্র রানির উপর। একমাত্র তিনিই নিজেকে ও তাঁর সহচরীদের রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু যা কিছু করবে খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।
হেলেনা : আমার দুঃখ হচ্ছে ঠিক, কিন্তু ভয় নেই আমার। তবু যদি উদ্ধারের কোনও উপায় থাকে তো বলো। আমি তা গ্রহণ করবো। তোমার মতো বিজ্ঞ প্রবীণা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পার।
কোরাস : গলায় ফাঁসের নাম শুনেই আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে। তুমি দয়া না করলে আমরা মরব।
ফোর্কিয়া : এত কথা শোনার ধৈর্য হবে কি তোমাদের?
কোরাস : শুনে যদি আমরা বেঁচে যাই তাহলে কেন শোনার ধৈর্য হবে না?
ফোর্কিয়া : যারা বাড়িতে থেকে ধনসম্পত্তি রক্ষা করে তারা সব সময়ই ভালো থাকে। কিন্তু যারা বাড়ি থেকে চলে যায় দীর্ঘকালের জন্য তারা ফিরে এসে দেখে সব ওলটপালট হয়ে গেছে।
হেলেনা : ও সব প্রচলিত কথা বলে লাভ নেই। তোমার কি গল্প বলার আছে তা। বলো।
ফোর্কিয়া : এটা হচ্ছে ঐতিহাসিক সত্য, আমার তিরস্কারের কথা নয়। জলদুস্য মেনেলাস বিভিন্ন উপকূলভাগ হতে কত ধনরত্ন লুণ্ঠন করে আনে তার ইয়ত্তা নেই। দশ বছর ট্রয়যুদ্ধে কাটাবার পর দেশে ফেরার পথে আবার কত ধনরত্ন লুণ্ঠন করে আনবে তা জানি না।
হেলেনা : মানুষের নিন্দা ছাড়া কিছু মুখ খুলতে পারে না তুমি? পাগলমি করাটা স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে।
ফোর্কিয়া : স্পার্টার উত্তরদিকে ইউরোতাস নদীবিধৌত পার্বত্য উপত্যকাগুলো দীর্ঘকাল জনবসতিহীন ছিল। এখন সেখানে এক দুর্ধর্ষ জাতি বাস করে। তারা এক দুর্গম অঞ্চলে দুর্গ নির্মাণ করেছে। ইচ্ছামতো অত্যাচার চালায় তারা পার্শ্ববর্তী জনগণের উপর।
হেলেনা : এটা অসম্ভব মনে হচ্ছে।
ফোর্কিয়া : তারা কুড়ি বছর সময় পায়। এই অবসরে এই সব কাজ করে।
হেলেনা : তারা কি দস্যু এবং তাদের একজন সর্দার আছে?
ফোর্কিয়া : দস্যু তারা নয়। তবে তাদের একজন সর্দার আছে। সে একবার আমাকেও আক্রমণ করে। সে সব নিয়ে যেতে পারত লুণ্ঠন করে। কিন্তু আমি যা তাকে। হাতে তুলে দিয়েছিলাম তাই নিয়ে সে সন্তুষ্ট চলে চলে যায়।
