প্যাসথালিস (কোরাসনেত্রী) : আনন্দপরিবৃত গানের পথ ত্যাগ করে দরজার দিকে তাকাও। কি দেখছ বোনেরা? আমাদের রানি নয়? কিন্তু হে রানি, কেন কম্পিত পায়ে। প্রবেশ করছেন এ গৃহে? আপনার মুখচোখের উপর স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এক প্রবল বিতৃষ্ণা আর ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধ।
হেলেনা : সাধারণ ভয় নয়, সুদূর অতীত রাত্রির ভয়ঙ্কর গর্ত হতে যেন এক বিভীষিকা বাধা দিচ্ছে আমাকে প্রবেশপথে। তবু আমি পালিয়ে যাব না। হে অজানিত অতিপ্রাকৃত দৈবশক্তি, তুমি যেই হও, উপযুক্ত পূজার অঞ্চলিদানে তুষ্ট করব তোমায়। তারপর গৃহ শুদ্ধ করে গৃহিণীরূপে কর্তৃত্বভার গ্রহণ করব।
কোরাসনেত্রী : হে রানি, তোমার দাসদাসীদের চিনে নাও।
হেলেনা : আমি যা দেখছি তোমরাও চোখ দিয়ে তাই দেখতে পাচ্ছ। আমি যখন নীরবে বারান্দা দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন কোনও কর্মব্যস্ত দাসদাসী চোখে পড়েনি। কোনও দাসীকে দেখিনি। স্থূলাঙ্গী প্রধানা দাসীকে পরে দেখতে পেয়ে আমি এক কাজের আদেশ দিলে সে হাত দিয়ে আমাকে চলে যেতে বলল। রান্নাঘরে গিয়ে দেখি একরাশ ছাই জমে রয়েছে। আমি প্রধানা দাসীর কাছ থেকে ধনাগারে গিয়ে দেখি রক্তচক্ষু ভয়ঙ্কর চেহারার এক জীব আমাকে তেড়ে এল। আমার স্বামী ফিরে না আসা পর্যন্ত এ বাড়ির কর্তৃত্বভার গ্রহণ করতে পারব না। (দরজার কাছে ফোর্কিয়াদের আবির্ভাব)
কোরাস : আমার অভিজ্ঞতা অনেক। আমি দেখেছি অনেক বীরের শোক, ইলিয়ামনগরীর পতন। সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মাঝে আমি শুনেছি দেবতাদের কণ্ঠস্বর। বীর যোদ্ধাদের সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের সঙ্গে দেখেছি ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড। কিন্তু তোমাদের অদ্ভুত আকৃতি দেখে ভয় হচ্ছে আমার। তোমরা কারা, কে তোমাদের জন্মদাতা? তোমরা চলে যাও এখান থেকে। ফীবাস, যিনি কোনও ছায়া বা অন্ধকার সহ্য করেন না, তিনি তোমাদের কুৎসিত রূপ সহ্য করবেন না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সৌন্দর্যের উপাসক হয়েও তোমাদের মতো ঘৃণ্য জীবদের দেখে চক্ষুকে পীড়া দিতে হচ্ছে। শোনো, যদি তোমরা না যাও, নিয়তির অভিশাপ তোমাদের ভোগ করতে হবে।
ফোর্কিয়ারা : ‘লজ্জা আর সৌন্দর্য পাশাপশি চলতে পারে না’–এই প্রবাদবাক্যটা প্রাচীন হলেও সত্য। একে অন্যকে পৃথিবীর যে কোনও জায়গায় দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। লজ্জা সব সময় গভীর বিষাদে মগ্ন আর বার্ধক্যজর্জরিত না হওয়া পর্যন্ত সৌন্দর্য মত্ত হয়ে থাকে অহঙ্কারে। আজ দেখছি তোমরাও নির্লজ্জ অন্ধকারে মত্ত হয়ে একদল কলমুখর দুষ্ট সারস পাখির মতো উড়ে এসেছ এখানে। কেন তোমরা ভয়ঙ্কর মিলাদদের মতো এ প্রাসাদে এসে উঠলে? এখানকার প্রধানা দাসীকে আক্রমণ করলে? আমার মনে হয় তোমাদের দেখে একদল পঙ্গপাল আমাদের দেশের মাঠের সব শস্য খেয়ে ফেলেছে। মানুষের সব শ্রম পণ্ড করে দিচ্ছে।
হেলেনা : কোন অধিকারে দাসী হয়ে গৃহিণীর কর্তৃত্ব ও প্রভৃত্বকে আক্রমণ করতে এসেছ? স্বীকার করছি আমরা যখন ছিলাম না, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে বা জলপথে ব্যস্ত ছিলাম তখন তোমরা এ প্রাসাদ ভালোভাবেই রক্ষণাবেক্ষণ করেছ। কিন্তু এ বাড়ির গৃহিণী যখন ফিরে এসেছে তখন তোমাদের আত্মসমর্পণ করা উচিত। একথা না শুনলে শাস্তি পেতে হবে তোমাকে।
ফোর্কিয়ারা : বুঝেছি, বহুকাল পরে রানিরূপে এ গৃহের কর্তৃত্বভার গ্রহণ করতে চাও। রাজার কাছে সে অধিকার লাভ করেছ। ঠিক আছে তাই করো। ধনরত্ন যা আছে সব নাও। কিন্তু আমাকে রক্ষা করো। আমি এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। তোমার রূপের কাছে এদের সবাইকে হাঁসের মতো মনে হচ্ছে।
কোরাসনেত্রী : সুন্দরের পাশে কুৎসিতকে বেশি কুৎসিত মনে হয়।
ফোর্কিয়ারা : বুদ্ধির পাশে নির্বুদ্ধিতাকে আরও বেশি খারাপ লাগে।
(কোরাসদল ও ফোর্কিয়াদের মধ্যে ঝগড়া ও কথাকাটাকাটি চলতে লাগল)
কোরাসদল: ভয়ঙ্কর নরমাংসভোজী জীব তোমরা।
ফোর্কিয়ারা : তোমরা হচ্ছ রক্তচোষা ভূত।
হেলেনা : আমি ক্রুদ্ধ হইনি। দুঃখের সঙ্গেই তোমাদের এই সব ঝগড়া-বিবাদ বন্ধ করতে বলছি। কোনও গৃহকর্তা ঘরে ফিরে বিশ্বস্ত ভৃত্যদের ঝগড়াঝাটি শুনতে চান না। তার উপর তোমাদের মালিক এমনিতেই বিব্রত। আমি দেখছি দাসীরা কাঁপছে। কিন্তু তুমি তাদের থেকে সবচেয়ে বড়। ভদ্রভাবে কথা বলল।
ফোর্কিয়ারা : আজ তুমি দেবতাদের কৃপায় সৌভাগ্যের শিখরে আবার উন্নীত হয়েছ। কিন্তু অতীত জীবনে বহু কামনাবিধুর প্রেমার্থীর সঙ্গলাভ করতে হয়েছে। একবার কামনার উত্তপ্ত হার্কিউলিসের মতো শক্তিধর থিসিয়াস তোমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
হেলেনা : তার ঔরসে আমার গর্ভে এক সন্তানের জন্ম হয়। যে থিসিয়াস আমাকে অ্যাট্রিকায় আমাকে বন্দি করে রাখে।
ফোর্কিয়ারা : তারপর ক্যাস্টর পোলাক্স তোমাকে মুক্ত করে প্রেম নিবেদন করে তোমায়।
হেলেনা : তবু স্বীকার করছি আমার গোপন আসক্তি ছিল প্যাট্রোক্লাসের প্রতি।
ফোর্কিয়ারা : পিতার ইচ্ছায় নৌযুদ্ধবিশারদ মেনেলাসকে বিবাহ করো।
হেলেনা : আমাদের এই বিবাহ থেকে হার্মিওনের জন্ম হয়।
ফোর্কিয়ারা : তবু মেনেলাস যখন ক্রীটদেশে যান দাবি জানাতে, তুমি যখন একা ছিলে প্রাসাদে তখন এক সুদর্শন অতিথি আসেন।
হেলেনা : আমার অতীত জীবনের এই প্রায়বৈধব্যদশা ও তার আনুষঙ্গিক ধ্বংসাবলীর কথা কেন মনে পড়িয়ে দিচ্ছ?
